যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি সুবিধা (শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার) স্থগিতাদেশ কার্যকর শুরু হয়েছে। গত জুন মাসে এ সিদ্ধান্ত নিলেও গতকাল থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। অর্থাত্ এই সময় থেকে দেশটিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধার আওতায় কোন ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না বাংলাদেশি পণ্য। এর ফলে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সিরামিক ও প্লাস্টিক পণ্য, টেরিটাওয়েল ও তামাকসহ কয়েকটি পণ্য। এসব পণ্য এতদিন সেখানে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। তবে বড় রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। যদিও এ খাতের সমস্যার কারণেই এই সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতির হিসাবের চেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ভাবমূর্তিতে। এখন যে কোন উপায়ে স্থগিত হওয়া জিএসপি পুনরুদ্ধারই হবে বড় কাজ।
জিএসপি ফেরত পেতে যুক্তরাষ্ট্র নির্দেশিত ১৫টি কর্মপরিকল্পনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে ডিসেম্বর নাগাদ এটি ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বাংলাদেশের শ্রমিকদের রক্তের বিনিময়ে তৈরি হওয়া পোশাক যুক্তরাষ্ট্র কিনবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা। গতকাল ঢাকা চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে দেশটির এক কংগ্রেসম্যানের বরাত দিয়ে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, কারখানার পরিবেশ উন্নয়ন, শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত ও নিরাপত্তা রক্ষার মাধ্যমেই পোশাক উত্পাদন করতে হবে। তবে তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রদর্শিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এটি বাংলাদেশ আবার ফেরত পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মপরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম ছিল কারখানাগুলো পরিদর্শনের জন্য ২০০ পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া। এই বিষয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করা যায়নি। শ্রম সচিব মিকাইল শিপার জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে ২৬ জন পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তবে ২০০ ইন্সপেক্টর কবে নাগাদ নিয়োগ দেয়া যাবে এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। এর কারণ হিসাবে তিনি জানান, বর্তমান যে নিয়োগ কাঠামো আছে তাতে ২০০ ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়। ২০০ ইন্সপেক্টর নিয়োগ দিতে হলে কলকারখানা পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে রূপান্তর করতে হবে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র নির্দেশিত কর্মপরিকল্পনার কয়েকটি ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তার ও বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। স্থগিত হওয়া দুটি এনজিও বিসিডব্লিউএস (বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি) ও এসএএফই এর নিবন্ধন ফেরত দেয়ার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যার ক্লু উদ্ঘাটনে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল দেশের শ্রম আইন সংশোধন ও ট্রেড ইউনিয়নের অবাধ নিবন্ধন দেয়া। ইতিমধ্যে শ্রম আইনের সংশোধনী পাস হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন আগের তুলনায় সহজ হয়েছে বলে শ্রমিক নেতারাই স্বীকার করছেন।
মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে শ্রমিক নেত্রী কল্পনা আক্তার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি শুনেছি মামলা প্রত্যাহারের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। তবে আমার জানা মতে এখনো সব মামলা প্রত্যাহার হয়নি।’ এই শ্রমিক নেত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মোট ৮টি মামলা হয়েছিল। তবে সামপ্রতিককালে নেয়া উদ্যোগকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, যদি ভবিষ্যতে বড় কোন বিপর্যয় না হয় তাহলে জিএসপি ফেরত পাওয়া যাবে বলে আশা করি।
একই আশাবাদ প্রকাশ করেছেন গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম। গতকাল তিনি ইত্তেফাককে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ইতিমধ্যে বেশকিছু কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া আমেরিকা ও ইউরোপের ক্রেতাদের সমন্বয়ে কারখানা পরিদর্শনের কাজও অচিরেই শুরু হবে। এর ফলে শুধু জিএসপি ফেরত নয়, বরং জিএসপি সুবিধার তালিকায় গার্মেন্টস খাতও অন্তর্ভুক্ত হবে বলে মনে করেন তিনি।
গতবছর জিএসপি সুবিধা আওতায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি হয়। রপ্তানি হওয়া এসব পণ্যের মধ্যে সিরামিক, টেরিটাওয়েল, প্লাস্টিক পণ্য, তামাক, ক্রীড়া সরঞ্জামাদি উল্লেখযোগ্য। এতে শুল্ক ছাড় পাওয়া গেছে প্রায় ২০ লাখ ডলার।
