দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ফরিদপুরে ততই বাড়ছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়-ঝাঁপ। সেইসাথে বাড়ছে প্রধান দুই দলের মধ্যে গ্রুপিং। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জেলার চারটি আসনেই দলীয় নেতা-কর্মীদের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন সরকার দলীয় এমপিরা। চারটির মধ্যে অন্তত দুটি আসন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছে বিএনপি। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চাচ্ছে সবগুলো আসনই নিজেদের কব্জায় রাখতে।
এলাকা ঘুরে জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান এমপিদের প্রচার-প্রচারণা সেভাবে লক্ষ্য করা না গেলেও বিগত রমজান মাস থেকেই অন্য সম্ভাব্য সকল প্রার্থীই নেমে পড়েছেন গণসংযোগে। বিভিন্ন ইফতার মাহফিলে যোগদান, যাকাত বিতরণ পর্ব শেষ করে বর্তমানে ঘরোয়া ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে জনসমর্থন আদায়ে সচেষ্ট হয়েছেন তারা।
এদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে গ্রুপিং থাকলেও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা খুব একটা অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট দলের নেতাকর্মীরা। ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ ইত্তেফাককে বলেন, এখানে নেতাদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি থাকলেও কর্মীদের মাঝে তা নেই। তবে নির্বাচনের পূর্বেই সকল নেতাকর্মী বিভেদ ভুলে দলের মনোনীত প্রার্থীকে জয়ী করার জন্যই কাজ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোদাররেছ আলী ঈছা ইত্তেফাককে বলেন, দেশ একটি ক্রান্তিকাল পার করছে, এখন আমাদের দলীয় কোন্দল করার সময় নেই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যাকে মনোনীত করবেন দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী তাকেই বিজয়ী করে আনবে। আগামী নির্বাচনে হারানো দুটি আসনেই শুধু নয়, ফরিদপুরের ৪টি আসনেই তাদের প্রার্থী জয়লাভ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সম্ভাব্য প্রার্থী যারা
ফরিদপুর-১ ঃ আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী এই তিন উপজেলা নিয়ে ফরিদপুর-১ সংসদীয় আসন গঠিত। এই আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার, বোয়ালমারী উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেন মুশা মিয়া, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সভাপতি লায়ন মো. সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. দিলীপ রায় প্রমুখ।
তবে এই আসনে আওয়ামী লীগে তীব্র দলীয় কোন্দল বিদ্যমান। বর্তমান এমপি আব্দুর রহমানের সাথে আওয়ামী লীগের বৃহত্ একটি অংশের সম্পর্ক এখন সাপে-নেউলে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এমপি’র নানা কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্য সমালোচনা করছেন। সমপ্রতি গণভবনে অনুষ্ঠিত ফরিদপুরের তৃণমূল নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকেও এমপি’র ব্যাপক সমালোচনা করেন স্থানীয় নেতারা। এমপি আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে মনোনয়ন প্রত্যাশী অপর চার প্রার্থী একাট্টা হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক তিন সংসদ সদস্য শাহ মো. আবু জাফর, খন্দকার নাছিরুল ইসলাম, কাজী সিরাজুল ইসলাম ও কেন্দ্রীয় যুবনেতা মনিরুজ্জামান মনির। এর মধ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন শাহ জাফর। তিনি এ আসনে এর আগে আওয়ামী লীগ থেকে তিনবার এমপি হয়েছেন। সে হিসাবে ভোটারদের কাছে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে।
ফরিদপুর-২ঃ নগরকান্দা ও নবগঠিত সালথা উপজেলা নিয়ে এই আসন গঠিত। এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সংসদ উপনেতা ও বর্তমান এমপি সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাংবাদিক লায়েকুজ্জামান, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মেজর (অব.) আ ত মা হালিম, নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ উপনেতার ছেলে আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলু। অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন প্রয়াত বিএনপি নেতা ওবায়দুর রহমানের কন্যা ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের সভাপতি শ্যামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু, ওবায়দুর রহমানের ভাই খন্দকার জাহাঙ্গীর হোসেন ও সাবেক ছাত্রনেতা শহিদুল ইসলাম বাবুল ।
এ আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু’দলেই রয়েছে কোন্দল। এখানে সাজেদা চৌধুরী ও শ্যামা ওবায়েদ মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে দলীয়সূত্রে জানা গেছে। দলীয় ওই সূত্রটি আরো জানায়, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী শারীরিক অসুস্থতার কারণে নির্বাচন না করলে তার ছেলে বাবলু চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন।
এদিকে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সহিংস হয়ে উঠছে এই নির্বাচনী এলাকা। সমপ্রতি আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী মেজর (অব.) আতমা হালিমের গাড়ি বহরে হামলা চালায় দলীয় প্রতিপক্ষের লোকজন। এ সময় হালিমের গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়, গুরুতর আহত হন হালিম। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। এছাড়াও এই অঞ্চলে প্রতিনিয়তই আওয়ামী লীগ-বিএনপি অথবা একই দলের দুই গ্রুপে ছোট-বড় সংঘর্ষ লেগেই আছে।
ফরিদপুর-৩ ঃ ফরিদপুর সদর উপজেলা নিয়ে এ আসনটি গঠিত। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এই আসনে নির্বাচিত হন। তিনি ছাড়াও এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শিল্পপতি এ.কে আজাদ, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুল হক ভোলা মাষ্টার এবং আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. ফারুক হোসেন। তবে এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশররফ হোসেনই পাবেন বলে দলীয়সূত্রে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক জহুরুল হক শাহজাদা মিয়া, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ জুলফিকার হোসেন জুয়েল এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহাবুবুল হাসান পিংকু।
স্বাধীনতার পর মাত্র দুইবার আওয়ামী লীগ এই আসনে জয়লাভ করেছে, অন্য সময়ে বিএনপির প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। এ আসনে চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ৫ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
এই আসনে আওয়ামী লীগের মধ্যকার গ্রুপিং বর্তমানে প্রকট ও প্রকাশ্য। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী খন্দকার মোশাররফ হোসেন জয়লাভের পর থেকেই দলের মধ্যে গ্রুপিং শুরু হয়। খন্দকার মোশাররফ এই এলাকায় অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি উন্নয়ন করেছেন। তবে দলের ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের পাশ কাটিয়ে তিনি নিজের ভাই ও কিছু প্রিয়ভাজন ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে ক্ষমতার পুরোটা সময় পার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তার সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের দূরত্ব বেড়েছে। যার মাশুল তাকে আগামী নির্বাচনে দিতে হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদরা। অন্যদিকে এখানকার বিএনপিতেও দুইটি গ্রুপ বিদ্যমান। বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে কামাল ইউসুফ এগিয়ে থাকলেও তার বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তিনি দলের কোন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকেন না।
ফরিদপুর-৪ ঃ সদরপুর, চরভদ্রাসন ও ভাঙ্গা উপজেলা নিয়ে ফরিদপুর-৪ সংসদীয় আসনটি গঠিত। এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ, আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ মনজুরুল হক, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ও সদরপুর উপজেলার সভাপতি সালেহা মোশাররফ। এছাড়া জাতীয় সংসদের হুইপ লিটন চৌধুরীর ভাই লিখন চৌধুরীও এই আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
একই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা শাহরিয়ার রুমী, জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাদা মিয়া ও ভাঙ্গা বিএনপির সভাপতি খন্দকার সেলিম।
এছাড়া জাকের পার্টির চেয়ারম্যান পীরজাদা মোস্তফা আমির ফয়সাল এ আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
