অর্থনীতি নিয়ে বহুমুখী সংকটে ভারত সরকার। একদিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশটির রুপির মান ক্রমাগত নামছে। সাথে সাথে শিল্প উত্পাদন কমে যাওয়ায় দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত কমছে। ২০১১ সালে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিলো সাড়ে সাত শতাংশের উপরে। কিন্তু কমতে কমতে সর্বশেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তা ৪ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে রুপির দাম কমতে থাকায় ভারতের রপ্তানিকারকরা বাড়তি সুবিধা পেলেও আমদানি পণ্যে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে ভোক্তাদের। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভারত জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অচিরেই আবার দাম বাড়বে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, ভারত তার তেল আমদানির ব্যয় মার্কিন ডলারে পরিশোধ না করে নিজস্ব মুদ্রা রুপিতে পরিশোধ করছে।
অর্থনীতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে ভারতের অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, শিল্প উত্পাদন কমছে। নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি তো দূরের কথা অনেকে চাকরি হারাচ্ছেন। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (ভারতের কেন্দ ীয় ব্যাংক) বেশকিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছেঃ বাজারে রুপির সরবরাহ কমিয়ে দিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানো, দেশের বাইরে ডলার পাঠানোর ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ, বিদেশি বিনিয়োগের ওপর থেকে শর্ত তুলে দেয়া। এসব সিদ্ধান্তের পরও অর্থনীতিতে সুবাতাস না আসায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও চিন্তিত। তবে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘আমাদের অনেক সম্পদ আছে। তা দিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। যারা অর্থনীতি বিচার করছেন তারা ঠিক মূল্যায়ন করছেন না।’
ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘হিন্দুস্থান টাইম্স’ অর্থনীতিতে মন্দাবস্থা দেশের জনগণের ওপর কি প্রভাব ফেলবে তার একটি বিবরণ ছেপেছে। তাতে যে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে অগ্রভাগে আছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। এ সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে উল্লেখ করে পত্রিকাটি বলেছে, এটি অধিকাংশ পারিবারিক বাজেটের ওপর চাপ ফেলবে। অনেকে ভোগ্যপণ্য কেনা কমিয়ে দেবেন। জামা-কাপড়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ভ্রমণসহ অন্যান্য দৈনন্দিন কাজও কমে আসবে। এতে অর্থনীতির প্রবাহ কিছুটা হলেও কমে আসবে।
রুপি নিয়ে নানামুখী সংকটে পড়ে ভারতের কেন্দ ীয় ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কেন্দ ীয় ব্যাংক সোয়া শতাংশ সুদে অর্থ ধার দিচ্ছে। এজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও ঋণ প্রদানে সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ঋণ প্রদানের হার কমে আসছে। যার প্রভাব পড়েছে শিল্প উত্পাদনে।
ভারতের অর্থনীতিকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সংকটে ফেলেছে তা হলো রুপির অব্যাহত দরপতন। গত এক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপি ২৫ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তুলে নিয়ে নিজের দেশে ডলার আকারে তা পাঠিয়ে দেয়ার কারণেই রুপির এ দরপতন। রুপির দরপতনের কারণে আমদানি করা বিভিন্ন কাঁচামাল এবং বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ ভারত সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এতে করে সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।
রুপির অব্যাহত দরপতনে ভারত সরকার শেষ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। গতকাল রবিবার ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৫০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। পেট্রোলের দাম বাড়ানো হয়েছে লিটার প্রতি ২ টাকা ৩৫ পয়সা। রান্নার কাজে ব্যবহূত সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৬০ টাকা বাড়িয়ে ৯৬৭ টাকা করা হয়েছে। সামনের কয়েকদিনে কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ইংগিত দেয়া হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘ফের দাম বাড়লো পেট্রোল ডিজেলের। অর্থনীতিতে লাল সংকেত। মানুষ অভুক্ত, ইউপিএ মৃত।’ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করেছেন তৃণমূল সংসদীয় দলের নেতা মুকুল রায়। তিনি বলেছেন, সংসদ চলাকালীন তাকে এড়িয়ে সপ্তাহান্তে দাম বাড়ানোর এ প্রবণতা নিন্দনীয়। এর ফলে রান্নাঘরে আগুন জ্বলবে। মানুষ সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে।’
ভারতের রুপির দাম পড়ে যাবার কারণে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় জনসাধারণের কষ্ট বাড়ছে। অপরদিকে রপ্তানিকারকদের জন্য কিছুটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আগে এক ডলারের বিপরীতে সেখানকার রপ্তানিকারকরা ৫৮ রুপি পেলেও এখন তারা পাচ্ছেন ৬৮ রুপির বেশি। অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ডক্টর মনমোহন সিংও মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন, অর্থনীতিতে ১৯৯১ সালের অবস্থা আর এবারকার অবস্থা এক নয়। আমাদের যথেষ্ট সম্পদ আছে। তা দিয়ে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতিতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছিলো তা কাটিয়ে উঠার পর এবার আবার সংকটে পড়েছে।
