প্রজন্ম প্রত্যাশা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:০৩
‘পেশা হিসেবে এখনও ডিজাইনিং শৈশবেই আছে। তাই আমাদের দেশে প্রচুর কাজ করার সুযোগও রয়েছে’ অনিন্দ্য পণ্ডিত স্থপতি, ব্রিক কনসালটেন্ট ছেলেটি প্রথম সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ দেখার পর নিজেকে বহুদিন অপু বলে মনে করতেন। ব্রহ্মপুত্র নদী এবং তার পাশের কাশবনে বহুদিন চিত্রাঙ্কনরত এই কিশোরের সময় কেটেছে। মূলত নন্দনতত্ত্ব শেখার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পথ হয়তো নেই। তবে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করলে নন্দনতত্ত্বের সম্পর্কে উপলব্ধি জন্মায় সেই চিন্তাভাবনা থেকে মা গড়ে দিলেন তার ছেলের জন্য সে নন্দনতত্ত্বের পরিবেশ। সেদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটিই বর্তমানে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার অনিন্দ্য পণ্ডিত। মূলত তিনি একজন স্থপতি। স্থাপত্যের সাথে ইন্টেরিয়র ডিজাইন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রেই ইন্টেরিয়র ডিজাইনকে স্থাপত্য থেকে আলাদা করা কঠিন। ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে অনিন্দ্য বলেন, ‘আমাদের দেশে পেশা হিসেবে ইন্টেরিয়র ডিজাইন এখনও শৈশবেই আছে। প্রচুর কাজ করার সুযোগ রয়েছে আমাদের দেশে। যে ভলিয়্যুমে কন্সট্রাকশন হচ্ছে তার ৫ ভাগও যদি পুরোপুরি ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা হয় তার সাপোর্ট দেওয়ার মতো ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের সংখ্যাঘাটতি আছে। সবচেয়ে আশার কথা এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্লায়েন্টরা শিক্ষিত ও সচেতন। এ ছাড়া কোনো একটি নতুন কাজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব যা ইন্টেরিয়র ডিজাইনকে আরও নান্দনিক ও নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেয়। ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কোনো প্রজেক্ট শুরু করার প্রথমেই যে জিনিসটি নিয়ে কাজ শুরু করি তা হলো এর ব্যবহারিক দিক। এরপরই আসে মেটেরিয়াল। আমি চেষ্টা করি সব সময় লোকাল মেটেরিয়ালে কাজ করতে। ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ের মধ্যে যে কাজটা করা হয় তা হচ্ছে পরিবেশকে আনন্দঘন এবং আরামদায়কভাবে তৈরি করা। তাই আমার প্রচেষ্টাটা থাকে সব সময় এমন একটা পরিবেশ গড়ে তোলা যাতে আমাদের নিজস্ব কালচার, পরিবেশ আমরা খুঁজে পাই।’ ০০০ ‘ডিজাইনিং পেশাটা এখন শুধু আর শখ নয়, বরং সেটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে’ ফারজানা গাজী সিইও, ফারজানা’স ব্লিস ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি করতে ভীষণ ভালো লাগত মেয়েটির। তখন মাত্র এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছেন। সেটা ১৯৯৮ সালের কথা। শখ করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের জন্মদিন, বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে ডেকোরেশন করতে পছন্দ করতেন। তারপর নিজেকে একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন একজন সফল ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে। বলছিলাম ফারজানা’স ব্লিসের সিইও ফারজানা গাজী সম্পর্কে। ফারজানা গাজী ২০০৩ সালে দ্য পিপলস্ ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এই পেশা নিজের প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ইন্টেরিয়র ডিজাইন পেশাটা যথেষ্ট সম্মানজনক একটি পেশা মনে হয় এবং কিছু চ্যালেঞ্জিংও বটে। বর্তমানে আমাদের দেশে এই পেশাটা বেশ জনপ্রিয়। ইন্টেরিয়র ডিজাইন পেশা কেবল আধুনিক নয়, সময়োপযোগী এবং সম্মানজনকও বটে। দরকার শুধু সময়মতো দিকনির্দেশনা। আজকাল ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট স্মার্ট এবং তারা বিভিন্ন পেশায় কাজ করছে। মানুষ যুগের সাথে সাথে তার চিন্তাভাবনাকেও পরিবর্তন করছে। ডিজাইনিং পেশাটা এখন শুধু আর শখ নয়, বরং সেটা মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আর নতুন যারা ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ে আসছে তাদের কাজ অনেক ভালো হচ্ছে। তারা শুধু বিদেশি নয়, আমাদের দেশীয় মেটেরিয়াল ব্যবহার করেও অনেক ভালো এবং নান্দনিক কাজ করছেন। নতুনদের ভালো করার জন্য আমার পরামর্শ একটাই, তা হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি থাকতে হবে আন্তরিকতা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, আগ্রহ, ধৈর্য, মনোযোগ; সর্বোপরি অন্যের পছন্দকে বুঝার ক্ষমতা থাকা। আমার স্বপ্ন দেশকে ভালোবেসেই দেশের মানুষের জন্য কিছু একটা করা।’ ০০০ ‘শুধুমাত্র সৌন্দর্য ও শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তোলাই নয়, সেই সাথে আধুনিক সময়ের চাহিদা মেটানো এই পেশার অন্যতম শর্ত’ রাজিন গিয়াস ইন্টেরিয়র আর্কিটেক্ট ও ম্যানেজিং পার্টনার, ফিগার এইট রাজিন ইন্টেরিয়র ডিজাইনের উপর কাজ করছেন অনেকদিন যাবত। চেয়েছিলেন নতুনত্বের সাথে পরিচিত হতে এবং ডিজাইন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই একটি ডিজাইনিং ফার্ম শুরু করলেন, তৈরি হলো একটি নতুন নাম ফিগার এইট। আর আমাদের দেশে এই পেশার জনপ্রিয়তা এবং এই পেশা নিয়ে তার প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে রাজিন বলেন, ‘বিশ্বের সাথে সাথে আমাদের দেশেও এই পেশা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। এই যান্ত্রিক সভ্যতায় ছকে বাঁধা জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সবাই ছুটে চলছে। তাই সাধ ও সাধ্য থাকার পরও অনেকেই তাদের প্রতিষ্ঠান এমনকি নিজের বাসাটিকেও সাজিয়ে তোলার সময় পান না। আজকাল সবাই চায় তাদের বাসা বা অফিসটিকে আধুনিক ও নান্দনিক সাজে সজ্জিত করতে। মানুষ বাড়ার সাথে সাথে আমাদের বসবাসের জায়গাও কমে আসছে। আমাদের ফ্লাটগুলো হচ্ছে ছোট ছোট। এই ছোট্ট জায়গাকে কাজে লাগিয়ে আসবাব, লাইট, গৃহসজ্জা সামগ্রীর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বাসা, অফিস বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে আরামদায়ক ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করতে হলে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের প্রয়োজন। আর এজন্যই এই পেশাটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত। আর নতুন যারা আসছে তারা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের থেকে ভালো করছে। আমাদের সময় তো এত প্রতিষ্ঠান ছিল না। এখন তো অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে শেখার জন্য। নতুনরা তাদের সৃজনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে এই পেশাটিকে আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র সৌন্দর্য ও শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তোলাই নয়, সাথে সাথে আধুনিক সময়ের চাহিদা মেটানোও এই পেশায় উন্নতির মূল শর্ত। তাই নতুনদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো—বাজারে আসা নতুন প্রযুক্তি ও ইন্টেরিয়র উপকরণ সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে এবং কাজের ক্ষেত্রে দেওয়া সময়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। এ দুটো বিষয় মেনে চললে সাফল্য আসবেই।’