হাসি-সম্রাট শিবরাম চক্রবর্তী

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:২৬
শিবরাম মানেই হাসির পটরা। যা খুললেই কেবল হাসি আর হাসি। নানা রঙের হাসির ফোয়ারা বইয়ে মরু গাঙে জোয়ার আসার মত দুঃখে ভরা প্রাণে হাসির পরশ ছড়িয়ে দেয়। তাঁর গল্পও রম্য রচনা, যার অণুতে অণুতে ছড়িয়ে আছে কেবলই হাসি আর হাসি। ছোটদের জন্য তার রয়েছে প্রচুর লেখালেখি। ছোটদেরকে এতটাই ভালবাসতেন যে, সবসময় নিজের ফেলে আসা শৈশবকে ফিরে পেতে শিশুদের মত তিনি থাকতে, খেতে ভালবাসতেন। তার প্রিয় জিনিস ছিল টফি বা চকলেট। লেখালেখি না থাকলে মুখের ভেতরে একটা চকলেট নিয়ে তাকে চুষতে দেখা যেত। শিশু-কিশোরদের সঙ্গে তার এই সম্পর্ক জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে বজায় ছিল। বাংলা সাহিত্য ও সংবাদপত্র জগতে তাই শিবরাম চক্রবর্তী এখনও শিশুদের পরম বন্ধু হয়েই বেঁচে আছেন, আর বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। গত ২৮ আগস্ট ছিল এই হাসি-সম্রাট শিবরামের ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮০ সালের এই দিনে কোলকাতার জীবন শেষ করে তিনি মারা যান। এই মহান গুণী সাহিত্যিক ১৯০৩ সালের ডিসেম্বরে জন্ম নেন। মাত্র ৭৭ বছর বয়স পেয়েছিলেন। যার মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে তার ভাগ্যান্বেষণে। একসময় তিনি জীবিকার তাগিদে সংবাদপত্রের হকারি করেছেন। সেই সময় কোলকাতার বিখ্যাত সংবাদপত্র বসুমতি বিক্রি করেছেন। এরপর সওদাগরী অফিসে কম মাইনার চাকরি করেছেন। কিন্তু তখনও লেখা-লেখিতে হাত দেননি। অবশেষে একটা সময় এসে তাকে লিখতে হয়। কারণ লিখেই তাকে খেতে হয়। দৈনিক বসুমতির সম্পাদক হেমন্ত প্রসাদ ঘোষই তাকে লেখালেখিতে নিয়ে আসেন। সাহিত্য সাধনা শুরু করে তিনি বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন তোলেন। রস রচনা এবং কৌতুক রচনায় সিদ্ধহস্ত শিবরাম গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি কবিতাও লিখেছেন। তার উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘প্রেমের পথ ঘোরাল আজ এবং আগামীকাল’, মেয়েদের মন, শিবরাম রচনাবলি, ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা প্রভৃতি। আবার তিনি ছোটদের জন্য প্রচুর লিখেছেন। শিশুকালকে ধরে রাখতে তার এসব শিশুতোষ লেখা-লেখি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান জুড়ে রয়েছে। ছোটদের জন্য লেখা জন্মদিনের উপহার তার বিখ্যাত বই। শিবরামকে বাংলা সাহিত্য কিভাবে পেল তার একটা স্বল্প ইতিহাস আছে। একবার শিবরাম মাসিক ২ টাকা সুদে এক কাবুলিওয়ালার কাছ থেকে ৫০ টাকা কর্জ নেন। প্রথম মাসের কিস্তিটা নিয়ে কোন বিড়ম্বনা হয়নি। কারণ ২ টাকা সুদ কেটে রেখেই কাবুলিওয়ালা তাকে ৪৮ টাকা দেয়। কিন্তু গোল বাঁধে পরের মাসে এসে। মাস শেষ হতে চললেও শিবরাম সুদের ২ টাকা কোনভাবেই জোগাড় করতে পারেন না। কিন্তু কাবুলিওয়ালার তাগাদা তাদের সময়-জ্ঞান অত্যন্ত প্রখর। এসব কাবুলিওয়ালার নামে নানা ধরনের গল্প প্রচলিত ছিল। আর এসব কোন গল্প নয়, একেবারেই বাস্তব। যেমন, নির্ধারিত দিনে তাগাদায় গেছে কাবুলিওয়ালা। খাতক বললেন, ‘খান সাব আজ নেই কাল সোভা মে আয়েগাঁ— সঙ্গে সঙ্গে লাঠিতে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ পরে চোখ খুলে বলল, কাল হো গিয়া, টাকা দিউ— এদের তাগাদা এমনই ছিল যে বর্গির হামলা যেমন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে তেমনি কাবুলি তাগাদা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কেউ যদি কড়াভাবে তাগাদা করে তখন বলা হয় একেবারে কাবুলি তাগাদা। যা হোক, সেই কাবুলিওয়ালার তাগাদা থেকে রেহাই পেতে মেছ ছাড়া হলেন শিবরাম। কিভাবে ঋণের টাকা শোধ করবেন তা ভেবে ভেবে শরীর শুকিয়ে আমচুর। ঠিক এমনি যখন অবস্থা তখন হঠাত্ করে এক দৈনিকের সম্পাদক বললেন, শিবরাম তোমাকে একটা কথা বলি— -কি কথা? কথা হচ্ছে তুমি লেখালেখি শুরু কর। শিবরাম বললেন, আপনি আর রসিকতা করার বিষয় খুঁজে পেলেন না— “লেখালেখি করব এই আমি— অসম্ভব—! -না ভাই অসম্ভব হবে কেন? তুমি লেখ আমি তোমাকে বলছি, এ লাইনে তোমার যশ অর্থ দুই প্রাপ্তি ঘটবে— মানুষ এর চেয়ে কম অনুরোধে গলে যায়— মানে যাকে বলা হয় অনুরোধে ঢেঁকি গেলা— সেখানে একজন সম্পাদকের অনুরোধ তাকে সহসাই কাবু করে ফেলল। তিনি একটা লেখা নিয়ে পরদিন সম্পাদকের দপ্তরে হাজির। লেখাটা নিয়ে সম্পাদক তাকে ৫টি টাকা নগদে হাতে দিলেন। উদ্দেশ্য তাকে আরো উত্সাহিত করা। টাকাটা পেয়ে আনন্দ ধরে না। তিন টাকা খরচের জন্য রেখে বাকি ২ টাকা কাবুলিওয়ালাকে খুঁজে সুদের টাকা বুঝিয়ে দিলেন। লাঠিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো কাবুলিওয়ালাকে বেশ ভালভাবেই একটা ঝাঁকুনি দিলেন। এরপর অতিদ্রুত লেখালেখি করে সেই অর্থে কাবুলিওয়ালার দেনা শোধ করলেন। কাবুলিওয়ালার দেনা শোধ আর বাংলা সাহিত্যকে আজীবন ঋণের মাঝে আবদ্ধ করলেন এই শিবরাম। চিরকুমার শিবরাম কোলকাতা শহরে এসে ২৩৪ মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের একটি কক্ষে জীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে সেই কক্ষে থেকেছিলেন। আজীবন বেহিসেবী শিবরাম কখনই দেনা-পাওনার হিসাব কাগজ-কলমে রাখতেন না। ছোট্ট কক্ষের দেয়ালই ছিল তার হিসাবের খাতা। সারা দেয়াল জুড়ে কার কাছে কত পাবেন তার নাম ও পরিমাণ উল্লেখ করে লেখালেখি। এসব নাম কখনোই কাটা যায়নি। কারণ তার দেনাদারেরা ঋণ শোধ করে ঋণমুক্ত হওয়াকে পাপ জ্ঞান করতেন। শিবরাম তাই লিখেছিলেন, অমুককে টাকা দিলাম। সে টাকাটা হাতে পেয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে বলল, শিবরাম ভায়া আমাকে তুমি চিরঋণী করলে। তোমার এ টাকাটা না পেলে এই কোলকাতা শহরে আজ আমাকে ট্রামের তলায় পড়ে আত্মহত্যা করতে হতো। ভাই তাই তোমার কাছে আমি চিরঋণী হয়ে রইলুম। বলাবাহুল্য সে আর কোনদিনই শিবরামের ঋণ শোধ করার কথা মাথায় আনতো না। আর শিবরাম লিখলেন, সত্যিই তুমি আমার কাছে চিরঋণী হয়েই রইলে। শিবরাম নিয়মিত লিখতেন একথা বললে তার প্রতি বড়ই অবিচার করা হবে। শিবরাম তখনই লিখতেন যখন তার পকেট বাড়ন্ত। বিকালে হয়ত প্যাড়া সন্দেশ, একটা ঝালমুড়ি, ডালপুরি অথবা আলুর দম দিয়ে কচুরি খেতে ইচ্ছে হল। কিন্তু পকেটে টাকা নেই। বসে গেলেন লিখতে। লেখা শেষ করে সম্পাদকের টেবিলে হাজির। লেখাটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ছাড়ো তো দু’টি টাকা। সম্পাদক সাহেব লেখা নিয়ে হাসতে হাসতে দু’টি টাকা বের করে দিলেন। শিবরাম ঝড়ের বেগে বের হয়ে এসে তার পছন্দের খাদ্য কিনে কক্ষে ফিরলেন। বেশ জমিয়ে খাবেন বলে আগে থেকেই স্থির করেছে, শেষে দেখা গেল আগন্তুক আরো দু’জন অতিথি। কি আর করা, তিনজন মিলেই ভাগ করে খেলেন। পেট না ভরুক, ক্ষতি নেই, মনতো ভরলো। নিজেকে নিয়ে রসিকতা করতে তার জুড়ি ছিল না। একবার হয়েছে কি— বন্ধুরা এসেছে শিবরামের মেসবাড়িতে। সকলে জুতা খুলে তার কক্ষে ঢুকেছেন। জুতা বাইরে। তাই দেখে শিবরাম হাসতে হাসতে বললেন, বুঝেছি, বুঝেছি, আমার ঘরের ময়লা তোমাদের দামী জুতায় লাগবে বলেই তোমরা জুতাগুলো বাইরে রেখে সে ময়লার হাত থেকে কৌশলে জুতাকে বাঁচালে—শিবরামের বাসায় একজন থাকবেন এমন সংবাদে চিররসিক শিবরাম বললেন, শিবের বাড়িতে আপনি থাকবেন, এতো বড়ই আনন্দের কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘদিনের বিছানা-বালিশ আর অনেকদিন ধরে মানে বলতে পারেন বিছানাটা পাতার পর তা আর তুলে দেখা হয়নি। এর নিচের অনেক সরীসৃপই আমার সাথে বসবাস করে। অবশ্য এদের প্রজাতি সাপ, ছুঁচো থাকাটাও বিচিত্র নয়—সাপ আছে এমন কথার পর আর কেউ কি সাপের সঙ্গে সহবাস করতে রাজি হবেন? একমাত্র নাগরাজ শিকারী সেই গল্পের সাপুড়ে ছাড়া। শিবরাম আমাদের শিবরাম চকোত্তি—তাই চির কৌতুক সঙ্গী করেই একদিন গত হলেন, অকৃতজ্ঞ বাঙালি সেদিনটাকেও মনে রাখেনি। বাঙালি কেবলই নিয়েছে, দেয়নি কিছুই—। শিবরামের ভাষায়: তার কাছে আমরা চিরঋণী হয়ে রইলাম কিন্তু সে ঋণটুকু শোধ করার মত হিম্মত দেখাতে পারলাম কই? শিবরাম যেখানেই থাকেন না কেন, সুখে ও চিরশান্তিতে থাকুন। আর ক্ষমা করুন আমাদের এই অকৃতজ্ঞতাকে।