অস্ত্রধারী খুনিরা বেপরোয়া

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:২৭
শান্ত রাজধানী হঠাত্ করেই কেমন যেন অশান্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই খুন হচ্ছেন কেউ না কেউ। সম্প্রতি রাজধানীতে ঘটে যাওয়া সবগুলো হত্যাকাণ্ডই পূর্ব পরিকল্পিত। অধিকাংশ ঘটনায় অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়েছে। এই অস্ত্রগুলো যেমন উদ্ধার হচ্ছে না, তেমনি ধরা পড়ছে না অস্ত্রধারী খুনিরাও। হঠাত্ করে রাজধানী অশান্ত হয়ে উঠার পেছনের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দুই/একটি ঘটনা যা ঘটছে তা বিচ্ছিন্ন। এগুলোকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলার কোন সুযোগ নেই। এর আগে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোই তদন্ত করে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আর অস্ত্র উদ্ধার একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। প্রতিদিনই অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে বলে জানান তারা। গত শনিবার রাতে নটরডেম কলেজ সংলগ্ন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল তিন বন্ধু সাব্বির, জুয়েল ও তনু। হঠাত্ মোটর সাইকেল আরোহী দুই যুবক এসে থামে তাদের কাছে। কোন কিছু না বলেই এক যুবক অস্ত্র উঁচিয়ে প্রবাসী সাব্বিরের বুকে গুলি করে। মুহূর্তেই পালিয়ে যায় তারা। গতকাল প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে এমন তথ্য মিললেও মতিঝিল থানা পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের কোন ক্ল্যু খুঁজে পাননি। শনাক্ত করতে পারেনি খুনিদের। মতিঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ বি এম ফরমান আলী বলেন, খুনি ও খুনের মোটিভ কোনটিই শনাক্ত হয়নি। এই হত্যাকাণ্ডের ১২ ঘণ্টা আগে রাজধানীর পল্লবী থানা এলাকার ৯২ নম্বর ওয়ার্ড পশ্চিম ইউনিটের যুবলীগ সভাপতি শাহ আলী ওরফে রকিকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। হত্যাকাণ্ডের পর লোকজনের সামনে দিয়েই পালিয়ে যায় খুনিরা। অথচ গতকাল পর্যন্ত ওই খুনিদের একজনকেও শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এর আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া খুনের ঘটনায়ও একই অবস্থা। এরই মধ্যে গতকাল রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় পরিত্যক্ত ড্রামের ভেতর থেকে হাত-পা বাঁধা অজ্ঞাত যুবকের (২৫) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এটি হত্যাকাণ্ড হিসাবে শনাক্ত হলেও নিহতের পরিচয়, খুনের কারণ ও খুনি- কোনটিই শনাক্ত করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি, মুক্তার ও রকি হত্যাকাণ্ডের রহস্যও উদঘাটন করতে পারেনি র্যাব বা পুলিশ। ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে সিআইডির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলুল করিম ও রামপুরায় সিকিউরিটি গার্ড আবুল কলাম খুনের আসামিরা। ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, সিআইডির সাবেক কর্মকর্তা ফজলুল হত্যা মামলার তদন্তভার রামপুরা থানা পুলিশের কাছ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রামপুরা থানার এসআই জামাল হোসেন বলেন, থানা পুলিশের তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি না হওয়ায় তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমার জানামতে তদন্তকারী কোন সংস্থাই ফজলুল হত্যাকারীদের বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি। মতিঝিলে খুন, পুলিশের ধারণা বন্ধুরাই ঘাতক! রাজধানীর মতিঝিল নটরডেম কলেজের সামনে সাব্বির হোসেনকে (২২) গুলি করে হত্যার ঘটনায় গতকাল মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় নিহতের বন্ধু জুয়েলসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদিকে থানা হেফাজতে নিহতের দুই বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশের ধারণা পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। জুয়েল ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। মতিঝিল থানার এসআই ফিরোজ আলম জানান, জুয়েলের সঙ্গে সাব্বিরের টাকা লেন-দেন নিয়ে বিরোধ ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই বিরোধের জের ধরেই সাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। জুয়েলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে এখনো তার কাছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঝুট ব্যবসার বিরোধেই পল্লবীতে যুবলীগ নেতা খুন! ঝুট ব্যবসা নিয়ে আধিপত্য ধরে রাখতে গিয়ে স্থানীয় সেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের অপর একটি গ্রুপের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয় যুবলীগ নেতা শাহ আলী রকির। এ বিরোধের জের ধরেই শনিবার সকালে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রকির বাবা মতিউর রহমান বাদী হয়ে গতকাল রবিবার স্থানীয় যুবলীগ ও সেচ্ছাসেবক লীগের সাত নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ এই মামলায় ৯২ নম্বর ওয়ার্ড সেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গিয়াস ও মনিরকে আটক করেছে। থানা পুলিশের ব্যর্থতায় এই মামলাটি ডিবিতে পাঠানো হচ্ছে। পুলিশের পল্লবী জোনের সরকারি কমিশনার কামাল হোসেন বলেন, রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। গ্রেফতারকৃত দুই জনকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে অপর খুনিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাহলে খুনিরা কেন গ্রেফতার হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযান চলছে। পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল লতিফ শেখও স্বীকার করলেন, ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিরোধের কারণেই এই হত্যাকাণ্ড। কূল-কিনারা হয়নি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার সিআইডির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলুল করিম খানকে হত্যার ঘটনার কোন কূল-কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ফলে গতকাল মামলাটি থানা থেকে ডিবি পুলিশের কাছে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই মামলায় পুলিশের অগ্রগতি বলতে তার গাড়ি চালকসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ। এখন পুলিশ দাবি করছে, এটা ছিককে সন্ত্রাসীদের কাজ। গত বৃহস্পতিবার রামপুরার ওয়াপদা রোডে ৭৫/২ নম্বর ‘স্বপ্নপুরী’ নামক নিজ বাড়িতে ফজলুল করিমের স্ত্রী ও দুই গৃহ পরিচারিকাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে ফজলুল করিম খানকে। ঘটনার পর শুক্রবার রাতে নিহতের জামাতা ব্যারিস্টার মকিম উদ্দিন খান জাহান আলী বাদী হয়ে রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করা হয়। অনেক মামলারই কোন আসামি গ্রেফতার নেই গত ২১ আগস্ট ২৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি মোক্তারকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ২৯ জুলাই দিবাগত মধ্যরাতে গুলশানের শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে ফিল্মি স্টাইলে খুন হন যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী। হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়লেও হত্যাকাণ্ডের মূল খুনিরা এখনো অধরা। লাপাত্তা রয়েছে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী দুই যুবলীগ নেতা। ১৬ আগস্ট রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন মাটিকাটা থেকে বস্তাবন্দী অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৩০ আগস্ট রাতে রামপুরা বনশ্রীর সি ব্লকের ১ নম্বর রোডের ১ নম্বর বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড আবুল কালামকে (৬৫) পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। তবে পুলিশ ওই খুনিদের খুঁজে পাচ্ছেন না। ওসি দেলোয়ার হোসেনও স্বীকার করলেন, খুনিদের না পাওয়ার কথা। তবে চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন তিনি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের শেষ সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত বেশিরভাগ আসামিই রাজনৈতিক সম্পৃক্তা থাকায় অনেক সময় পুলিশের পক্ষে তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন অন্তত এক ডজন মানুষ খুন হচ্ছে। সেই হিসাবে চলতি মাসে দেশ জুড়ে তিন শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের রহস্যও উদ্ঘাটিত হচ্ছে না। পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য মতে, জানুয়ারি মাসে ২৮২, ফেব্রুয়ারি মাসে ২৫১, মার্চ মাসে ৩১৭, এপ্রিলে ৩০২, মে মাসে ২৭৬, জুন মাসে ২৭২, জুলাই মাসে ৩১২ ও আগস্ট মাসে ৩২২ জন মারা গেছেন।