প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি মানেই সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গীবাদ। আর আওয়ামী লীগ মানেই শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। দেশের চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আরেকবার নৌকা মার্কায় দেশবাসীকে দোয়া, সমর্থন ও ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমার মা-বাবাসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সেই হত্যার যখন বিচার করেছি, তখন বিরোধী দল হরতাল দিয়েছিল। তারা খুনিদের বিচার বন্ধ করে রেখেছিল। খুনিদের চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিল। সেই দিন আবার বেগম খালেদা জিয়া ভুয়া জন্মদিন পালন করেন। ওইদিন কেক কেটে তিনি আনন্দ উল্লাস করেন। মানুষ কতটা নির্মম হলে এসব করতে পারে। তিনি বলেন, আমার বাবা দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। আমার পিতার স্বপ্ন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে রাজনীতি করছি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা সদরের ফকিরণী নদীর তীরে দেউলা এলাকার এনা পার্ক মাঠে আয়োজিত বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা কোরআন শরীফে আগুন দিতে পারে তারা কিভাবে দেশ ও ইসলামের হেফাজত করতে পারে। তিনি বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের পরিকল্পিত মিথ্যাচার সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জামায়াত-বিএনপি ধর্মের নামে রাজনীতি করে। প্রতি বছর কাবা শরীফের গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। বিএনপি-জামায়াত ওই ছবি নিয়ে অপপ্রচার করে যে, তারা নাকি জামায়াত নেতাদের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। বঙ্গবন্ধু মদ জুয়ার লাইসেন্স বাতিল করেছিলেন। আর জিয়া মার্শাল ‘ল’ দিয়ে ক্ষমতা দখল করে মদ-জুয়ার লাইসেন্স দিয়ে রাজনীতি শুরু করেন। তিনি বলেন, আগেরবার আমাদের সরকার আমলে গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিএনপি ক্ষমতায় এসে বন্ধ করে দিয়েছিল।
তিনি গত ৫ মে ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে পুলিশী অভিযানে মৃতের সংখ্যা নিয়ে সংগঠনটির মিথ্যা প্রচারণার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তাদের মিথ্যাচার প্রকাশ হয়ে পড়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ইসলামিক ফাউন্ডেশন, টঙ্গীতে বিশ্বইজতেমার জায়গা বরাদ্দসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করে বলেন, মিথ্যা বলে, ভাওতাবাজি করে মানুষকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চায়, খুনিদের উত্সাহ ও মদদ দেয়, যারা ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি, লুটপাট, জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করে, সেই বিএনপি-জামায়াত জোট কখনও দেশের মানুষের উন্নয়নে বিশ্বাস করে না। ক্ষমতায় থেকে তারা দেশে কোনো উন্নয়ন করেনি। ক্ষমতায় থেকে তারা শুধু দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে- দেশের মানুষকে কিছু দেয়নি। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নয়নসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার অঙ্গিকার করে শেখ হাসিনা আরো বলেন, বিএনপি- জামায়াত জোট সরকারের সময়ে যে বাগমারায় জঙ্গি উত্থান হয়েছিলো, মানুষের নিরাপত্তা ছিলো না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ আবারও মর্যাদার আসন পেয়েছে, বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেলের স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে দেশবাসীর আরেকবার সহযোগিতা চাই।
দুপুরের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে বেলা ৪টার দিকে রাজশাহী থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টার বাগমারায় হেলিপ্যাডে অবতরণ করে। সেখানে পৌঁছেই প্রথমে যান দেশের প্রথম উপজেলা পর্যায়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে। সেখান থেকে গাড়িতে চড়ে বেলা ৪.১৫ মিনিটে উপস্থিত হন বিশাল জনসমুদ্রের সভামঞ্চে। সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে দুই হাত নেড়ে অভিনন্দন জানান লাখো জনতাকে।
বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় (রাজশাহী-৪) আসনের সাংসদ প্রকৌশলী এনামুল হকের সভাপতিত্বে বিশাল এ জনসভায় বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, শিল্পপ্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী, রাসিকের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, সাংসদ খালেদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ।
টানা ৩২ মিনিটের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী রাজশাহীসহ সারাদেশের উন্নয়নে সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞ, বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের অপপ্রচারের নিন্দা এবং আগামীতে দেশের উন্নয়নে তাঁর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আরো বলেন, সিঙ্গাপুরে গিয়েও খালেদা জিয়া তাঁর পুত্রের পাচারকৃত অর্থ রক্ষা করতে পারেননি। বিদেশের আদালতে পাচারের ঘটনা ধরা পড়েছে, দেশের ইতিহাসে আমরাই প্রথম সরকার যে, বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনেছি।
দেশের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছি। রক্তাক্ত জনপদ বাগমারায় শান্তি ফিরিয়ে এনেছি। কারণ আমরা দেশের সার্বিক উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে যখন ভোট দিয়েছে, তখনই কিছু পেয়েছে। আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েই দেশের জনগণ স্বাধীনতা পেয়েছে, ভাষার মর্যাদা ও সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছে। তাই আগামীতেও জনগণের ভোট চাই।
সেনাবাহিনীর চারটি ব্যাটালিয়নকে প্রধানমন্ত্রী
কর্তৃক জাতীয় পতাকা প্রদান
আইএসপিআর জানায়, রাজশাহী সেনানিবাসে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টারে বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট-এর ৩য়, ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ ব্যাটালিয়নকে তাদের কর্মদক্ষতা, কঠোর অনুশীলন, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং সেনাবাহিনী তথা জাতীয় উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় পতাকা প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে উল্লেখিত রেজিমেন্টসমূহকে জাতীয় পতাকা প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী এ উপলক্ষে আয়োজিত কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট সদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে যেকোন ত্যাগ স্বীকারে সব সময় প্রস্তুত থাকার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ ‘বীর গৌরব’-এ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের অধিনায়ক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। তিনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অর্পিত দায়িত্ব পালনে সদা প্রস্তুত থাকার জন্য বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান। পরে তিনি রাজশাহী সেনানিবাসে নবনির্মিত রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ উদ্বোধন করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছলে তাকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া অভ্যর্থনা জানান। অভ্যর্থনা জানানোর সময় আর্টডক-এর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং মেজর জেনারেল আবুল কালাম মো. হুমায়ুন কবির, ১১ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং এবং এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল একেএম আবদুল্লাহিল বাকী এবং পাপা বীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিম আখতার উপস্থিত ছিলেন।
