সিরিয়ায় সীমিত হামলায় যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রস্তুত

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৪৮
সিরিয়া আক্রমণে প্রথম পর্যায়ের সামরিক প্রস্তুতি শেষে নিজ দেশের আইনগত দিক বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই পর্যায়ে দেশটির কংগ্রেসের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ইতিমধ্যে মার্কিন সিনেটের একটি কমিটি হামলার খসড়া প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছে। সমর্থন দিয়েছে বিরোধী রিপাবলিকান দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাও। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হামলা জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাছাড়া মার্কিন জনগণের অধিকাংশই চায় না সিরিয়ায় সামরিক হামলা চালাক যুক্তরাষ্ট্র। খবর বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন ও আল-জাজিরার। সিরিয়ায় সীমিত আকারে সামরিক হামলা চালানোর খসড়া প্রস্তাবে গত মঙ্গলবার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক একটি কমিটি। এ প্রস্তাবের ওপর আগামী সপ্তাহে সিনেটের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ভোটাভুটির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ৬০ দিনের মধ্যে সিরিয়ায় অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তবে প্রেসিডেন্ট চাইলে কংগ্রেসের অনুমোদন সাপেক্ষে আরো ৩০ দিন সময় বাড়ানো যাবে। অভিযানে স্থলবাহিনী ব্যবহার করা যাবে না। সিনেটের ওই কমিটিতে খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়ানো মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্য নয়। বিশ্বের আর কোনো দেশ যাতে এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার না করে সেটা জানান দিতেই এই হামলা হবে। এছাড়া সামরিক অভিযানের পরিকল্পনার পক্ষে আমেরিকার দুজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের সমর্থন পেয়েছেন ওবামা। এরা হলেন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান দলীয় স্পিকার জন বোয়েনার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের নেতা এরিক ক্যান্টর। তবে সংখ্যালঘু ডেমোক্রেট সদস্যদের নেতা ন্যান্সি পেলোসি সমর্থন দেয়ার কথা বললেও সিরিয়া প্রশ্নে আমেরিকার জনগণের সমর্থন আদায়ের প্রয়োজন আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পেলোসি বলেন, প্রেসিডেন্ট আসাদের রাসায়নিক অস্ত্রের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে যুদ্ধজাহাজ এবং সেনা-বহর পাঠানো একটা বিলাসিতা যেটা এই মুহূর্তে আমেরিকার সামর্থ্যের বাইরে। বিশ্লেষকদের মতে, ওবামার জন্য এখন সবচেয়ে কঠিন একটা কাজ বাকি আছে। আর সেটা হল তাকে সিরিয়ায় হামলা চালানো প্রশ্নে আমেরিকার জনগণের সমর্থন আদায় করা। জাতীয় জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সিরিয়ায় সম্ভাব্য হামলার বিপক্ষে জনমত ক্রমেই বাড়ছে। প্রতি দশজন আমেরিকানের মধ্যে ছয় জন সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিপক্ষে, এমনকি আইন-প্রণেতারাও এই প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন জানায়, এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের মঙ্গলবার প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৫৯ভাগ জনগণ সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক হামলার বিরোধী। সমর্থন করে শতকরা ৩৬ ভাগ জনগণ। ওবামা গতকাল বুধবার জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে সুইডেন যান এবং বলেন, সিরিয়া ইস্যুতে আমরা নীরবে বসে থাকতে পারি না। তিনি বলেন, সিরিয়ার জন্য দেয়া ‘লাল দাগ আমি টানিনি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই টেনেছে’। গত কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া আক্রমণে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভূ-মধ্যসাগরে দেশটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে অনেক আগেই। হামলার পরিকল্পনাও শেষ করা হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়া সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একক অভিযান ন্যায়সঙ্গত হবে কি না- এই প্রশ্ন ওঠার পর জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন বলেছেন, একটি দেশের বিরুদ্ধে আরেকটি দেশের শক্তি প্রয়োগ তখনই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে, যখন শক্তি প্রয়োগকারী দেশটি নিজে আক্রান্ত হয়। অথবা নিরাপত্তা পরিষদ তাদের শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেয়। মহাসচিব বলেন, সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা যদি নিশ্চিত হতে পারেন, সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা হয়তো সিরিয়া অভিযানের বিষয়ে মতপার্থক্য দূর করতে পারবে। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যের মধ্যে কেবল ফ্রান্সই যুক্তরাষ্ট্রকে এই অভিযানে সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছে। তবে ফ্রান্স এককভাবে এই অভিযানে আগ্রহী নয়। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জাতিসংঘে এই অভিযানের প্রস্তাব তুললেও নিজের দেশের পার্লামেন্টে এ প্রস্তাব পাস করাতে পারেননি। তবে দেশটি কূটনৈতিক সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছে। সিরিয়ার বিরুদ্ধে একপেশে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের সতর্ক করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান চালালে তা ‘আগ্রাসন’ হতে পারে বলে পুতিন মন্তব্য করেছেন। কথিত রাসায়নিক হামলার অভিযোগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন ওবামা। এ বিষয়ে পুতিন বলেছেন, সিরিয়া সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলে এবং সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ শক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিলে রাশিয়া তা আগ্রাহ্য করবে না। কিন্তু জাতিসংঘের পরামর্শ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে রাশিয়া কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা বলার সময় এখনো হয়নি বলে জানান পুতিন। গত ২১ আগস্ট সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে রাসায়নিক হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করে সিরিয়ার সরকার বিরোধী বিদ্রোহীরা। এই হামলার জন্য সরকার ও বিদ্রোহী পরস্পরকে দায়ী করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো আসাদ সরকারই দায়ী বলে জানায়। যদিও এ সম্পর্কে জাতিসংঘের তদন্ত ফলাফল এখনো প্রকাশ হয়নি। হামলায় ৪শ’ ২৬ জন শিশুসহ ১ হাজার ৪শ’ ২৯ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি যুক্তরাষ্ট্রের।