বিপথগামী পাখিদের নিঃশঙ্ক উড়ে চলা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৫২
যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর পরিবর্তন ও সভ্যতাকে আরও সভ্য করে তুলছে তরুণরা। এই তরুণরাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই তরুণ যারা শারীরিক বার্ধক্য বা বাধার কথা ভেবে বসে থাকে না। তারা তারুণ্যের জয়গানে উদ্দীপ্ত সেই তরুণ যারা বিজয়কেতন উড়িয়ে চলে দেশ থেকে দেশান্তরে। সব অভিশাপ আর কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে যৌবনের মুখোশেই না শুধু, বার্ধক্যেও তারা মনের শান্তিতে জয় ছিনিয়ে আনে। প্রতিষ্ঠা করে মুক্ত ও চেতনাউদ্দীপ্ত সংস্কৃতির বন্ধন। আর এই তরুণদেরই একটি সংগঠন হচ্ছে ‘স্ট্রে বার্ড’। প্রায় দেড় বছর আগে সংগঠিত এই সংগঠন মূলত স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি প্রয়াস। রাজধানীর ধানমন্ডি-১৫ এর কেয়ারী প্লাজার তিন তলায় তাদের কর্মস্থল। এর মূল উদ্যোক্তা প্রিসিলা চৌধুরী। তিনিই হাতেখড়ি করে দিয়েছেন এই মুক্ত বিহঙ্গদের একটি অবাধ সাংস্কৃতিক মঞ্চ গড়তে। যেখানে, ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা, যৌন হয়রানি, র্যাগিং মাদক ইত্যাদি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করে ও সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে নিজ ক্যাম্পাসের পরিবেশ সুন্দর ও পড়ালেখার উপযোগী করতে সহায়তা করে। সংগঠনটির বর্তমান প্রধান হচ্ছেন তাসলিম আরা আশরাত। তিনি স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। তাকে ঘিরেই বর্তমানে এই স্ট্রে বার্ড সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে লাইমলাইটে চলে আসা একটি ইস্যু হচ্ছে মাদক আর এই মাদক নিয়ে সাধারণ মানুষের বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাদকের আখড়া। কিন্তু স্ট্যামফোর্ড আমাদের এই বিষয়ে ভিন্ন ধারণা দেয়। মাদক আর এর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও এর প্রতিকার নিয়ে বেশ কিছুদিন কথাবার্তা হয় স্ট্রে বার্ডে। স্ট্রে বার্ডের কার্যকরী সদস্য মোঃ ইমারত হোসেন বলেছেন, ‘ক্যাম্পাসে সুস্থ ও স্বাভাবিক পড়ালেখার পরিবেশ আনার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে স্ট্রে বার্ড। কোনো বিশেষ দিবস, যেমন স্বাধীনতা দিবস বিজয় দিবস এসব দিন ছাড়া আমাদের ঢাকঢোল পিটিয়ে কর্মসূচি কিংবা সেমিনার করা হয় না। আমরা মূলত গঠনমূলক আলোচনায় বিশ্বাসী যেখানে সবার অংশগ্রহণ আর মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়।’ বেশিরভাগ মাদকসেবী শিক্ষার্থী কৌতূহলের বশে বা বন্ধুদের তাড়নায় কিংবা সাময়িক কোনো হতাশার কারণে, আবার কেউ নিছক শখ ও ফ্যাশন হিসেবে প্রাথমিকভাবে মাদক গ্রহণ শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে তার শরীর ও মন মাদকনির্ভর হয়ে পড়ে। আর ক্যাম্পাসে মাদকদ্রব্য সেবনে প্রধান ভূমিকা পালন করে মানসিক হতাশা আর প্রেমে ব্যর্থতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ মাদকসেবী ছাত্রীরা প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই মাদক গ্রহণ করে থাকে। একদিকে যেমন মাদকের ব্যবহার ও ব্যাপ্তি বেড়ে চলেছে, আরেকদিকে তেমনি মাদকবিরোধী সচেতনতাও থেমে নেই। মিডিয়ায় চলছে মাদকবিরোধী প্রচারণা। পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে এ বিষয়ে প্রতিবেদন। কিন্তু আলোচনা করে যে সমাধান পাওয়া যায় অন্যভাবে তা পাওয়া সম্ভব নয়। আর সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে স্ট্রে বার্ড। ক্যাম্পাসের কোথাও মাদকদ্রব্য বহন বা মাদকাসক্ত কাউকে পাওয়া গেলে তাদের সাথে কাউন্সেলিং করার ব্যবস্থাও আছে সংগঠনটির। একটি বক্তব্যে সংগঠনের প্রধান বলেন, ‘আচরণগত সমস্যা যাদের, তারা মিথ্যা কথা বলে, চুরি করে, অন্যের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে, মারামারিতে লিপ্ত থাকে, যৌন হয়রানি করে, অন্যের সম্পত্তি ধ্বংস করে, মা-বাবার বাধা সত্ত্বেও ঘরের বাইরে অধিক রাত পর্যন্ত কাটায়, এমনকি ঘর থেকে বের হয়ে যায়, স্কুল-কলেজ পড়াশুনায় ফাঁকি দেয়, অনৈতিক ও নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। জড়িয়ে পড়তে থাকে নানা অপরাধমূলক কাজে। তাদের সাথে কথা বলে আমরা তাদের নৈতিকতা ও মা-বাবার প্রতি সম্মান আর মূল্যবোধ সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা দিয়ে থাকি।’ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে র্যাগিং। এটি এক প্রকার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। এর প্রভাবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রচুর শিক্ষার্থী আত্মহত্যাও করে। আমাদের দেশেও আছে এই র্যাগিংয়ের সমস্যা। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর পড়ালেখার মন-মানসিকতা নষ্ট হয়ে যায়। তারা ক্যাম্পাসে আসতে ভয় পায়। বড় ভাই বা বোন দ্বারা সাধারণত নিপীড়নের স্বীকার হয় নতুন আসা শিক্ষার্থীরা। এই সমস্যার ব্যাপারে আরেক কার্যকরী সদস্য মোঃ বিপ্লব বলেন, ‘আমাদের সহনশীলতা বাড়ায়, নৈতিক ক্ষেত্র বিস্তৃত করে, সৃজনশীলতার মান বৃদ্ধি করে, চিন্তা প্রণালিকে অধিকতর নমনীয়, সমন্বয়পূর্ণ ও কার্য উপযোগী করে এমন কিছু ব্যাপার নিয়ে আমাদের সংগঠন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে বেশ ভালো ফল পেয়েছে। যার ফলে প্রতিষ্ঠানে র্যাগিং প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে। আর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে।’ সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে এর বেশ কিছু নাটক হয়েছে যার মধ্যে দেশাত্মবোধক নাটক পতাকা পিআইবির সহায়তায় মঞ্চস্থ হয়েছে। এই সংগঠনের হাত ধরে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে একটি সুস্থ ও পরিপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন। এই বিপথগামী পাখিদের পথচলা এখানেই থামবার নয়, যেতে হবে বহুদূর।