ভারতীয় মুদ্রা রুপির নজিরবিহীন পতনে দেশটির অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ভারতের সরকারি হিসেবে এবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর আগের প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রবৃদ্ধির হার ছিলো ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০৯ সালের পর প্রান্তিকের হিসেবে এ প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় রুপির দরপতনকে ‘উদ্বেগের বিষয়’ উল্লেখ করে সামগ্রিক বিষয়কে জাতীয় অর্থনৈতিক সমস্যা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সন্দেহ নেই, দেশ কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে মনমোহন এটিও বলেছেন যে, ১৯৯১ সালের মতো অর্থনৈতিক সংকটে ভারত এখনও পড়েনি। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, রুপির এ দরপতনের ফলে রফতানি বৃদ্ধি পাবে এবং খুব দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে পড়েছিলো যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ধার করে বাণিজ্য ঘাটতির অর্থায়ন করতে হয়েছিলো।
গতকাল ১ ডলারের বিপরীতে বিনিময় হয়েছে ৬৬ দশমিক ১৬ রুপি। গত ৬ আগস্ট প্রতি ডলারে পাওয়া যেতো ৬১ দশমিক ৮০ রুপি। চলতি বছরে ডলারের বিপরীতে প্রায় ২০ শতাংশ দর হারিয়েছে রুপি। মনমোহন সিং আশা প্রকাশ করেছেন, এবছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রবৃদ্ধির অবস্থা ভালো হবে। ভালো আবহাওয়া বজায় থাকলে খাদ্যশস্য উত্পাদন বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপও কমে আসবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভারতে রুপির নজিরবিহীন পতনকে দেশটির জন্য চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে। আইএমএফের মুখপাত্র গেরি রাইস গতকাল শুক্রবার বলেছেন, রুপির বর্তমান পরিস্থিতি ভারত সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন নীতি অব্যাহত রাখারও সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রুপির অব্যাহত দরপতনের ফলে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলে ভর্তুকি বেড়ে যাবে। ফলে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। ভারতীয় মুদ্রার এ অবস্থাকে বিশ্বের অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা একাধিক বিষয়কে দায়ী করেছেন। ভারতের ৬৭ ভাগ মানুষকে নামমাত্র দামে খাদ্যশস্য দেয়ার লক্ষ্যে সমপ্রতি খাদ্য সুরক্ষা বিল পাস করা হয়। এ কর্মসূচিতে বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি রুপি প্রয়োজন। এর ফলে ভারতের বাজেট ঘাটতিও বেড়ে যাবে, ফলে রুপির বিনিময় মূল্য আরো হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করছে বিশেষজ্ঞরা।
তবে অনেকেই রুপির দরপতনের জন্য ভারতের আমদানি বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ছাড়াও আমদানির তুলনায় রফতানি কমে যাওয়ায় ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে, ফলে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধিতে রুপির উপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী ডলারের অবস্থানও ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে গত জুনের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ভারতের বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। এর ফলেও ডলারের চাহিদা বেড়ে রুপির দর কমেছে। বৃহস্পতিবার দিনশেষে প্রতি ডলারের দাম দাঁডায় ৬৬ দশমিক ৫৫ রুপি ও বুধবারে ছিল ৬৮ দশমিক ৮০। বর্তমানে ভারতের তেল সংস্থাগুলোর ৭৫ লাখ টন অশোধিত তেল আমদানি করতে খরচ হচ্ছে ৮৫০ কোটি ডলার। তার পরেই স্থান সোনা আমদানির। যার উপর রাশ টানতে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি, ব্যাঙ্কগুলোর আমদানির উপর বিধিনিষেধ ইতিমধ্যেই এনেছে ভারত সরকার। ভারতে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে চলতি খাতে ঘাটতি ৯ হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি।
