বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি মালিকানা একটা বড় জটিল সমস্যা। ভূমি মালিকানাকে ক্রটিহীন করতে নানা সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সহজ করা হয়নি। বরং কোনো কোনো সময় সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর করে তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশে মোট কৃষিজমির পরিমাণ কত, বনাঞ্চল কত, নদী সিকস্তির জরিপ কোনোটাই আধুনিক নিয়মে হয়নি। দেশের সবচেয়ে বেশি অনিয়ম-দুর্নীতি, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ, মামলা-মোকদ্দমা ঘটে ভূমি সেক্টরে। এ সেক্টরে মানুষে মানুষে বিরোধ অনেক বেশি, মামলা রেকর্ডসংখ্যক। ভূমির ব্যবহারে চরম বিশৃঙ্খলা, স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। কৃষিজমিতে নির্মিত হচ্ছে শিল্প-কারখানা, গড়ে উঠছে আবাসন, জলাভূমি ভরাট করে ফেলা হচ্ছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে, বন উজাড় করে স্থাপন করা হচ্ছে পোল্ট্রি খামার কিংবা বসানো হচ্ছে করাতকল, পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে ইটভাঁটা।
বাংলাদেশ ভূমি ব্যবস্থাপনায় তিনটি প্রশাসন কাজ করে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) ভূমি জরিপের দায়িত্ব পালন করে এবং ভূমির স্বত্বলিপি বা রেকর্ড প্রণয়ন করে। মাঠপর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার থেকে শুরু করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেকর্ড হালনাগাদ, রক্ষণাবেক্ষণ, ভূমি রাজস্ব আদায় করেন। আর মাঠপর্যায়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন সাব-রেজিস্ট্রাররা করেন ভূমি রেজিস্ট্রেশনের কাজ। ‘বাংলাদেশ ভূমি প্রশাসন সংস্কার’ প্রকল্পের প্রস্তাবে বলা হয়েছে রেকর্ডের এ ত্রিমুখী উত্স একটি বড় ধরনের ক্রটি। সনাতন পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের কাজ সময় সাপেক্ষ ও জটিল ব্যাপার। বাংলাদেশে প্রথম ভূমি জরিপ কাজ সম্পন্ন করতে সময় লেগেছিল ৫৪ বছর। ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা সিএস রেকর্ড নামে পরিচিত সেই জরিপ ১৮৮৭ সালে শুরু হয়ে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত চলে। পরিবর্তী সময়ে জমিদারি প্রথা বাতিলের পর ১৯৫৫ সালে স্টেট একুইজিশনের আওতায় নতুন কার্যক্রম শুরু হয়। এসএ রেকর্ড নামে পরিচিত সে জরিপ সরেজমিনে করা হয়নি। জমিদারদের আওতাধীন প্রজা বা মালিকদের নামে মালিকানা স্বত্ব এবং খাসজমির তালিকা প্রস্তুত করাই ছিল সেই জরিপের উদ্দেশ্য। সেই এসএ রেকর্ড প্রণয়নের কাজ শেষ করতে ৭ বছর লেগে যায়। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দেশে সময় সাপেক্ষ ও জটিল সনাতনী পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ পরিচালিত হচ্ছে।
ব্যবস্থাপনার প্রথাগত পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক যন্ত্রপাতি (জিপিএস-গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম, ইটিএস-ইলেকট্রনিক টোটাল স্টেশন, ডেটা রেকর্ডার ইত্যাদি) ব্যবহার করে ভূমির জরিপ, আগের পরিবারভিত্তিক খতিয়ানের পরিবর্তে প্লটভিত্তিক খতিয়ান প্রণয়ন এবং এগুলোর ডিজিটাল সংরক্ষণই ডিজিটালকরণ ব্যবস্থার পূর্বশত। এই শর্ত পূরণে প্রাথমিকভাবে নরসিংদী সদর, যশোরের মনিরামপুর এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ডিজিটাল জরিপের প্রকল্প চালু করার লক্ষ্যে ৬৮টি ইটিএস, নয়টি ওয়ার্ক স্টেশন, ২৮টি ম্যাপ প্রসেসিং সফটওয়ার, তিনটি লেজার প্রিন্টার, দুটি ডিজেল জেনারেটরসহ বিভিন্ন আসবাব কেনা হয়েছে। কিন্তু দক্ষ লোকবল, প্রশিক্ষণ ও নানা জটিলতায় যন্ত্রগুলোর বেশিরভাগই অব্যবহূত থাকছে।
ভূমি কর আদায়ে সহকারী ও উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের বেতনক্রম ১৭তম গ্রেড থেকে ১১তম ও ১২তম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। কয়েক হাজার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া মামলাজনিত স্থগিতাদেশ রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক করা হয়েছে। অথচ প্রয়োজন ছিল এ বিষয়ে ডিপ্লোমা। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার), উপজেলা ভূমি অফিস জারিকারক, নামজারি সহকারী, সার্ভেয়ার, কানুনগো সকলের মধ্যমণি হিসেবে কাজ করেন এসিল্যান্ড বা সহকারী ভূমি কমিশনার। তিনি ভূমিসংক্রান্ত প্রশিক্ষিত কোনো কর্মকর্তা নন।
সাধারণ মানুষ জমির নকশা ও মালিকানার প্রামাণ্য কাগজ যাতে সহজে পেতে পারে তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ম্যানুয়ালি এই কাজ করার বদলে একে ডিজিটাল করা, ভূমির ম্যাপ, পরচা ইত্যাদি সেবা পিপিপি মডেলে তৈরি করা সময়ের দাবি। দুর্ভাগ্যজনক যে, বর্তমান সরকার ভূমি হস্তান্তর নিবন্ধন পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিলেও এর বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। দেশের সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলো এ কার্যক্রমের আওতায় এনে সব ধরনের নিবন্ধন ফরম, জমির ধরন অনুযায়ী নিবন্ধক খরচ এবং ্এ সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য নিবন্ধন বিভাগের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হলে সাধারণ মানুষকে আর দলিল লেখক, নকলনবিশ বা দালালদের ওপর নির্ভর করতে হতো না। প্রকৃতপক্ষে ভূমি নিয়ে দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাকে অরাজকতা বললে বাড়িয়ে বলা হয় না। দেশের ভূমি নিবন্ধন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং মালিকানা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ আনা সম্ভব হলে সামাজিক সমস্যা অনেক কমে যাবে। ভূমি মালিকানা নিয়ে জটিলতা না থাকলে সামাজিক অস্থিরতার অবসান হবে।
ঔপনিবেশিক আমলের ভূমির ত্রিমন্ত্রণালয় ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটানো প্রয়োজন। ভূমিসংক্রান্ত সকল কার্যক্রম আইন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা ডিজিটাল প্রক্রিয়ার অংশ। ভূমি জরিপ, দলিল লেখা, দলিল নকলনবিশ, মানচিত্র তৈরি, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ, জাতীয় পর্যায়ে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার), ভূমি রাজস্ব, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি প্রক্রিয়াকরণের কাজ পূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদদের ওপর ন্যস্ত করা হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
চট্টগ্রাম
