‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় বাংলাদেশ :স্বপ্ন ও বাস্তবতা’ প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. শামসুল আলমের নতুন গ্রন্থ। গ্রন্থটি বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত এবং দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের সংকলন। বিশ্লেষণাত্মক ও তথ্যবহুল মোট ৩৩টি প্রবন্ধে তিনি বাংলাদেশের অগ্রগতির সামগ্রিক চিত্র অঙ্কন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব থেকে শুরু করে দারিদ্র্য বিমোচন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, পুঁজিবাজার, মুদ্রাস্ফীতি, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং টেকসই উন্নয়নের নানান বিষয়ে অনুপুঙ্খ আলোচনা রয়েছে প্রবন্ধসমূহে। এক্ষেত্রে তাঁর অধ্যয়ন ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে বলে আমি মনে করি। উল্লেখ্য, ড. শামসুল আলম পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব)। গত এক দশক ধরে এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন পরিকল্পিত অর্থনীতির রূপকারখ্যাত এই অর্থনীতিবিদ। তিনি ৩৫ বছরের অধ্যাপনা শেষে ২০০৯ সালের ১ জুলাই প্রেষণে ছুটিতে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন।
পরিকল্পনা কমিশন গঠনের পর সদস্য হিসেবে টানা ১২ বছর দায়িত্ব পালনের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ড. শামসুল আলমের হাত ধরে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে অনেকগুলো উন্নয়ন পরিকল্পনা, যেগুলো এখন বাস্তবায়নাধীন। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী তাঁর প্রণয়ন করা দ্বিতীয় দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (২০০৯-১১) সংশোধন ও পুনর্বিন্যাস করে ‘দিন বদলের পদক্ষেপ’ ২০১১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়। রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে বাংলাদেশের প্রথম পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১) ও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও (২০১১-২০১৫) প্রণয়ন করেছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রণয়ন করা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও এখন বাস্তবায়নাধীন।
এছাড়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০১১-২০২১) ও সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র (২০১৫-২০২৫) প্রণয়ন করা হয়েছে তাঁর তত্ত্বাবধানে। ১০০ বছরের বদ্বীপ পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজও শেষ করেছেন ২০১৮ সালে। এর বাইরেও দায়িত্ব পালনকালে তাঁর তত্ত্বাবধান ও সম্পাদনায় এমডিজি অর্জন বিষয়ক ১৫টি এবং ৬৩টি মূল্যায়ন প্রতিবেদন, অধ্যয়ন ও গবষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ও পঠন-পাঠনের ছাপ রয়েছে তাঁর লেখনিতে।
‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় বাংলাদেশ :স্বপ্ন ও বাস্তবতা’ গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ যা ২০০৭ সালে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছিল সেটি হলো—‘পঁচাত্তর-উত্তরকালে শেখ হাসিনাই সবচেয়ে সফল নেত্রী’। ২০০৭ সালে ড. শামসুল আলম কর্তৃক চিহ্নিত ‘সফল নেত্রী’ আজ ২০১৯ সালে এসে বিশ্বনেত্রীতে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল কেবল তাঁর নেতৃত্বের কারণেই। গত এক দশকে একটানা ক্ষমতায় থাকার পরও শেখ হাসিনা নিজের স্বার্থ নিয়ে না ভেবে দেশ ও দশের কথা ভেবেছেন; সমাজের কথা চিন্তা করেছেন। তাই তাঁর সঙ্গে এদেশের অন্য কোনো নেত্রীর তুলনা করা চলে না। বঙ্গবন্ধুর পর তিনি সফল একজন রাষ্ট্রনায়ক। আলোচ্য প্রবন্ধের সূচনায় লেখক স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। বিশেষত স্বাধীনতার পক্ষে, ধর্মনিরপেক্ষ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারায় এগিয়ে চলা আওয়ামী লীগের অবদান পাঠকের কাছে যুক্তি দিয়ে তুলে ধরেছেন। পক্ষান্তরে ধর্ম-প্রণোদনাভিত্তিক, জামায়াত-বিএনপি, স্বৈরতান্ত্রিক এরশাদের জাতীয়পার্টির অপরাজনীতি চিহ্নিত করেছেন তিনি।
ড. শামসুল আলম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গতিপ্রকৃতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ‘দারিদ্র্য’কে তাঁর কেন্দ্রীয় ভাবনায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করেছেন প্রধানত—‘বাংলাদেশে ব্যাপক দারিদ্র্য কমেছে যে কারণে’, ‘দারিদ্র্য নিরসনে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমন্বিত একটি পরিকল্পনা’, ‘দারিদ্র্য নির্মূলে যত সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ’ প্রভৃতি প্রবন্ধে। দারিদ্র্যের কারণ এবং দারিদ্র্য কমানোর উপায়ই ‘বাংলাদেশে ব্যাপক দারিদ্র্য কমেছে যে কারণে’ প্রবন্ধের মূল বিষয়। স্বাধীনতার পরে চরম দারিদ্র্য নিয়ে শুরু করা একটি দেশ ধীরে ধীরে দারিদ্র্যমুক্ত দেশে পরিণত হচ্ছে—এটাই দেখিয়েছেন প্রাবন্ধিক। ৯০-এর দশকে যে দারিদ্র্য ১ শতাংশ হারে কমতে থাকে তা ২০০০ সালের পর ২ শতাংশ হারে কমতে থাকে। সমাজের অসন্তোষ, অসন্তুষ্টির সবচেয়ে বড় কারণই দারিদ্র্য। দারিদ্র্য মূলত সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি। কাজেই দারিদ্র্য নিরসনে সমাজ বা রাষ্ট্রকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা, আয়-ব্যয়ের বৈষম্য, বাজার সম্প্রসারণ না হওয়াই দারিদ্র্যের মূল কারণ। তাঁর মতে, দরিদ্রদের যদি বাজারে প্রবেশ করানো যায় তাহলে দারিদ্র্য নির্মূলের ম্যাজিক হিসেবে কাজ করবে। দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে কম চট্টগ্রামে এবং বেশি বরিশাল বিভাগে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি রেমিটেন্স, কৃষি বিপ্লব, শিক্ষা, বাজার সম্প্রসারণ, পরিবহন ব্যবস্থা সবই দারিদ্র্য নির্মূলের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও ক্ষুদ্রঋণ, নারীশিক্ষা, প্রশিক্ষণও এতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বাজার যত সম্প্রসারিত হবে দারিদ্র্য তত পালাবে। তবে সর্বোপরি দারিদ্র্য দূর করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা।
ড. শামসুল আলম এ গ্রন্থে ‘উন্নত বাংলাদেশ :স্বপ্ন ও সম্ভাবনা’ শিরোনামের প্রবন্ধে পরিমিত বর্ণনায় তুলে ধরেছেন উন্নয়ন অভিযাত্রার সামগ্রিক রূপ। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে। আর এই স্বপ্ন ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। সেই সোনার বাংলাদেশ গড়তে হলে কী কী করতে হবে এবং কতটা সম্ভাবনা আছে সেই কথাই এই প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন লেখক। এবং কতটুকু সফলতা পেয়েছে বাংলাদেশ ও আরো কতটুকু পাওয়া সম্ভব এবং তার জন্য কী কী উপায় আছে সেই বিষয়গুলো দেখাতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতির জন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা। নগরের সঙ্গে গ্রামের তফাত দূর করা গেলে, কৃষিক্ষেত্রে উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা গেলে শুধু কৃষি নয়; শিল্পও ধারাবাহিকভাবে উন্নত হবে। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। যেমন রূপকল্প ২০২১, রূপকল্প ২০৪১ এবং এসডিজি ২০৩০ বাস্তবায়ন। এগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ স্বপ্নের সেই উচ্চস্থানে পৌঁছাতে পারবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সবজি উত্পাদনে, মত্স্য সম্পদ উত্পাদনে, চাল উত্পাদনে বিশ্বের প্রথম সারির অবস্থানে আছে। লেখক ড. শামসুল আলম আরো দেখাতে চেয়েছেন যে, ২১০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে ডেল্টা প্ল্যান গ্রহণ করেছে তা যদি সফল হয় তাহলে এদেশ উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নের সিঁড়িতে পৌঁছাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আমদানিনির্ভর না হয়ে উত্পাদনমুখী হওয়ার কথা বলেছেন এবং উত্পাদিত পণ্যের সম্প্রসারিত বাজার সৃষ্টির কথাও বলেছেন। সর্বোপরি তিনি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির ওপরে জোর দিয়েছেন। কারণ এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শিক্ষা ও শিক্ষিত জনশক্তি ব্যতীত সম্ভব নয়। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে এবং কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য নিরসনের কথাও তুলে ধরেছেন আলোচ্য প্রবন্ধে।
যেহেতু ড. শামসুল আলম একজন শিক্ষাবিদ এজন্য আলোচ্য গ্রন্থে তাঁর শিক্ষাভাবনা সম্পর্কিত বেশকিছু তাত্পর্যবহ মন্তব্য আছে। ডেল্টা প্ল্যান কিংবা ২০৪১ সালে উন্নত দেশ গড়তে দরকার দক্ষ মানবসম্পদ। আর এই দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বলেছেন তিনি। তাঁর মতে, সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় এখন প্রয়োজন মানসম্মত ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া। প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতের সংখ্যা মাত্র মোট শিক্ষিতের ৩ শতাংশ অথচ দক্ষিণ কোরিয়ায় এ হার ৮৬ শতাংশ। শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন দেশে।
দেশে প্রচুর গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। অথচ সকলের দাবি মানসম্মত শিক্ষা। জার্মানির এক হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপকের সংখ্যা ২১। বাংলাদেশে সেখানে এ সংখ্যা শূন্য। এজন্য তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যয় বহনের চেয়ে একটি পোর্ট বা বন্দর প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি প্রয়োজন।
মূলত ‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় বাংলাদেশ :স্বপ্ন ও বাস্তবতা’ গ্রন্থটি আমাদের নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে, অভিনব সব বিষয়ে চিন্তা করতে শেখাবে। এদেশের অগ্রগতি বুঝতে হলে ড.শামসুল আলমের গ্রন্থ পাঠ করা জরুরি। তাঁর বিশ্লেষণ এদেশের সাফল্যের অন্তর্নিহিত তাত্পর্য অনুভবের জন্য এবং আমাদের অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করতে খুবই প্রয়োজন। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কাম্য।
উন্নয়ন অভিযাত্রায় বাংলাদেশ :স্বপ্ন ও বাস্তবতা ড. শামসুল আলম
প্রকাশক :আলোঘর
প্রচ্ছদ :শতাব্দী জাহিদ
দাম :৪৫০ টাকা
