এক চিকিত্সক দম্পতি তাঁদের সন্তানদের নিয়ে সম্প্রতি দিল্লি সফরে গিয়ে ইভিনিং শো দেখার কথা জানিয়ে বললেন, বহুবছর পর ফ্যামিলি নিয়ে ছবি দেখলাম। দিল্লিতে ঐ প্রেক্ষাগৃহের সামনে গিয়ে দেখি বিশাল লাইন, সেখানে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটতে গিয়ে শৈশবের কথাই মনে পড়লো। আহা রাজ্জাক-কবরী-ববিতা-শাবানা পর্যন্ত ঢাকায় ভালো ভালো ছবি তৈরি হতো বলেই ২৫ কি ৩০ বছর আগেও প্রায় প্রতিটি ফ্যামিলি ইভিনিং আর নাইট-শোতে ছবিঘরে যেতো। আজকাল ঢাকায় তো ভালো ছবি হয় না, ‘পোড়ামন’ বলেন আর যে মনই বলেন না কেন নতুনত্ব চমক দিতে পারে না বলেই ছবি দেখা ছেড়ে দিয়েছি। ইন্ডিয়ান ঐ ছবিটি দেখে বেশ এনজয় করলাম। ওখানে সিনেমা হলের পরিবেশও বেশ আরামদায়ক। ছবির গল্প, গান, তারকাদের অভিনয় সবই মন ছুঁয়ে গিয়েছে। ছবি কীভাবে বানাতে হয় তা ওরা জানে। আর ঢাকার ছবিতে কী আছে— হিন্দি ছবি থেকে গল্প চুরি, গানের কথা এবং সুরও নকল। একই গল্প ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছবিও বানাচ্ছে ঢাকার চলচ্চিত্র নির্মাতারা। নেই কোনো মৌলিকত্ব। তাহলে দর্শক গাঁটের টাকা খরচ করে কেনইবা ছবি দেখবে। আর এদিকে কোনো কোনো চলচ্চিত্র নির্মাতা বলছেন, চলচ্চিত্রশিল্পের দিকে সরকার নজর দিচ্ছে না। তাঁদের এ কথা অযৌক্তিক নয় কি? যাঁরা ছবি নির্মাণ করছেন তাঁদের ছবি কি ভালো? তাঁরা কি পেরেছেন দর্শকদেরকে প্রেক্ষাগৃহমুখী করতে? পারেননি— দেখি না তো কোনো প্রেক্ষাগৃহের সামনে দর্শকের ভিড়। এদিকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটার সেই দিনও যেন চিরতরে ফুরিয়ে গেছে। তাহলে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ চলচ্চিত্রশিল্পখাতে অর্থ ঢেলে কী করবেন?
কেউ কেউ বলেন, এক শ্রেণির লোক চলচ্চিত্র নির্মাতার খাতায় নাম লিখিয়ে দু’চারদিন আনন্দ-ফূর্তি করে চলে যান অন্য পেশায়। কিন্তু এক কালের চলচ্চিত্র নির্মাতা আবদুল জব্বার খান, জহির রায়হান, মহিউদ্দিন, এহেতেশাম, মুস্তাফিজ, কাজী জহির, খান আতা, আলমগীর কবির প্রমুখ তো চলচ্চিত্রকে শিল্প মনে করতেন। তাঁরা তো বুকে লালন করেছিলেন চলচ্চিত্রকে। সেইজন্য আজও বাঙালি দর্শকদের স্মৃতিতে ‘রাজধানীর বুকে’, ‘আকাশ আর মাটি’, ‘যে নদী মরুপথে’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘নতুন সুর’, ‘জোয়ার এলো’, ‘দুই দিগন্ত’, ‘সূর্যস্নান’, ‘চান্দা, ‘অবুঝ মন’, ‘বেহুলা’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘সূর্যকন্যা’, ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ চিরকালের ছবি হয়ে থাকলো। দেখেছি গোটা দেশজুড়ে প্রতিটি ছবিঘরে দর্শকদের ভিড় উপচে পড়তো। যে করেই হোক প্রিয় তারকার ছবিটি যে দেখা চাই। সেই ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষা, উচ্ছ্বাস এখনকার মানুষের মধ্যে তো দেখি না। শৈশবকালে যখন সিনেমা দেখেছি, তখন দেখতাম ষাট-সত্তুর বছর বয়সীরাও ছবি দেখতে আগ্রহী ছিলেন। সেই যুগে কারো কারো প্রিয় তারকা ছিলেন কানন দেবী, চন্দ্রাবতী, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথেশ বড়ুয়া, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন প্রমুখ।
১৯৭২ সালের কথা। সেই বছর বাঙালির প্রিয় নায়িকা সুচিত্রা সেনের ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিটা রিলিজের ষোল বছর পরেও দেখেছি ঢাকার গুলিস্তান প্রেক্ষাগৃহের সামনে দাঁড়িয়ে অসংখ্য দর্শক ১০ টাকার টিকেট ব্লাকে ২০০ টাকায় কিনে দেখেছেন। এ কথা শুনে এ প্রজন্মের যে কোনো দর্শক হয়তো অবাকই হবেন। অবাক হওয়ারই কথা; ছবি চলে না এজন্যে বহু প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি অভিজাত ‘গুলিস্তান’ প্রেক্ষাগৃহটি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা সিনেমা হল নামে যে কিছু আছে এটাও ভুলতে বসেছে।
গত শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ ছবি বাঙালির মনে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। তখনকার ছায়াছবি ছিল সমাজজীবনের সুখ-দুঃখ নিয়ে রচিত বাস্তবধর্মী কাহিনি। ছায়াছবি দেখতে গিয়ে মনে হতো, আমাদেরই মতো সংসারের কোনো ভাঙাগড়া, আনন্দ-বিষাদ যেন পর্দায় প্রতিফলিত হয়েছে। অতীত দিনের ছায়াছবির সঙ্গে দর্শকদের একটা আত্মিক যোগসূত্র স্থাপিত হতো, যার ফলে ছবির আদর্শ চরিত্রগুলো মনের নিভৃতে যেয়ে নাড়া দিতো, অনুপ্রেরণা জোগাত তেমনিভাবে চলবার। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকবছর পরই দেশীয় ছবির সামাজিক সত্তা অবলুপ্ত হয়ে সেখানে স্থান দখল করলো উগ্র যৌনাবেদন বিচ্ছুরণের পঙ্কিল প্রেরণা। আজ যাঁরাই ছবি বানাচ্ছেন তাঁরাই কিন্তু বিদেশি আচার-আচরণ ও সভ্যতার স্পর্শ লাগা ভগ্নপ্রায় নারীদেহ পর্দায় প্রতিফলিত করার বিষয়টি প্রধান উপজীব্য হিসেবে বেছেই নিয়েছেন। তা দেখবার জন্য রুচিবান দর্শকরা কেনইবা আসবেন! এ অবস্থায় বলতে হয়, ঢাকার ফিল্মের আজ কীই না করুণ অবস্থা! এককালের গৌরবময় ফিল্ম জগত্টা আজ কীই না দৈন্যদশায় চলে গেলো!! এজন্যে দায়ী এখনকার চলচ্চিত্র নির্মাতারাই।
ঢাকা
