খুলনায় বিএনপির নিষ্ক্রিয় নেতারা হঠাত্ সরব

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০২
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে খুলনায় বিএনপির নিষ্ক্রিয় নেতারা হঠাত্ করে সরব হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য এই নেতারা কর্মী-সমর্থকদের কাছে টানতে অর্থ ছড়ানোসহ নানা কৌশল গ্রহণ করেছেন। এ কারণে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল তাতে ফাটল ধরেছে। এ সব নেতাদের কর্মী-সমর্থক সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। ইতিমধ্যে জেলা বিএনপির কর্মী সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম ও যুগ্ম-মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনুর উপস্থিতিতে দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও অস্ত্রের মহড়া দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে খুলনা জেলার ছয়টি আসনেই। বিগত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই পরাজিত হন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থীরা। ওয়ান-ইলেভেনের ধাক্কা ও গত নির্বাচনে ভরাডুবির পর ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়ে বিএনপিসহ চারদলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা। কিন্তু গত জুন মাসে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে নেমে মেয়রসহ অধিকাংশ কাউন্সিলর পদে অভাবনীয়ভাবে জয়লাভ করে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। এতে ফের প্রাণ ফিরে পায় দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। কিন্তু সেই ঐক্য বেশি দিন টিকে থাকেনি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন সেই ঐক্যে ফাটল ধরেছে। বেড়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দূরত্ব। এই দূরত্বের ঢেউ লেগেছে দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যেও। ইতিমধ্যে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটি আসনেই দলের সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থীর ব্যানার, ছবি ও প্ল্যাকার্ড টাঙানো নিয়ে তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। আর এই নিয়ে ঘটছে সংঘাত-সংঘর্ষ এবং পাল্টাপাল্টি মামলা। ইতিমধ্যে গত ২৮ আগস্ট নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে দলের কর্মী সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম ও যুগ্মমহাসচিব মিজানুর রহমান মিনুর উপস্থিতিতে খুলনা-৪ আসনের (রূপসা-দিঘলিয়া-তেরখাদা) সম্ভাব্য দুই প্রার্থী দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল এবং তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক শরীফ শাহ কামাল তাজের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শ্ল্লোগান দেয়াকে কেন্দ করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুই থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ উভয় গ্রুপের ১০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় পরের দিন তাজের সমর্থক জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ঢালী গোলাম ফারুক বাদী হয়ে নগরীর সোনাডাঙ্গা থানায় হেলালের সমর্থক ১৮ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এর জের ধরে গত শুক্রবার হেলালের সমর্থকরা গোলাম ফারুককে মারপিট করে হাসপাতালে পাঠায়। এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বহুল আলোচিত ‘হাওয়া ভবনের’ এক সময়ের কর্ণধার আলী আসগর লবীর কর্মী-সমর্থকরাও নির্বাচনকে সামনে রেখে সরব হয়ে উঠেছে। লবীর কর্মী-সমর্থকরা মাঝে-মধ্যে একত্রিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করছেন। তারা প্রচারণা চালাচ্ছেন, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ আলী আসগর লবীই হচ্ছেন আগামী নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনের বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের প্রার্থী। এই নিয়ে খুলনা মহানগর বিএনপিতেও দীর্ঘদিন পর কোন্দলের সুর বেজে উঠেছে। গত ২৪ আগস্ট মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি ও নবনির্বাচিত মেয়র মনিরুজ্জামান মনি’র সমর্থক মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক আজিজুল হাসান দুলু স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় কার্যালয় চত্বরে সমাবেশ আহবান করেন। একই সময় একই স্থানে লবীর সমর্থক মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক জামাল হোসেন তালুকদার পাল্টা সমাবেশের ডাক দেন। এতে দুই গ্রুপের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে উভয় গ্রুপের সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। জানা গেছে, খুলনা-১ আসনে (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) একজন প্রার্থী থাকলেও খুলনা- ২ (সদর-সোনাডাঙ্গা), খুলনা-৩ (খালিশপুর-দৌলতপুর-খানজাহান আলী) খুলনা-৪ (রূপসা-দিঘলিয়া-তেরখাদা), খুলনা-৫ (ফুলতলা-ডুমুরিয়া) ও খুলনা-৬ আসনে (পাইকগাছা-কয়রা) বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। এসব সম্ভাব্য প্রার্থী কর্মী-সমর্থকদের কাছে একে-অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এই নিয়ে মাঠ পর্যায়ে দলীয় কোন্দল বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এতে ইন্ধন যোগানোর অভিযোগ রয়েছে দলের প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে। সূত্রমতে, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকলেও জেলা বিএনপির সভাপতি ও দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক মাজেদুল ইসলাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য আজিজুল বারী হেলাল এবং কেন্দ ীয় তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক শরীফ শাহ কামাল তাজ প্রায় সারা বছরই থাকেন রাজধানী ঢাকাতে। এই তিন নেতা বছরে দুই-তিনবার খুলনায় আসলেও তাদের রাজনীতি চলে হোটেল কেন্দি ক। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, হোটেলে বসে অনুগত নেতা-কর্মীদের ডেকে তাদের ‘অর্থকড়ি ও দিক-নির্দেশনা’ দিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে যান। যে কারণে গত সাড়ে চার বছরেও জেলা বিএনপিতে কোনো গতি ফিরে আসেনি। এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, সমপ্রতি যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে তা আমরা মিটিয়ে ফেলেছি। এখন আন্দোলনের সময়, তাই সবাইকে আন্দোলনে মাঠে নামতে হবে। নির্বাচনের এখনো অনেক দেরি, দল যাকে মনোনয়ন দেবে আমরা তার পক্ষেই কাজ করব। অপরদিকে, খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ ীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি বলেন, যাদের সময় নেই, তারা রাজনীতির মাঠে সময় দেবেন কিভাবে। তাই তারা রাজনীতিতে সময় দিতে পারছেন না। আমাদের সময় আছে আমরা রাজনীতির মাঠে সময় দিচ্ছি। তিনি বলেন, খুলনা মহানগর বিএনপিতে কোন কোন্দল নেই। আমাদের সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে।