গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের রাস্তাঘাট সংস্কার

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:১৯
মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার তথা গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী উড়ালসড়ক চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে উদ্বোধনের জোর প্রচেষ্টা চলিতেছে। চুক্তি অনুযায়ী এই বত্সরের ডিসেম্বর নাগাদ কাজ শেষ করার কথা থাকিলেও সরকারের বিশেষ নজরদারির কারণে কাজ দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হইতেছে। ইহা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। কিন্তু ইহার বিপরীত চিত্রটি হইল, উড়ালসড়কের কাজ যথারীতি আগাইয়া চলিলেও সড়কের নিচের ও দুই পার্শ্বের রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজ প্রত্যাশা অনুযায়ী গতিশীল হইতেছে না বলিয়া জানা যায়। বিশেষত ফুলবাড়িয়া হইতে গুলিস্তান হইয়া জয়কালী মন্দির, স্বামীবাগ, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকার অর্ধেকেরও বেশি রাস্তা এখনও বেহাল অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। ইহার অধিকাংশ রাস্তা ক্ষতবিক্ষত। যেইসব রাস্তা ইতোমধ্যে সংস্কার করা হইয়াছে তাহার মান নিয়াও প্রশ্ন তুলিতেছেন কেহ কেহ। এমতাবস্থায় সচেতন নাগরিকদের পক্ষ হইতে ফ্লাইওভারটি উদ্বোধনের আগেই নিচের রাস্তাঘাট যথাযথভাবে মেরামতের দাবি উঠিয়াছে। উল্লেখ্য, গত ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ১৫ রমজান তথা ২৪ জুলাইয়ের মধ্যেই এই এলাকার ড্রেনেজ ও সড়ক মেরামতের কাজ শেষ করিবার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এতদিনেও তাহা শেষ হয় নাই। রাস্তা সংস্কারের কাজ শেষ করিতে না পারায় বিশেষত বৃষ্টি-বাদলার দিনে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়া যানবাহন চলাচলে দুর্ভোগ বাড়িয়া গিয়াছে। ঘটিতেছে ছোট-খাট দুর্ঘটনাও। অন্যদিকে ফ্লাইওভারের রাস্তাঘাট উন্নয়নে গত বত্সরের সেপ্টেম্বর হইতে এই সময় পর্যন্ত ৬২ কোটি টাকা খরচ হইয়াছে । তাহার পরও কেন রাস্তার সংস্কার কাজ শেষ হইতেছে না তাহা একটি প্রশ্নই বটে। তবে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী জানাইয়াছেন অন্যকথা। তাহার মতে, ঠিকাদাররা যেইসব রাস্তা মেরামত করিয়াছেন, সেইগুলির বিল পরিশোধ করা যাইতেছে না। তাহারা প্রকৃতপক্ষে পাইয়াছেন মাত্র ২২ কোটি টাকা। রাস্তা সংস্কারে কালবিলম্বের ইহা অন্যতম কারণ হইতে পারে। গণক্রয় বিধিমালা (পিপিআর ২০০৮ ) অনুযায়ী কাজ চলা অবস্থায় বিল পরিশোধের বাধ্যবাধকতা নাই। তবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের গতি বাড়াইতে অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে অনুদার হইবারও কোন কারণ থাকিতে পারে না। দেশের একমাত্র বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত হইতেছে সর্ববৃহত্ এই ফ্লাইওভারটি। ইহার দৈর্ঘ্য ১১ কিলোমিটার। ইহার মাধ্যমে রাজধানীর সহিত দেশের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের যাতায়াত সহজতর হইবে। এইসব অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য ইহা একটি নূতন দিগন্ত উন্মোচন করিবে। কিন্তু নিচের রাস্তাঘাটের সংস্কার যদি যথাসময়ে শেষ না হয়, তাহা হইলে সংকট থাকিয়াই যাইবে। যাহারা ফ্লাইওভার ব্যবহার করিবেন, তাহাদেরকে যমুনা সেতুর ন্যায় নির্দিষ্ট হারে টোল দিতে হইবে। ফলে অনেকে নিচের রাস্তারও সদ্ব্যবহার করিতে চাহিবেন। তাহাছাড়া নিচের রাস্তা বেহাল থাকিলে যানজটের সমস্যা দূর হইবে না এবং ফ্লাইওভার তৈরির মূল উদ্দেশ্যও পূরণ হইবে না। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রথম এই স্বপ্নের ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এইজন্য বিশ্বব্যাংক আড়াই শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। ইহা সড়ক ও জনপথ বিভাগের বাস্তবায়নের কথা থাকিলেও দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়ে প্রকল্পটি। ২০০৩ সালে চার দলীয় জোট সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ৬.৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই ফ্লাইওভারের ব্যয় ধরা হয় ৬৭০ কোটি টাকা। ইহা নির্মাণে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সহিত চুক্তিবদ্ধ হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অরিয়ন গ্রুপ। কিন্তু দরপত্র নিয়া টানাপোড়েনে এবং সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্তরিকতার অভাবে ইহা শেষতক স্থগিত হইয়া যায়। অতঃপর ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগুরুত্বের কথা ভাবিয়া বাংলাদেশে প্রথম পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় সেই অরিয়ন গ্রুপের অর্থায়নে এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন। সংশোধিত নকশায় ইহার দৈর্ঘ্য বাড়িয়া হইয়াছে ১১ কিলোমিটার এবং ব্যয় বাড়িয়া দাঁড়াইয়াছে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সুতরাং সবকিছুই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হউক, ইহাই সকলের কাম্য। প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন সেবা খাত যেমন ঢাকা ওয়াসা, ডিপিডিসি, তিতাস গ্যাস ও বিটিসিএলের স্থাপনা সরানোর কাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণেও উক্ত রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজ বিলম্বিত হইয়াছে। এখন সকল প্রতিকূলতা কাটাইয়া প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা লইয়া এই সরকারের আমলেই বহু কাঙ্ক্ষিত এই ফ্লাইওভারটি চালু হইবে বলিয়া আমরা আশা করি। কোন কারণে ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তাঘাট সংস্কার যথাসময়ে শেষ না হইলে তজ্জন্য প্রকল্প পরিচালকই দায়ী থাকিবেন। অতএব এই ব্যাপারে কালক্ষেপণের কোন অবকাশ নাই।