বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পরিমাণ এখন ১ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা নিঃসন্দেহে উত্সাহিত হবার মতো ঘটনা। কিন্তু এ মজুদ থেকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের অংশ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পণ্য রফতানি বাবদ আহরিত আয়কে হিসাবে ধরলে দেখা যাবে যে, এ ক্ষেত্রে অবস্থা এখনো যথেষ্টই পশ্চাত্পদ। আমদানি ব্যয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পণ্য রফতানির পরিমাণ যে হারে বৃদ্ধি পাওয়া দরকার, সেটি এখনো সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতির হার বাড়ছে বৈ কমছে না। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, গত এক দশকের মধ্যে আমদানি বৃদ্ধির হারের তুলনায় রফতানি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় প্রতি বছরই নিম্নে অবস্থান করেছে, যার বিভিন্ন ফলাফলের মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের ক্ষেত্রে রেমিটেন্সই এখনো পর্যন্ত আমাদের প্রধান ভরসা হয়ে আছে।
অন্যদিকে আমদানির তুলনায় রফতানি প্রবৃদ্ধির এ নিম্ন হারের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম হচ্ছে আমাদের রফতানি বাণিজ্য এখনো মূলত হাতেগোনা গুটিকতক পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। এ অবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজ করছে এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসাবে অনেক দিন যাবত্ই বিভিন্ন স্তরে ও ফোরামে বারবার বলা হচ্ছে যে, রফতানিমুখী পণ্যের আশু বহুমুখীকরণই (diversification)-এর প্রধান উপায়। কিন্তু মুখে যাই বলা হোক না কেন, বাস্তবে কাজটি এগুচ্ছে না মোটেও কিংবা যেটুকু এগুচ্ছে সেটা কিছুতেই কাম্য স্তরকে অতিক্রম করতে পারছে না। আর তাতে ফল দাঁড়াচ্ছে এই যে, ঘুরেফিরে সেই একই পণ্য একই অঞ্চলের (পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা) প্রায় একই ক্রেতার কাছে বার বার হানা দিচ্ছে। তো, একই ক্রেতা একই ব্রান্ডের প্রায় একই ডিজাইনের জিনিস আর কত কিনবে? বিশেষত পশ্চিমের এ দেশগুলোতে যেখানে ক্রেতা ও ভোক্তার রুচি ও চাহিদার ধরন প্রতিদিনই অতিদ্রুত হারে বদলাচ্ছে, সেখানে অবিকল প্রায় একই পণ্য নিয়ে বাংলাদেশ তার রফতানি আয়ের পরিসীমা কতটুকুইবা বাড়াতে পাবে? না, তা সে পারছেও না বা এভাবে তা পারা সম্ভবও নয়।
রফতানি বৃদ্ধির পথ আসলে আমাদের মোটামুটি জানাই আছে এবং সেটি হচ্ছে যে, রফতানির জন্য খাত এবং বিভিন্ন খাতের আওতাধীন পণ্যের সংখ্যা দুই-ই বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রফতানি খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদি। এ খাতগুলোর তালিকায় সহসাই যদি ওষুধ, মেলামাইন ও প্লাস্টিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল শিল্পজাত পণ্যসামগ্রী, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, সিমেন্ট ইত্যাদিকে যুক্ত করে উক্ত তালিকার শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে সে প্রক্রিয়ায় রফতানির পরিমাণ দ্রুতই অনেক গুণ বেড়ে যাবে বলে আশা করা যায়। অন্যদিকে, বিদ্যমান ও নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তির জন্য চিহ্নিত খাতসমূহের আওতায় যেসব প্রচলিত ধাঁচের পণ্যসামগ্রী রয়েছে, সেগুলোর পাশাপাশি এসব পণ্যের আরো বহুমুখীকরণ ঘটাতে হবে।
পণ্য বহুমুখীকরণ সংক্রান্ত বিষয়টির সাথে সম্ভাব্য বিদেশি ক্রেতার সর্বশেষ রুচি ও চাহিদার ধরন ও প্রবণতা সম্পর্কে ধারাণা থাকাটা খুবই জরুরি। ফলে বিশ্বের কোন্ কোন্ দেশে কী কী পণ্যের চাহিদা রয়েছে, যেগুলোর একটি অংশ বাংলাদেশ রফতানি করতে পারে, এ বিষয়ে যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার আগে সে সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকদের হাতে থাকা প্রয়োজন। তবে পাশাপাশি আবার এটাও ঠিক যে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব তথ্য সংগ্রহ করার কাজটি খুবই কঠিন বা প্রায় অসম্ভব। বস্তুত পৃথিবীর সর্বত্রই এটি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েই হয়ে থাকে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে উদ্যোক্তার এ সংক্রান্ত চাহিদা মিটিয়ে থাকে। এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ কাজটি কিভাবে হতে পারে? এ ক্ষেত্রে দু’টি প্রতিষ্ঠান খুবই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে, যার একটি হচ্ছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) এবং অপরটি হচ্ছে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। এ প্রসঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন যে, বিসিক বা ইপিবিকে শুধু এসব তথ্য সংগ্রহ করলেই চলবে না—এসব তথ্য যাতে সম্ভব সর্বোচ্চসংখ্যক উদ্যোক্তার হাতে পৌঁছানো যায়, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এসব তথ্য দক্ষতার সাথে ব্যবহারে উদ্যোক্তাকে পারঙ্গম করে তোলার লক্ষ্যে তাদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশে যে জনশক্তি রফতানি করছে, তার সিংহভাগই হচ্ছে সাধারণ কৃষিশ্রমিক, অদক্ষ নির্মাণশ্রমিক ও গেরস্থালী কাজের সাহায্যকারী। এদের পরিবর্তে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী দক্ষ শ্রমশক্তি রফতানি করা গেলে এ খাত থেকে বাংলাদেশের বৈদেশিক উপার্জনের হারই শুধু বহুলাংশে বেড়ে যাবে না—এতে করে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে।
মোটকথা, রফতানি বাড়াতে হলে বাংলাদেশকে সর্বাগ্রে তার পণ্যের বহুমুখীকরণ ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট লুক্কায়িত সম্ভাবনা থাকলেও চিন্তা দিয়ে সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যমের ঘাটতি খুবই প্রকট। চিন্তা ও উদ্যম ঘাটতির এ জায়গাটি সহসা পূরণ করা সম্ভব হলে রফতানি বাণিজ্যে ব্যাপক উন্নতি ঘটাবার সুবাদে বাংলাদেশের বর্তমান ৬.০৩ শতাংশের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হার ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক ও অন্যান্য পরিকল্পনার সব প্রাক্কলনকে পেছনে ফেলে ২০২১ সাল নাগাদ তা যদি দুই সংখ্যার (ডাবল ডিজিট) কাছাকাছি চলে যায়, তাতেও মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। রফতানিমুখী পণ্যের বহুমুখীকরণের মধ্যদিয়ে সে রকম একটি উজ্জ্বল অর্জনের প্রত্যাশা, বিষয়টিকে যারা কাছ থেকে জানেন, তারা অবশ্যই করতে পারেন বলে মনে করি।
লেখক :পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন
[email protected]
