প্রজন্ম আইকন

চীনামাটির পথিক

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:২৯
মোহাম্মদ মোয়াল্লিমুল ইসলাম ডাকনাম :মোয়াল্লিম জন্মতারিখ ও স্থান :২ ফেব্রুয়ারি, নারায়ণগঞ্জ মায়ের নাম :সাজেদা বেগম বাবার নাম :হাফিজ তাজুল ইসলাম প্রথম স্কুল :আইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :আমার বাবা প্রিয় উক্তি :চেষ্টা করে গেলে প্রতিভাকে অতিক্রম করা যায়। প্রিয় পোশাক :নীল শার্ট, ক্রিম প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, বই পড়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :সততা, পরিশ্রম আর নিয়মানুবর্তিতার সমন্বয়। আট ভাই-বোনের বিশাল পরিবারে বাবার বড় ছেলে মোয়াল্লিম। স্বাভাবিকভাবেই অনেক দায় এসে বর্তায় তার উপর। মধ্যবিত্ত পরিবারে সেগুলো সামাল দিয়ে পড়াশোনা এগিয়ে নিতে হয়, সেই সাথে কিছুটা কাজের সংস্থানও করতে হয়। পড়াশোনার বৈতরণী পার করেই গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দিয়েছিলেন কিছুদিনের জন্য। সেটাও দুই দশক আগে প্রায়। ভাগ্যের সন্ধানে এরপর পাড়ি জমান দুবাইয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সেই দেশে গিয়ে তিনি বিশ্বমানের সিরামিকস উত্পাদনকারী আরএকে সিরামিকসে কাজের সুযোগ পান। এ ধরনের পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে মোয়াল্লিমের পরিচয় ঘটে অনেক নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে। দীর্ঘ আট বছর এমন এক পরিবেশে কাজ করে অভিজ্ঞতার ঝুলি বাড়াতে থাকেন তিনি। সময়টা ২০০০ সাল। আরএকে সিরামিকস মার্কেট বিবেচনায় বাংলাদেশে তাদের কারখানা বসানোর অনুমতি পায়। আর এই দায়িত্বটা পড়ে মোয়াল্লিমের কাঁধে। একেতো বাংলাদেশের ছেলে, সেই সাথে কাজের কারণে সুনামও কুড়িয়েছেন শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে। মোয়াল্লিম বাংলাদেশে এসে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে সফলতার সাথে কারখানা স্থাপন থেকে পণ্য উত্পাদন শুরু হওয়া পর্যন্ত কাজ করে যান। তারপর আবার দুবাইয়ে ডাক পড়ে তার। ততদিনে বাংলাদেশে উত্পাদন শুরু হয়েছে পুরোদমে। নতুন প্রজেক্ট চালু করায় তার দক্ষতার কথা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। আরএকে এই সুযোগে তাকে গ্লাস ফ্যাক্টরিতে দায়িত্ব দেন। সেখান থেকে এসে কিছুদিন তিনি ফ্যালকন টেকনোলজিতে চলে আসেন। বিশ্বমানের ব্লু-রে ডিস্ক উত্পাদনের কাজে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। আর এসব সংস্থাগুলোতে তিনি কখনও প্রজেক্ট ম্যানেজার, কখনও পারচেস ম্যানেজার কখনোবা সমন্বয়কারীর হিসেবে দায়িত্ব পান। আর এই দায়িত্বগুলো তার কাঁধে দিয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত থাকতেন ভালো এক ফলাফলের প্রত্যাশায়। প্রজন্মের মেধাবী এই ব্যবস্থাপক ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফেরত আসেন নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে। এতদিন সিরামিক শুধুই গ্রাহক পর্যায়ে থাকলেও বাংলাদেশের পণ্য বিশ্বমানের করে রপ্তানির প্রয়াস সেভাবে আসেনি। দেশীয় নয় শুধু, বিশ্ববাজারে যাওয়ার প্রত্যয়ে যাত্রা শুরু করে স্টার সিরামিকস লিমিটেড। হবিগঞ্জে বসল আন্তর্জাতিক মানের সম্পূর্ণ অটোমেটিক প্ল্যান্ট। আর এই কাজটার পুরো তদারকিটা হলো মোয়াল্লিমের হাত ধরে। একজন ব্যবস্থাপক যে ঘরে বসেই নির্দেশনা দেন তা নয়, প্রতিটি যন্ত্রের ভাষা বুঝতে পারতেন তিনি। উত্পাদনে আসার পর ভিন্নধর্মী ডিজাইন আর ক্রয়ক্ষমতার কারণে দারুণ জনপ্রিয়তা পায় তাদের প্রোডাক্ট। জেনারেল ম্যানেজার থেকে পদোন্নতি পেয়ে চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। আর এখনও একই পদে দক্ষতার সাথে কাজ করে চলেছেন। মোয়াল্লিমুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্য শিল্পের মতো সিরামিক শিল্প প্রাথমিকভাবে কিছুটা ধীরে প্রসার পেলেও পরবর্তী সময়ে এর বিকাশ খুব দ্রুতই হতে থাকে। বর্তমানে বছরে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সিরামিক শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। পূরণ করছে আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাহিদা। সুলভ প্রাকৃতিক গ্যাস ও শ্রমের মূল্য কম হওয়াই এই শিল্পের সাফল্যের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।’ তিনি আরও জানান, আবাসিক ও বাণিজ্যিক—দুই ধরনের ভবনেই ব্যাপক হারে ব্যবহূত হচ্ছে চীনামাটির টাইলস। মূলত সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যই এই টাইলস ব্যবহার করা হয়। দেশের সিরামিক কারখানাগুলোয় চীনা মাটির টাইলস তৈরি করতে ব্যবহূত কাঁচামালের বেশির ভাগই আমদানি করতে হয়। স্টার সিরামিক চায় শুধুই বিলাসী লোকজন নয়, দেশের সাধারণ মানুষও যেন অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী সিরামিক পণ্য পেতে পারে। আর শুরুর দিকে তারা জোর দিচ্ছেন স্যানিটারি ফিটিংসের দিকে। তবে স্টার সিরামিকসের মূল লক্ষ্য দেশ ছাড়িয়ে বাইরেও আমাদের একটা বাজার তৈরি করা। মোয়াল্লিমুল ইসলাম নতুনদের কাজ নিয়ে অনেক আশাবাদী। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘দক্ষ নেতৃত্ব পেলে অনেক দূর এগিয়ে যাবে তারা। পেশা হিসেবে এখানে কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সিরামিকের বিশ্বব্যাপী চাহিদা প্রতিনিয়ত ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও কাঁচামাল সস্তা হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই শিল্পে বিনিয়োগ করতে উত্সাহ বোধ করছে। তাই একদিকে পণ্যের ব্যাপক চাহিদাবৃদ্ধি, অন্যদিকে বিনিয়োগ বাড়ায় এই শিল্পে বেড়েছে দক্ষ সিরামিক প্রকৌশলীর চাহিদা। তাই যারা সিরামিকের ওপর পড়াশোনা করে বের হচ্ছেন, তাদের জন্য এই শিল্প পেশার নিশ্চয়তা দিচ্ছে।’ প্রজন্মের মেধাবী এই ব্যবস্থাপকের ছেলেবেলা কেটেছে নারায়ণগঞ্জে। বাবা ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। আর মা ছিলেন গৃহিণী। বিশাল পরিবার বাবা-মা আগলে রেখেছিলেন পরম যত্নে। মোয়াল্লিমের উপরেও ছিল অনেক দায়িত্ব। প্রায় পনের বছর আগে বাবাকে হারান তিনি। সেই সময় থেকেই পুরো পরিবারটা আগলে রেখেছেন তিনি। স্ত্রী আফরোজা ইসলাম তার এই পথ চলার সাথি। তিন ছেলেমেয়ে তার। বড় ছেলে আজন পড়ছে মেডিকেলে, ছোট ছেলে আদনান ক্লাস সেভেনে এবং একমাত্র মেয়ে মানারও স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। সবাইকে নিয়ে এখনকার দিনগুলো দেশে তার আনন্দেই কেটে যায়। প্রতিদিন অনেক কাজের ভিড়েও স্বপ্ন দেখেন মানুষের জন্য কিছু করার। তিনি তার স্বপ্নের পথ ধরে হেঁটে যাবেন অনেক দূর। সেই শুভকামনা।