বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর একটি কথা বেশ গর্বের সঙ্গেই স্বীকার করে যে তরুণ প্রজন্মের সমর্থনের কারণে বিপুল ভোটের ব্যবধানে তারা জয়লাভ করেছে। কথাটি বিদগ্ধ রাজনৈতিক বোদ্ধা থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মও বিশ্বাস করে। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার তরুণ প্রজন্মের জন্য কী করেছে? তাদের দাবি-দাওয়া কতটুকু শুনেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর কি সরকার দিতে পারবে?
সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনে যে কোনো মতের বা আদর্শের ছাত্র অংশগ্রহণ করলে তা নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এখানে তারা কোনো দলের বা আদর্শের পক্ষে মিছিল করছে না। আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো কী এবং সেগুলো যুক্তিসঙ্গত কিনা সেটাই দেখার বিষয়। বিনা প্রতিযোগিতায় চাকরি দিতে হবে কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দিতে হবে—এমন কোনো অবাস্তব ও উদ্ভট দাবি তারা করেনি। তাদের দাবিটি হলো— চাকরিতে প্রবেশের বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের বয়সসীমা বৃদ্ধি করতে হবে। সেই সময়টি আজীবন নয়; বর্তমানের চেয়ে দু’বছর বা তিন বছর বেশি হলেই চলবে। আর এই দাবিটিই সরকার পূরণ করতে পারছে না অথবা মেনে নিতে কার্পণ্য করছে। কিন্তু দাবিটি মোটেই অমূলক নয়। কারণ প্রতিবছর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী পাস করে কিন্তু চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন হাতেগোনা ক’জন চাকরিজীবী। মানে চাকরিপ্রার্থীর তুলনায় আসন সংখ্যা খুবই নগণ্য। সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর কারণে অবসর গ্রহণের সময় বেড়েছে আর এই সময়ে একজন চাকরিপ্রার্থীর প্রতিযোগিতা করার বয়স চলে যাচ্ছে। তাহলে এইসব ভুক্তভোগী প্রার্থীর বয়স বাড়ানোর দাবিটি সরকার মানবে না কেন? অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীরা যথাসময়ে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারছে না। কারণগুলো সবারই জানা। তাই চাকরিতে আবেদন করার বা যোগদানের সর্বোচ্চ বয়স বর্তমানের চেয়ে ২-৩ বছর বাড়ানোর দাবি উঠতেই পারে। এই দাবিটি সরকারের মেনে নেওয়া উচিত। সরকারের বোঝা উচিত, চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে কোনো পরিবারের একজন সদস্যের কিন্তু এ কারণে বয়সের বাধায় অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে কোনো একটি পরিবারের ২-৩ জন প্রার্থী। তাহলে ক্ষুদ্র পরিসরেই বোঝা যায় সরকারের সিদ্ধান্তে কতজন খুশি আর কতজন বেজার।
আরো একটি বিষয়ে মারাত্মক অসমাঞ্জস্য লক্ষণীয়। সেটি হলো, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের যে সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে সেই বয়সে ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনই সম্ভব হয় না। তাহলে কেন এধরনের একটি সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে? সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ বয়স হিসাব করে একজন প্রার্থী গাণিতিকভাবে সাত বছর প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পেলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান মাত্র ১-২ বছর। আবার এই স্বল্পতম সময়ে কোনো চাকরির বিজ্ঞাপন জারি হবে তার নিশ্চয়তা কে দেবে? ভাগ্যক্রমে একটি বিজ্ঞাপন পেলেও প্রথম পরীক্ষাতেই কি সব প্রার্থীর চাকরি হয়ে যাবে? অতএব এই একটি মাত্র পরীক্ষায় লড়াই করে যে প্রার্থী চাকরিটা কেড়ে নিতে পারবে না তার ছাত্রজীবনে কষ্টার্জিত সনদগুলো শুধু কাগজ হয়েই থাকবে; জীবিকা নির্বাহে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে না। তবে সদিচ্ছা থাকলে সরকার এর একটি সমাধানও দিতে পারে। যেহেতু চাকরিতে বিভিন্ন পদের জন্য বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয় এবং বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনে বয়সেরও তারতম্য দেখা দেয়। তাই চাকরিতে আবেদনের বয়স শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে বাড়ানো যেতে পারে। যেমন স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য যদি সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণ করা হয় ৩০ তাহলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য ৩২ হতে পারে। এভাবে এম.ফিল, পিএইচডির জন্যও পর্যায়ক্রমে ৩৫-৪০ করা যেতে পারে। এতে তরুণ প্রজন্মের দাবিও মানা হবে একইসঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতাকেও মূল্যায়ন করা যাবে।
গাজীপুর
