প্রতিবছর বিশ্বে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। আর ৪০ লাখ টিনএজার চেষ্টা চালায় আত্মহত্যার - এদের মধ্যে এক লাখ সফল হয়ে চলে যায় পরপারে। যুদ্ধ, টেরোরিস্ট বা সন্ত্রাসী আক্রমণ কিংবা খুনের শিকার হয়েও এত মানুষ মারা যায় না পৃথিবীতে। বিশ্বজুড়ে গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যা করে প্রায় ৩০০০ জন। প্রিয়জনের আত্মহত্যার যন্ত্রণার পেরেক বুকে ঠুঁকে নিয়ে ৬০ লাখেরও বেশি স্বজনেরা ধুঁকে ধুঁকে পার করছে জীবন। জীবিত থেকেও মৃত তারা। এ ধরনের অকাল মৃত্যু রোধ করার জন্য সার্বিকভাবে বুঝতে হবে আত্মহত্যা প্রচেষ্টা গ্রহণকারীর মন। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে স্বজন, বন্ধু ও গণমাধ্যম কর্মীদের। সামাজিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে তাদের প্রতি। বুঝতে হবে আত্মহত্যা প্রচেষ্টাকারীর আচরণ, ইনটেনশন বা মনোভাব। তাদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে পর্যাপ্ত মানসিক চিকিত্সাসেবা। ফলোআপ সেবার দিকেও নজর দিতে হবে। আমরা লক্ষ্য করছি অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও প্রচলিত নানা ধরনের মিথের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে আত্মহত্যার সংখ্যা। সমপ্রতি বলা হচ্ছে বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে মানুষ নিজেই খুন করছে নিজেকে এবং আত্মহত্যা চেষ্টাকারীর সংখ্যা আরো ১০-২০% বেশি। ব্যাপক সংখ্যক জনগোষ্ঠি মানসিক অসুস্থতার কারণে সুইসাইড করে চলে যাচ্ছে না ফেরার দেশে। আইএএসপি-এর মতে, আগামী দুই দশকে সব ধরনের রোগ-শোকের মধ্যে পঁচিশ শতাংশ বোঝা হিসেবে গণ্য হবে মানসিক রোগ। কিন্তু মানসিক রোগ ও আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রতি রয়েছে জনগোষ্ঠির অসচেতনতা; চিকিত্সার প্রতিও রয়েছে নেতিবাচক মনোভাব, রয়েছে বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করা যায় গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রচারণা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপক পরিবর্তন দরকার, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো বিবেচনা করে গ্রহণ করতে হবে চিকিত্সাসেবা। লজ্জা-শরমের ফাঁদে আটকে থেকে সমস্যাকে লুকিয়ে রাখলে দিন দিন বাড়তে থাকবে আত্মহত্যার সংখ্যা। দরকার ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চাও। সর্ব ধর্মেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে নিজেই নিজেকে খুন করার অধিকার।
কয়েকটি ঘটনার দিকে ফিরে তাকাতে পারি আমরা:
যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে গলাচিপা সদর উপজেলার দক্ষিণ দরান্দি গ্রামের রীতা রানী দাস (২১) আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। ঢাকার বড় মগবাজার এলাকার স্বামীর ভাড়া করা বাসায় বৈদ্যুতিক ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন রীতা (জনকণ্ঠ, ৩ নভেম্বর ২০১০)। নীলফামারী ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামে প্রেম করে বিয়ে করার পর যৌতুক লোভী অভিভাবকের চাপের কারণে বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন নববিবাহিত স্বামী-স্ত্রী (ইত্তেফাক, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১০)।
ইভটিজিংয়ের আরো এক বলি ত্রিশালের রিপা রানী। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার এই কলেজ ছাত্রী ইভটিজিংয়ের বলি হয়েছে। সাউথকান্দার রায়ের গ্রামের অমূল্য চন্দ বর্মনের মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্রী রিপা রানী বর্মন এ পথ বেছে নেন। একই গ্রামের মনোরঞ্জন বর্মনের বখাটে ছেলে রাজু চন্দ বর্মন রিপার যাওয়া-আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতো এবং প্রেম নিবেদন করে উত্ত্যক্ত করতো। একপর্যায়ে রিপার লেখাপড়া বন্ধ হবার উপক্রম হলে তার পরিবারে হতাশা নেমে আসে। রিপার বাবা এ ব্যাপারে বারবারই রাজুর বাবার কাছে ঘটনা অবহিত করলেও কোন কাজ হয়নি। পরন্তু রিপার উপর আরো মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। একপর্যায়ে তা সইতে না পেরে রিপা বিষপান করে আত্মহত্যা করে (ইত্তেফাক, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১০)।
‘যারা আমার চিঠি পড়বেন, তাঁদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ- আমার মতো আর কারো জীবন যেন নষ্ট না হয়। এসব বখাটে ছেলের কবলে যেন আমার মতো আর কাউকে পড়তে না হয়।’ গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করার আগে নিজের ডায়রিতে এসব কথা লিখে রেখে গেছে কলেজ ছাত্রী চৈতি আক্তর (১৭)। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে (কালের কণ্ঠ, ১৪ ডিসেম্বর ২০১০)। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ডা. ফজলে রাব্বী হলের আবাসিক ছাত্র নাহাল অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। জানা যায়, নাহাল দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। দুপুরে হলের সামনে চায়ের দোকানে গিয়ে তিনি চায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খান। এরপর হলে গিয়ে নিজ কক্ষে শুয়ে পড়েন। রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তার সহপাঠীরা হল থেকে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিত্সাধীন নাহাল মারা যায় ( কালের কণ্ঠ, ১১ ডিসেম্বর ২০১০)।
উত্ত্যক্তকারীর কবল থেকে রেহাই পেতে ফরিদপুর সদর উপজেলার মুক্তি রানী মন্ডল(১৪) নামের এক মেয়ে স্কুল পালায়। আশ্রয় নেয় বাবার বাড়ি ছেড়ে মামার বাড়িতে। এরপরও শেষরক্ষা হয়নি তার। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পর উত্ত্যক্তকারী তাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এতে লজ্জা ও ক্ষোভে বিষপানে আত্মহত্যা করে সে(প্রথম আলো, ৪ জানুয়ারি ২০১১)।
কমল দাস পটুয়াখালী জেলা খাদ্য দপ্তরের একজন ঝাড়ুদার। ২৬ বছর ধরে তিনি অস্থায়ী ভিত্তিতে (মাস্টাররোল) কাজ করছেন। অনেক দেন-দরবার করেছেন, কিন্তু চাকরি স্থায়ী হয়নি। সমপ্রতি বাউফল খাদ্যগুদামে ঝাড়ুদারের পদ খালি হয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও হয়েছে। সেখানে স্থায়ী নিয়োগের আশ্বাসও পেয়েছেন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। তার জন্য গাছ-গরু বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকাও দিয়েছেন। কিন্তু ওই পদে নিয়োগ পেয়েছেন অন্য একজন। শেষমেষ কমল দাস নিজের অফিসে বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন (প্রথম আলো, ২৯ অক্টোবর ২০১০)।
মধ্য পীরেরবাগের নিচতলার বাসায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন মেহজাবীন মুন্নি আক্তার। মেহজাবীন বনানীর একটি ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কিছুদিন থেকেই সে অজ্ঞাত কারণে হতাশায় ভুগছিল। হতাশা থেকেই সে আত্মহত্যা করতে পারে বলে পরিবারের সদস্যদের ধারণা(বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২ নভেম্বর ২০১০)।
রিতা, রিপা, নাহল, চৈতি, কমলদাস ও মুন্নিদের আত্মহত্যার উদাহরণ কেবলই সমাজের খণ্ড চিত্র নয়। এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ, দেশের সর্বত্র। আমরা লক্ষ্য করছি যৌতুকের কারণে কিংবা উত্ত্যক্তকারীর কবল থেকে রক্ষা পেতে শহর এবং গ্রাম অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক বিবাহিত-অবিবাহিত নারী, কিশোরী-তরুণী আত্মহত্যা করছে। ব্যর্থতা-হতাশার কারণেও আত্মহত্যা করে ছেলে-মেয়েরা। মা-বাবার বকা খেয়ে অভিমানেও আত্মহত্যা করে কিশোর-কিশোরী। বিষণ্নতা, মাদকাসক্তি ও অন্যান্য মানসিক রোগের কারণে আত্মহত্যা করে বিপুল জনগোষ্ঠি। আত্মহত্যাই কি সমস্যার সমাধান? না।
তবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির পাশে দাঁড়াতে হবে আত্মহত্যা পরিকল্পনার পূর্বেই। এদেরকে চিহ্নিত করা, সমস্যার সমাধান ও চিকিত্সার উদ্যোগ নেয়াই গুরুত্বপূর্ণ। এই দায়িত্ব নিতে হবে কাছের স্বজনদের, বন্ধুদের, শিক্ষকদের— সর্বোপরি বাবা-মাকে। এজন্য বাড়াতে হবে সচেতনতা। এ প্রসঙ্গে তাকাতে পারি একজন আত্মহত্যাকারী মায়ের এক সন্তানের গভীর মর্মবেদনাময় আবেদনের দিকে - ‘আত্মহত্যা কারোরই কাম্য হতে পারে না। আত্মহত্যা আইন ও ধর্মীয় বিধানে স্বীকৃত নয়। আমি নিজেও একজন আত্মহননকারী মায়ের সন্তান। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে পারিবারিক অশান্তির কারণে আমার মা বিষপানে আত্মহত্যা করেছিলেন। আমরা তখন নয় মাস বয়স। কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার ডুমুরিয়া গ্রামের আত্মঘাতী মা সাজেদা বেগমের কথা হয়তবা অনেকেই ভুলে গেছে। কিন্তু কল্পিত এক মায়ের ছবি প্রতিনিয়ত আমাকে কাঁদায়। মায়ের কোন স্মৃতিই নেই আমার মনে। মা কেমন ছিলেন, মা কেমন করে কথা বলতেন, মা কেমন করে হাসতেন ইত্যাদি কোন স্মৃতিই আমার স্মৃতির পাতায় নেই। এমনকি মায়ের একটি ছবিও নেই। মানুষ তো মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের অনেক স্মৃতি নিয়েও বেঁচে থাকে। অথচ মাকে নিয়ে আনন্দের বা বেদনার এমন কোন স্মৃতিই নেই যা আমার মনে রেখাপাত করতে পারে। সন্তান হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্টের আর কি হতে পারে? আমি জানি, যে কষ্ট নিয়ে মা পৃথিবী থেকে চলে গেলেন সেই কষ্টের গভীরতা বা বিশালতা কোনভাবেই পরিমাপ করার মতো নয়। তবুও আজ বার বার একটাই প্রশ্ন আমার মনে জেগে ওঠে , মা কেন আত্মহত্যা করতে গেলেন? মা কি অন্তত আমার জন্য বেঁচে থাকতে পারতেন না। পারতেন। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে মা একজন সন্তানকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে চিরবিদায় নিতে পারে সেটাও ভাবতে হবে। তবুও আমি বলব, মায়ের বেঁচে থাকা উচিত ছিল। কারণ মা না থাকার কষ্ট যে কত তীব্র তা আমার চেয়ে আর কে বেশি বুঝবে। যাদের প্ররোচনায় আমার মা আত্মহত্যা করেছেন তাদের গায়ে এতটুকু আঁঁচড়ও লাগেনি। কিন্তু মা না থাকার শূন্যতা আমার পূরণ হয়নি কিছুতেই। বাবা বেঁচে আছেন অথচ বাবাকে প্রাণভরে বাবা ডাকার সুযোগ পাইনি একটিবারের জন্যও। এমনকি আমি বঞ্চিত হয়েছি ন্যায্য অধিকার থেকেও। তাই পৃথিবীর সব মায়ের কাছে আমার অনুরোধ— শত যন্ত্রণা, নির্যাতন আর বঞ্চনার মাঝেও আত্মহত্যার মতো এমন কঠিন সিদ্ধান্ত কেউ নিও না। কারণ, আত্মহত্যাই সব সমস্যার সমাধান নয়। সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার নামই জীবন। জীবন তো একটাই। তাই জীবন থেকে পালিয়ে না গিয়ে বরং সমস্ত অবিচার, নির্যাতন আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রতিবাদী হতে হবে। সমস্ত বঞ্চিত আর নির্যাতিত মায়েদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে আর নয় আত্মহত্যা, এবার প্রজ্বলিত করতে হবে প্রতিরোধের আগুন’ (জনকণ্ঠ, ২০ আগষ্ট ২০১০)। ’
সামপ্রতিক সময়ে দেশে আশংকাজনকহারে বেড়ে গেছে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা। বাংলাদেশ মেডিক্যাল জার্নাল (বিএমজে) জানুয়ারি ২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্ট থেকে দেখা যায় জানুয়ারি ২০০৮ থেকে ডিসেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে ৫১১৪ জনের ময়নাতদন্ত করা হয়। এদের ৯৭০ জন (১৯%) আত্মহত্যা করেছিল বলে জানা যায়। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী (৬০.১%) ও পুরুষ (৩৯.৯%)। এই পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যায় দেশে নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। সাধারণত দু’ভাবে আত্মহত্যা ঘটে থাকে— অধিকাংশই পরিকল্পনার মাধ্যমে আত্মহত্যা করে। তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা বা তাড়নায় (ইমপালসিভ) আত্মহত্যা করে অনেকে। পরিকল্পনাকারীদের মনে প্রথমে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে, ইচ্ছার পর পরিকল্পনা করে সে, তারপর আত্মহত্যার জন্য অ্যাটেম্পট গ্রহণ করে—বড় ধরনের বিষণ্নতা রোগের শেষ পরিণতি হচ্ছে পরিকল্পনার মাধ্যমে আত্মহত্যা।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক হিসেব থেকে দেখা যায়, পাঁচ বছরে প্রায় ৫৩ হাজার মানুষ গলায় ফাঁস দিয়ে কিংবা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বাংলাদেশে প্রজননক্ষম বিবাহিত নারীদের মধ্যে শহরের ১৪ শতাংশ ও গ্রামের ১১ শতাংশ নারী আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে। চিন্তাকারীদের মধ্যে শহরের ২৬ শতাংশ ও গ্রামের ৯ শতাংশ নারী আত্মহত্যা করে। প্রজননক্ষম নারীদের শতকরা ৪০ ভাগ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, বিবাহিত জীবনে যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শহরের ৪৪ শতাংশ ও গ্রামের ৩১ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হন (আইসিডিডিআরবি, ২০১০)। আরও একটি সার্ভেতে দেখা যায়, দাম্পত্য জীবনে কোনো না কোনো সময় বিবাহিত পুরুষদের ৬০ শতাংশ স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করেন (বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ও হেলথ সার্ভে, ২০০৭)। ইভটিজিংয়ের কারণেও আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির একটি জরিপে ২০০৬ সালে ৫ জন, ২০০৭ সালে ৭ জন, ২০১০ সালের মে মাস পর্যন্ত ১৪ জন আত্মহত্যা করেছে ইভটিজিং-এর কারণে। সর্বশেষ সিনথিয়াকে নিয়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৫ জন। তারপরও পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে আরো অসংখ্য ঘটনার।
আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বৈবাহিক অবস্থা ও শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার আশানুরূপ ফল অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়া, ফেল করা কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন, সন্দেহ-অবিশ্বাস, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক হতাশা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বেকারত্ব, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়া, আশাহীনতা, বৈষম্যের শিকার হওয়া, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া মানুষের মনে হতাশা তৈরি করছে। হতাশা থেকে বিষণ্নতার সীমানার দিকে এগিয়ে যায় মানুষ। মনে গুরুতর বিষণ্নতা হানা দিলে বেড়ে যায় সুইসাইডের ঝুঁকি। এ ধরনের ঝুঁকিতে আছে দেশের বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ন্যাশনাল সার্ভের রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, দেশের ৪.৬ শতাংশ এডাল্ট জনগোষ্ঠী গুরুতর বিষণ্নতা রোগে ভুগছে। দেশের মোট বয়স্ক জনগোষ্ঠী ১৬ কোটি ধরা হলে, গুরুতর বিষণ্নতা রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ ৬০ হাজার। অর্থাত্ এই বিশাল সংখ্যক মানুষ সুইসাইডের ঝুঁকি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজে। দেশে হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও বেশি, ব্যাপক। হতাশা ও বিষণ্নতা রোগ এক নয়। পূর্বেই বলা হয়েছে, হতাশাবোধ থেকে ধীরে ধীরে বিষণ্ন্নতা রোগের বাউন্ডারিতে ঢুকে পড়ে মানুষ। এখন প্রশ্ন আসা জরুরি, যারা সুইসাইডের ঝুঁকিতে আছে, কী করতে হবে তাদের জন্য? কীভাবে প্রতিরোধ করা যাবে সুইসাইড? স্বজনদের করণীয় কী? মিডিয়ার ভূমিকা হওয়া উচিত কেমন? প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার পূর্বে ‘সুইসাইড’ শব্দটির অ্যানালাইসিস, ধর্মীয় ও আইনগত দিকটা জেনে নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি। তার আগে বুঝতে হবে ‘সুইসাইড’ শব্দটির মূল অর্থ। সুই (sui) অর্থ নিজেকে, সিডস (caeds) অর্থ হত্যা। অর্থাত্ আত্মহত্যা মানে নিজেকে নিজে খুন করা। ‘খুন’ শব্দটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম ধর্মে নিজেকে খুন করার বিষয়ে কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আত্মহত্যাকারী জান্নাত পাবে না, তাদের জানাজা পড়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইহুদিরাও আত্মহত্যাকে মনে করে পাপ কাজ। ষষ্ঠ শতকে খ্রীষ্টধর্মে আত্মহত্যাকে খুন হিসেবে উল্লেখ করে নিজেকে হত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, আত্মহত্যাকারীর শেষকৃৃত্য না করার জন্য। হিন্দু পুরাণে উল্লেখ করা হয়েছে, রামের মৃত্যুর পর অযোধ্যায় গণহারে আত্মহত্যা করে মানুষ। কিন্তু মহাভারতে বলা হয়েছে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর অনাহারে আত্মহত্যার চিন্তা করলে যুধিষ্ঠিরকে স্বেচ্ছামৃত্যুর পরিকল্পনা বাতিলের পরামর্শ দেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, অর্থাত্ হিন্দুধর্মেও আত্মহত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নিরুত্সাহিত করা হয়েছে।
আইনের চোখেও আত্মহত্যার প্রচেষ্টা গ্রহণকারী একজন অপরাধী। আত্মহত্যার পর যেমন থানায় খবর দিতে হয়, তেমনি আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও থানায় খবর জানানোর কথা বলা হয়েছে। আত্মহত্যার চেষ্টা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদিও আইনটির প্রয়োগ নেই দেশে। সচেতন নয় মানুষ। বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়েছে, মুড বা সার্বক্ষণিক আবেগীয় অবস্থা বা মেজাজের পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিক পদার্থ, নিউরোট্রান্সমিটারের গোপন সংশ্রব। এ পদার্থগুলোর মধ্যে সেরোটোনিন ও নরএড্রিনালিনের মাত্রা কমে গেলে মনোজগতে তৈরি হয় নিম্নচাপ। নিম্নচাপ থেকে আসে বিষণ্ন অবস্থা। গুরুতর বিষণ্ন মনে সুইসাইডের ইচ্ছা জেগে ওঠে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। মানুষ তখন নিজের ইচ্ছা বা মনের জোরে বেরিয়ে আসতে পারে না এ অবস্থা থেকে; নেতিবাচক ধারণা বা চিন্তনের গোলক ধাঁধায় আটকে যায় সে। হঠাত্ পাওয়া তীব্র মনঃকষ্ট (psycheache), আচমকা অনুভব বা তাত্ক্ষণিক উত্তেজনার সময়ও ব্রেনে ঘটে যায় নিউরোট্রান্সমিটারের অসামঞ্জস্য অবস্থা। এ সময়ও আকস্মিক আত্মহত্যার জন্য প্রচেষ্টা নিতে পারে একজন মানুষ। প্রতিকূল আর্থ-সামাজিক পরিবেশ ও বিষণ্নতার রোগের কারণে মস্তিষ্কে জৈব রাসায়নিক পদার্থের অসমতা বা কমে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে, মনে রাখতে হবে সবাইকে। এর সমাধান হচ্ছে যথাযথ বৈজ্ঞানিক চিকিত্সার ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানো, ধর্মীয় ও আইনী দৃষ্টিতে ঘটনা বিচার করা, নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা। আত্মহত্যা প্রতিরোধে এই সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমান সময়ে সমাজে আত্মহত্যার খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিডিয়া। মিডিয়ার কারণে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বহমান আত্মহত্যার নির্মম ঘটনাগুলো জানতে পারছি আমরা। কী কারণে আত্মহত্যা ঘটছে, পারিবারিক, সামাজিক কী অবক্ষয়ের কারণে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত হচ্ছে আত্মহননকারী, জেনে সহানুভূতি নিয়ে আমরা দাঁড়াচ্ছি আত্মহত্যাকারীর পাশে। দরদি মনের ব্যাকুলতার কারণে এমনটি করে থাকে মিডিয়াকর্মী কিংবা জনগোষ্ঠী। না। আত্মহত্যার পর সহানুভূতি দেখানো যাবে না আত্মহত্যাকারীকে। যদি আত্মহত্যাকারীকে হিরো কিংবা হিরোইন বানিয়ে তোলা হয় মিডিয়াতে, যে বিশাল জনগোষ্ঠী আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে (৭৩ লাখ ৬০ হাজার), তারা আত্ম্হত্যার পথ খুঁজে নেয়ার তাগিদ বোধ করতে পারে ঘটনার ভেতর থেকে। সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে অবক্ষয়ের পাশাপাশি এ ধরনের সামাজিক শিক্ষণ আত্মহত্যার হার বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে যেতে পারে। হ্যাঁ। দাঁড়াতে হবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির পাশে। আত্মহত্যার ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে স্বজনদের। ঝুঁকি শনাক্ত করে আত্মহত্যার পূর্বেই ভূমিকা রাখতে হবে। বাপের বাড়ির স্বজনদের মনে রাখতে হবে, যারা ঝুঁকিতে আছে, সবধরনের সাপোর্ট দিতে হবে তাদের। ঝুঁকি শনাক্ত করার পর চিকিত্সার উদ্যোগ নিতে হবে। এটাই হবে যথাযথভাবে পাশে দাঁড়ানো। তবে এটা ঠিক, কী কারণে প্ররোচিত হয়েছে সে, সেই ঘটনার প্রতি ঘৃণা জানাতে হবে। সেই ক্ষত সমাজ থেকে দূর করার জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জোরদার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্ররোচনাকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে আত্মহত্যার পরিমাণ কমবে না। এ বিষয়টিও আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখা জরুরি, প্ররোচনাকারীর শাস্তি চাইতে গিয়ে যেন আত্মহত্যাকারীর প্রতি সহানুভূতি বা সমান অনুভূতি না দেখানো হয়। কারণ সামাজিক যে ক্ষতের কারণেই সে আত্মহত্যা করুক না কেন, নিজেকে খুন করে আরো গুরুতর অপরাধ করে ফেলেছে সে। ধর্মীয় অনুশাসন লঙ্ঘন করেছে। ধর্মীয় অনুশাসন ও আইন লঙ্ঘনকারী আত্মহত্যাকারীকে অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ নেই কারো।
বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিসিন-এ সামপ্রতিক সময়ে (২০১৩) প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে বাংলাদেশে চলছে আত্মহত্যার মহামারী। এই ব্যাপক ও বিধ্বংসী জীবনসংহার প্রতিরোধে কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। তাই বলা যায়, আত্মহত্যা প্রতিরোধে গণসচেতনতা বাড়াতেই হবে। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। আশার কথা- ইতোমধ্যে সরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যকে, তবে প্রচলিত কুসংস্কার দূর করার লক্ষ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সুইসাইড প্রতিরোধে প্রশিক্ষণও শুরু করতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবার যেন আইনের অপব্যবহারের কারণে ভোগান্তির শিকার না হয়, সচেতন হতে হবে সেই বিষয়ে। কীটনাশক প্রস্তুতকারী ও বিপণনকারীদের দায়িত্বশীল হতে হবে। ঘুমের বড়ি বিক্রির ব্যবহারে কঠোরতা আরোপ করতে হবে। মাদকাসক্ত ও ঝুঁকিপূূর্ণ মানসিক রোগীদের দ্রুত মানসিক চিকিত্সা সেবার আওতায় আনতে হবে।
নিপীড়িত, নির্যাতিত, সুবিচার বঞ্চিত ক্ষমতাহীন নারীরা একসময় মানসিকভাবে নিঃস্ব হয়ে নিজের সন্তানকেই একমাত্র পজেশন বা অধিকৃত ধন হিসেবে গণ্য করে, তাকেও খুন করে কিংবা আত্মহত্যার জন্য উদ্বুদ্ধ করে নিজের সঙ্গী করার সিদ্ধান্ত নেয়। গেল কয়েক বছরে দেশে ঘটেছে এমন কয়েকটি অবিশ্বাস্য নির্মম ঘটনা। বেঁচে থাকা অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ এ সকল নারীকে মনে রাখতে হবে, খুনের দায় মাথায় নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে তাদের। পৃথিবীতেই তখন সে হবে নিন্দনীয়, ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী পরকালেও তাকে ভোগ করতে হবে নরকযন্ত্রণা। বেঁচে থাকা অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের উচিত কর্তব্য হবে নির্যাতিত নারীকে সহায়তাদানকারী সংস্থার সাহায্য নেয়া।
কেন মাথা উঁচিয়ে লড়াই করার শক্তিতে উজ্জীবিত হবে না বঞ্চিত, জখমপ্রাপ্ত নারী? কেন পরাজয় বরণ করবে জীবন সংসারে? কেন আলিঙ্গন করবে মৃত্যু?
লেখক: মনোচিকিত্সক ও কথা-সাহিত্যিক
[email protected]
