এমপিদের প্রার্থিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:১৭
সংসদ সদস্যের (এমপি) পদ লাভজনক কি না—তা সংবিধানে স্পষ্ট নয়। তাই বর্তমান সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করতে গেলে সেখানে বিদ্যমান সংসদের সদস্যদের প্রার্থিতা নিয়ে গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠতে পারে। এমন আশংকা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ১২(১)(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, লাভজনক পদে থেকে কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। আবার সংবিধানের ৬৬ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোন ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলে গণ্য হবেন না’। অর্থাত্ আলোচ্য পদধারী কেউ নির্বাচনে অযোগ্য নন। কিন্তু এই অনুচ্ছেদে এমপি পদের কোন উল্লেখ নেই। অর্থাত্ এমপি পদটি লাভজনক কী না বা এই পদে থেকে নির্বাচন করা যাবে কি না সেটি এখন প্রশ্ন সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থায় ৬৬ (৩) অনুচ্ছেদে এমপি শব্দ সংযোজনের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে বলে সরকারের আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িত একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এবারই প্রথম সংসদ না ভেঙ্গে সাধারণ নির্বাচনের বিধান পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমপি পদ লাভজনক কি না তার একটি ইঙ্গিত রয়েছে ভারতের সংবিধানে। দেশটির সংবিধানের ১০২ (১) (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ভারতের পার্লামেন্টের একজন সদস্য আর্থিকভাবে লাভবান হন এমন কোনো সরকারি পদে থাকতে পারবেন না। যে পদের কারণে তিনি কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের কাছ থেকে বেতন, গাড়ি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন। ২০০৬ সালে বিরোধী দলের চাপ ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এমপি অনেক পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। উত্তর প্রদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের চেয়ারপারসন থাকার কারণে ভারতের রাজ্যসভায় সদস্য হিসেবে অযোগ্য হন অভিনেত্রী থেকে রাজনীতিক হওয়া জয়া বচ্চন। সৃষ্ট বিতর্ক সম্পর্কে কেউ কেউ বলছেন, সংসদ বহাল রেখে এবং এমপিরা নিজ পদে বহাল থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে বিষয়টি আদালতে গড়াতে পারে। তাদের মতে, যেহেতু এমপিরাও সরকারি বেতন-ভাতা ভোগ করেন সে কারণে তাদের পদ লাভজনক-ই হওয়ার কথা। আর তাদের পদ যদি লাভজনক-ই হয়ে থাকে, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে আরপিও’র সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হবে। তাছাড়া শুধু নির্বাচিত বর্তমান তিনশ এমপি-ই নন, সংরক্ষিত ৫০টি আসনের নারী সংসদ সদস্যরাও নির্বাচনের সময় এমপি হিসেবে বহাল থাকবেন। তাদের পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ও আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে- যাদের পদ লাভজনক নয় তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। সংবিধানে এটিও বলা আছে যে- যারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী তাদের পদ লাভজনক। যেহেতু সংসদ সদস্যরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন, সে কারণে তাদের পদও লাভজনক কি লাভজনক নয় তা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সংসদ সদস্যরা তো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন, তাহলে কি তা লাভজনক পদ নয়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের ভাতা এক নয়। সে কারণেই সংসদ সদস্য পদ লাভজনক নয়। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেন, বিষয়টি পরিষ্কার করতে প্রয়োজনে একটি ফরমাল ডিবেট (আনুষ্ঠানিক বিতর্ক) হতে পারে। না জেনে-শুনে সংবিধান সম্পর্কে ঢালাও মন্তব্য বা ব্যাখ্যা করা সমীচীন নয়। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন সংবিধানে শুধু প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীদের পদ ‘লাভজনক’ নয় বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের পদের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। এখানেই সমস্যাটি। যার ফলে নির্বাচনের সময় এনিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দেবে, আরপিও’র সঙ্গেও সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাক্তন এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি- এনিয়ে সমস্যা দেখা দেবে। কারণ সংবিধানে নির্বাচন কমিশনের কিছু বিষয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলা থাকলেও আমরা অসংখ্য রিট মোকাবেলা করেছি। কাজেই বিচারপতি এম. রশীদ রায়ে যাই বলেন না কেন, কিংবা সংবিধানে শুধু প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পদকে লাভজনক বলা হলেও নির্বাচনের সময় ঠিকই এনিয়ে যে কেউ আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন। বিতর্কের অবসান ঘটাতে তখন হয়তো এমপিদের পদ লাভজনক কি অলাভজনক, সে ব্যাপারে উচ্চ আদালত ব্যাখ্যা দিতে পারেন।