সাভার এলাকার শিল্পে গ্যাস সমস্যা সহসাই কাটছে না। পরিকল্পিতভাবে এই এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ালে সংকট থেকেই যাবে। এলেঙ্গায় কমেপ্রসার স্থাপন শেষ হলে কিছুটা সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছেন।
গত কয়েক মাস ধরে সাভার শিল্প এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। সংকট উত্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষের তেমন কোন উদ্যোগ নেই। শুধু আশার কথা বলা হচ্ছে।
সিলেট থেকে যে গ্যাস ঢাকা আসছে, এলেঙ্গা থেকে তার একটা অংশ আলাদা হয়ে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু দিয়ে উত্তরাঞ্চলে চলে যাচ্ছে। বাকি অংশ আসছে সাভার হয়ে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত। ওদিকে ধনুয়া দিয়েও অন্য একটি পাইপে গ্যাস আসছে নারায়ণগঞ্জ হয়ে। দুই দিকেরই শেষ মাথায় সাভার শিল্প এলাকা। যে কারণে সাভারে গ্যাসের চাপ সবচেয়ে কম।
জানা গেছে, আশুলিয়া থেকে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) সরাসরি গ্যাস সরবরাহের পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ১৪ (১৩.৫ কিমি) কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপে সরাসরি ইপিজেডে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। ইপিজেড কর্তৃপক্ষ নিজ খরচে এই পাইপ লাইন স্থাপন করে নিয়েছে। এতে ইপিজেড-এর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস পাবে। চলতি সপ্তাহেই এই পাইপে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এতে ইপিজেড-এর বাইরের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংকট আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা জানিয়েছেন, এই এলাকার জন্য বরাদ্দ না বাড়িয়ে আগের বরাদ্দ থেকেই সরাসরি ইপিজেডে গ্যাস সরবরাহ করা হয় তবে ইপিজেড এর বাইরের গ্রাহকদের কোন উপকার হবে না।
তিতাসের সাভার আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমাদের মোট সরবরাহের প্রায় ৯০ ভাগই শিল্পখাতে করে থাকি। তারপরও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কিছু কম আছে।’ তিনি বলেন, ‘এলেঙ্গায় একটি কমেপ্রসার স্থাপন করা হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে এই কমেপ্রসার চালু হতে পারে। তখন গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়বে বলে আশা করি।’
সাভার-গাজীপুর এলাকায় ৪৮৪ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। এছাড়া ২৫০টি ক্যাপটিভ বিদ্যুত্ কেন্দ্র, ২৫০টি সিএনজি স্টেশন এবং ২১৪টি বাণিজ্যিক শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। এই এলাকায় আবাসিক গ্রাহক আছে এক লাখ ১০ হাজার ৬৭৩টি। প্রায় ১০০ শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে যারা নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেছে।
সাভারের আগে গাজীপুর থেকে তিনটি সঞ্চালন লাইনে গ্যাস আলাদা করে সরবরাহ করা হচ্ছে। আর গাজীপুর পর্যন্ত আসছে সিলেট থেকে সরাসরি। গাজীপুরের জয়দেবপুর সিটি গেট-এ গিয়ে দেখা গেল, তিনটি সঞ্চালন লাইনে গ্যাস আলাদা করে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি লাইনের প্রতি বর্গইঞ্চিতে ১৫০ পাউন্ড এবং অন্যটিতে ৫০ পাউন্ড করে গ্যাস দেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেয়া হচ্ছে অনেক কম। এই তিনটি সঞ্চালন লাইনের মধ্যে একটি দিয়ে ঢাকা, সাভার এলাকায় গ্যাস আসছে। একটি দিয়ে যাচ্ছে টাঙ্গাইলের দিকে এবং অন্য একটি দিয়ে গাজীপুর-কোনাবাড়ির দিকে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত কয়েক মাস ধরে প্রতিমাসেই এখান থেকে একটু একটু করে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। গত মে মাসে এখান থেকে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল ২৮ লাখ ২১ হাজার ৫ এমসিএফ (মিলিয়ন ঘনফুট)। জুন মাসে তা কমিয়ে আনা হয় ২৭ লাখ ১৪ হাজার ৮৩৮ এমসিএফ। জুলাই মাসে একটু বাড়িয়ে দেয়া হয় ২৭ লাখ ৬৪ হাজার ৭২২ এমসিএফ। কিন্তু আগস্ট মাসে আবার কমিয়ে সরবরাহ করা হয় ২২ লাখ ৫১ হাজার ৪১০ এমসিএফ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুত্ কেন্দ্রে বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে বলে এই এলাকার শিল্পে গ্যাস সংকট বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলের একটি বিদ্যুত্ কেন্দ্রে এই গ্যাস দেয়া হচ্ছে।
এলেঙ্গা থেকে চন্দ্রা হয়ে সাভার এবং এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে উত্তরাঞ্চলে যাওয়ার মাঝে গ্যাস আলাদা করার কোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র নেই। যে কারণে এখান থেকে ইচ্ছে করলেও গ্যাস সরবরাহ কম-বেশি করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। এলেঙ্গায় কমেপ্রসার স্থাপন হলে এই বিভাজন সম্ভব হবে।
সাভার এলাকার শিল্প উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, শুধু ইপিজেড-এর ভেতরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যই গ্যাসের নিশ্চয়তা দিলে হবে না। কারণ ইপিজেড এর ভেতরে যত শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে এর বাইরে। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান সচল রাখতে ইপিজেড-এর মতো সেগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিশেষ উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
এদিকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করেছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। গত ৫ সেপ্টেম্বর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাভারের হেমায়েতপুর স্কুলপাড়ায় অবৈধভাবে স্থাপিত এক ইঞ্চি ব্যাসের ৭৫০ ফুট গ্যাস বিতরণ লাইন অকেজো করে দেয়া হয়েছে। এখানে ১১টি আবাসিক ও ১টি বাণিজ্যিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার আহসান উল্লাহ রোড ও বেচারাম দেউরী রোড এলাকায় অনুমোদনহীন ২১ টি চুলার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
