পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই নারীরা নির্যাতিত হচ্ছেন বিভিন্নভাবে— কখনো শারীরিকভাবে, কখনো মানসিকভাবে, কখনো বা আর্থিকভাবে। এসিড নিক্ষেপ এমন একটি সামাজিক ব্যাধি যার মাধ্যমে নারীরা শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে নির্যাতিত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে; যেখানে নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক কুসংস্কার এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার কারণে অবহেলিত এবং নির্যাতিত হচ্ছে; সেখানে ‘এসিড’ একটি ভয়ঙ্কর অভিশাপের নাম। মাঝে মাঝে আমরা পত্রিকা খুলে যেসব এসিড আক্রান্ত মানুষের চেহারা দেখতে পাই, তাতে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে ঐ চেহারা কোনো মানুষের। সমাজের নিম্ন-শ্রেণির মানুষেরাই মূলত এই এসিড সহিংসতার শিকার। প্রধানত সালফিউরিক, হাইড্রোক্লোরিক এবং নিউট্রিক এসিড এইসব ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয়।
বিশ্বের সর্বাধিক এসিড সহিংসতার উদাহরণ বাংলাদেশে, যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরাই এসিড সন্ত্রাসের শিকার। সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা যায় যে, এসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত নারী ও পুরুষের আনুপাতিক হার ১ঃ.১৫।
এসিড সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি যা প্রতিশোধস্পৃহা এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকে সৃষ্টি হয়। অন্য এক জরিপে দেখা গিয়েছে যে, এসিড সহিংসতার শিকার যারা হচ্ছে তাদের মধ্যে ৫৫% বিয়ের প্রস্তাবে অসম্মতি দেয়ায়, যৌতুকের কারণে ১৮%, সম্পত্তির কারণে ১১%।
২০০২ সালে বাংলাদেশে দুইটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে যার একটি এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০২। এই আইন এসিড উত্পাদন, ব্যবহার, আমদানি, বিক্রয় বা মজুদ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। এই আইনের ৩৫ ধারার অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য, অ-আপোষযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য। অপরটি এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ এসিড অপরাধসমূহ দমন করার লক্ষ্যে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (ধারা ৪)।
কসমেটিক সার্জারী ব্যতীত এসিডের ক্ষত সারাবার মত কোনো ওষুধ আজও আবিষ্কৃত হয়নি। পুরুষ এবং নারী, যারাই এসিড নিক্ষেপের শিকার হচ্ছেন তাদের শরীরে এই ক্ষত সারাজীবন থেকে যায়। সেই সাথে কেউ কেউ বধিরত্ব বা অন্ধত্বের শিকার হন যেহেতু বেশিরভাগ সময়ই এসিড নিক্ষেপকারী ব্যক্তির উদ্দেশ্য থাকে ভিকটিমের বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়া। আক্রান্ত ব্যক্তিরা আর কখনোই মানসিক এবং সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে না। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বিষণ্নতা এবং আতঙ্ক ওদের বেঁচে থাকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এসিড নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মানবাধিকারের চরম লংঘন হচ্ছে। কঠোর আইন থাকার পরও অপরাধীরা এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে কারণ আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব। নাগরিক সচেতনতা, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানই পারবে আমাদেরকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে।
— মাহজেরিন মোশাররফ
পারিবারিক এবং কর্পোরেট আইনজীবী
