মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবালয়ে সচিবদের সঙ্গে গত ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ বৈঠকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে সরকার দলীয় অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য থেকে আমরা জানতে পারি আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে যেকোন সময় ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়ে মন্ত্রী পরিষদ কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। বর্তমান মন্ত্রিসভা বহাল থাকবে। বহাল থাকবে সংসদ। সংসদ সদস্যরা তাদের স্ব স্ব পদে থেকে যাবেন। কিন্তু ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারি সময়ের মধ্যে কোন সংসদ অধিবেশন বসবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে আমরা যে উপসংহারে আসতে পারি তা হলো—
(ক) বর্তমান মন্ত্রিসভা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে কাজ করবে; এই মন্ত্রিসভার কার্যকালীন সময়ে সম্ভবত উপদেষ্টারাও স্বীয় পদে বহাল থাকবেন।
(খ) মন্ত্রী পরিষদ কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না;
(গ) সাংসদগণ নির্বাচনকালীন সময়েও তাদের স্ব স্ব পদে বহাল থাকবেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি মন্ত্রিসভার সকলেরই থাকা কি আবশ্যক— যদি সেই মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা না থাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ছোট মন্ত্রিসভা থাকাই ট্র্যাডিশন। ভারত, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় এই ঐতিহ্যই মেনে চলা হয়। অন্যদিকে, বড় মন্ত্রিসভা অব্যাহত থাকলে ক্ষমতাসীনদের প্রভাব নির্বাচনকালীন সময়ে পড়বে—এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকেই খুব সহজেই নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে পারেন। বড় মন্ত্রিসভা রাখার পক্ষে আরও যুক্তি হতে পারে মন্ত্রীরা কেউই ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে চান না অথবা বিরোধী দলের আন্দোলন ঠেকাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর পাশে সবাইকে সার্বক্ষণিক রাখতে চান। সর্বোপরি প্রশাসনিক এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে অব্যাহত রাখার স্বার্থে মন্ত্রীদের ক্ষমতা যদি সচিবদের কাছে হস্তান্তর করা হয় তাহলে এই বড় আকারের মন্ত্রিসভার প্রয়োজন আছে কী?
বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভা কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না। কোন্ সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ আর কোনিট গুরুত্বপূর্ণ নয়—এ বিষয়টি বর্তমান মন্ত্রিসভা নির্ধারণ করবে, যার সুবিধা ক্ষমতাসীনদের অনুকূলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তৃতীয় প্রস্তাবটি হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সময়ে সংসদ সদস্যদের বহাল রাখা। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই বিধানটি রাখাই যথেষ্ট। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে একজন সংসদ সদস্য তার এলাকায় নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করবেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনকে তাদের মতো করে ব্যবহার করতে চাইবেন, যা স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল দলের প্রার্থীদের জন্য একটি সমতল ক্ষেত্র তৈরিতে প্রতিবন্ধক হবে। অথবা ৩৫০ জন সাংসদই চাইছেন সাংসদ হিসেবে তাদের সকল ধরনের আর্থিক বা অ-আর্থিক সুযোগ-সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখতে। এটি সম্পূর্ণ অনৈতিক। কেননা সংসদ অধিবেশন যদি না থাকে, তাহলে সাংসদদের আর কোন কাজ থাকতে পারে না। আইন প্রণয়নই তাদের মূল কাজ। সাংসদরা যদি সংসদ অধিবেশনের অনুপস্থিতিতে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেয়, তাহলে তা হবে চরম দুর্নীতি।
আওয়ামী লীগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারণাকে সমর্থন করেছিলাম। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাকে আমি গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি বলে মনে করি। ছোট আকারের মন্ত্রিসভাসহ এবং যেখানে সংসদ বিলুপ্ত থাকবে এরকম একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারণাই সংসদীয় গণতন্ত্রে ঐতিহ্য হিসেবে গৃহীত এবং এই ঐতিহ্য অনুসারে মেয়াদ শেষের পূর্ববর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। যা আমাদের সংবিধানের ১২৩/৩(ক) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আমি নিশ্চিত ছিলাম আওয়ামী লীগ এরকমই একটা সিদ্ধান্ত নিবে। এরকম ইঙ্গিতও সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যেও ছিলো।
প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান যদি কৌশলগত হয়, তাহলে আমি বলবো এটি ভুল কৌশল। এই কৌশল আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় আরও ধস নামাবে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দায় আওয়ামী লীগের ওপরই বর্তাবে। বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সূত্র থেকে শুনা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় থাকতে চায়। এর পেছনে তারা তিনটি যুক্তি দিচ্ছে। প্রথমত: আওয়ামী লীগ তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে অব্যাহত রাখতে চায়। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ভাষ্যমতে, বিএনপি তাদের গৃহীত উন্নয়ন উদ্যোগ বন্ধ করে দিবে। এটি সামনে যেকোন সময় বিএনপি ক্ষমতায় আসলে করবে না, তার কোন নিশ্চয়তা আছে কী? দ্বিতীয়ত: বিএনপি ক্ষমতায় আসলে বিএনপি-জামায়াত-শিবির, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উপর প্রতিহিংসামূলক আচরণ করবে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। আবার এও শুনা যাচ্ছে, প্রশাসনের একটি অংশ এই সরকারকে রাখার পক্ষে। তাদের মতে, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আবারও ওএসডি অথবা চাকরিচ্যুত হতে হবে। তাই এই সরকারকে তারা ক্ষমতায় অব্যাহত রাখার পক্ষে। তৃতীয়ত: যে যুক্তিটি আমি একজন ছাত্রনেতার মুখে শুনেছি যে, বাংলাদেশ উদারনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই তারা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চায়। এ প্রসঙ্গে ছাত্রনেতার বক্তব্য হচ্ছে— হেফাজতের ০৫ মে’র ঘটনা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা এটিকে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের দুর্বলতা হিসেবেই দেখে।
এই যুক্তিগুলোর মধ্যে কিছু গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু এর মধ্যে অসারতাও কম নয়। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার দায় শুধু আওয়ামী লীগের একার নয়। আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো যদি বিএনপি এসে বন্ধ করে দেয়, তাহলে জনগণের কাছে বিএনপির ভূমিকা সমালোচিত হবে। আর তাতে আওয়ামী লীগের দোষী হওয়ার কোন কারণ নেই। বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের প্রতিহিংসা মোকাবেলায় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করতে সক্ষম। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলে এটি কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করা আওয়ামী লীগের জন্য কোন কঠিন কাজ ছিল না বলে আমি মনে করি।
তৃতীয় যুক্তিটি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। হেফাজতের অপ-প্রচার বন্ধের দায়িত্ব সরকারের এবং সরকার তা যথার্থভাবেই করছে। গণতন্ত্র কখনই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় শাসক শ্রেণীর হাত-পা বেঁধে রাখতে বলেনি। বরং অপপ্রচার রোধে সরকার কোন যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে, তা হতো শাসন ক্ষমতা প্রয়োগের ত্রুটি। গণতন্ত্রকে আমরা বাস্তবে চর্চা করি না বলে এর সৌন্দর্য আমরা অনুভব করি না।
যাহোক, যদি ক্ষমতাসীন দল ০২ সেপ্টেম্বর ফর্মুলায়ই নির্বাচন করে তাহলে বিএনপি কী ঐ নির্বাচনে অংশ নেবে? এটি সুনির্দিষ্ট করে বলা এখনও কঠিন। তবে, বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে- এক. জনপ্রিয়তায় বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে এগিয়ে যার প্রমাণ বিগত ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়; দ্বিতীয়ত: বেগম খালেদা জিয়া তার ছেলে তারেক জিয়াকে দলীয় রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে ক্ষমতায় যাওয়া ছাড়া আর সামনে কোন বিকল্প নেই এবং তৃতীয়ত: নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য কঠিন হবে। কেননা, দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদেরকে এই নির্বাচন থেকে দূরে রাখা সম্ভবপর হবে না। তাই বিএনপির যে কোন অবস্থায় নির্বাচনের সম্ভাবনাই বেশি। সেক্ষেত্রে বিএনপিকে নির্বাচনের দিনে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। অধিক সংখ্যক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে দর কষা-কষি করতে হবে। আরপিও সংশোধনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে চাপ দিতে হবে। যে দল (আওয়ামী লীগ) গণতন্ত্রের জন্য ৬৪ বছর ধরে সংগ্রাম করেছে, সেই দল কী প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রকে ভয় পায়? পরাজয়ের আতঙ্ক কী তাদেরকে তাড়া করছে? নির্বাচনে পরাজয়ের উপর বিশ্বাস না রাখলে, গণতন্ত্রের উপর বিশ্বাস অর্থহীন। সবশেষ কথা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে অব্যাহত রাখতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে তিনটি পদক্ষেপের কথা বলেছেন তা বিরোধী দলের অবস্থানের যথার্থকে প্রমাণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর উপরোক্ত অবস্থান একটি অবাধ প্রতিযোগিতামূলক এবং স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত করবে। এতে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি দেশি-বিদেশি শক্তির কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
