ব্যক্তিস্বার্থ আর ক্ষমতা লিপ্সায় আমরা অন্ধ হয়ে গেছি

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৮
স্বাধীনতা মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। ফরাসি দার্শনিক রুশো বলেছেন, ‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায় কিন্তু জীবনের সর্বত্র সে থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ’। স্বাধীনতার জন্য মানুষের সাধনা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলমান। তাই তো যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি স্বাধীনতা লাভের জন্য অকাতরে বিসর্জন দিয়েছে প্রাণ। ক্ষমতা-হিংসা, লোভ-লালসা আর আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষার মতো অনৈতিক বাসনার বশবর্তী হয়ে মানুষ হরণ করে মানুষের স্বাধীনতা। আর পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মানুষ তার স্বাধীনতাকে পুনরায় অর্জন করতে চায়। যে কারণে হয়তো ইসমাইল হোসেন সিরাজী বলেছিলেন “আলোক ব্যতীত যেমন পৃথিবী জাগে না, স্রোত ব্যতীত যেমন ঢেউ জাগে না, স্বাধীনতা ব্যতীত তেমনি কোন জাতি বাঁচতে পারে না।” বাংলার মানুষও সেই চিরন্তন পথ ধরে স্বাধীনতার জন্য পাড়ি দিয়েছে দীর্ঘ রক্তাক্ত পথ। পাকিস্তানিদের দীর্ঘ শোষণ-বঞ্চনা, নিপীড়ন আর পৈশাচিক নির্যাতন থেকে মুক্তির আশায় স্বাধীনতাকামী জনতা জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বহু ত্যাগ আর তিতিক্ষার পর আমরা পেলাম মুক্ত স্বাধীন একটি ভূখণ্ড। পেলাম শস্য-শ্যামল সুষমায় ভরা প্রিয় বাংলাদেশ। সেইসঙ্গে পেয়েছি একটি পতাকা। পেয়েছি প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। স্বাধীন পতাকা আর মুক্ত ভূখণ্ড পেলেও সত্যিকারের স্বাধীনতা কি আমরা পেয়েছি? পেয়েছি কি অর্থনৈতিক মুক্তি? যাঁদের আত্মত্যাগ আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা, সে সব অসম সাহসী বীর যোদ্ধার চেতনায় কি এমন বাংলাদেশ ছিল? শোষণমুক্ত, উদারগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন কল্যাণকামী দেশ গঠনের স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছে? না। সে স্বপ্ন আজো পূরণ হয়নি। আধিপত্যবাদী শক্তি আর নষ্ট রাজনীতির বেড়াজাল থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। দেশ আজ বিপর্যস্ত। দেশের মানুষ আজ চরম সংকটে আবর্তিত। গণতন্ত্র আর স্বাধীনতা আজ হুমকির মুখে। আজ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাই কমিশনাররা আমাদেরকে গণতন্ত্র শেখায়, ধমক দেয়। গণতন্ত্রের কথা বলে নতুন নতুন সবক দেয়। আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের ওকালতি আর পরামর্শ ছাড়া আমরা স্বাধীনভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আর কেনই বা এমন হবে না। এ দোষ তো আমাদেরই। আমরা হীন স্বার্থ আর ক্ষমতার লালসায় জনগণকে, জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে উপেক্ষা করে নিজেদের মধ্যে হানাহানি সৃষ্টি করে দেশটাকে অচল করে দিয়ে বিদেশিদের মাতব্বর মানতে চাই। স্বদেশের ঠাকুর ফেলে বিদেশের কুকুর ধরি। ব্যক্তিস্বার্থ আর ক্ষমতা লিপ্সায় আজ আমরা অন্ধ হয়ে গেছি। মুক্তিযুদ্ধের সেই শাশ্বত চেতনা থেকে বিচ্যুতি হয়ে আমরা এক শেকড়শূন্য জাতিতে পরিণত হয়েছি। সংঘাত-সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি আর ভোগবাদী বাসনায় আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেন নজরবন্দি। নানা শঙ্কায় মন্থর গতিতে চলছে দেশের অর্থনীতি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। জনগণের মধ্যে বাড়ছে অজানা শঙ্কা আর ভীতি। কিন্তু স্বাধীন দেশ, স্বাধীন পতাকা, নিজস্ব সংবিধান আর ১৬ কোটি মানুষের বিশাল জনশক্তি থাকতেও কেন আমরা দেশটাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারছি না? কেন আমরা বার বার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হই? কেন দেশ বার বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়? কেন আমরা আমাদের সংবিধানটিকে দলীয় স্বার্থে কাটাছেঁড়া করি, জনগণ তথা দেশের স্বার্থে কেন নয়? কেনইবা দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে ব্যক্তি স্বার্থে তৃতীয় শক্তিকে সুযোগ করে দিই। স্বাধীন দেশে থেকেও কি আমরা পরাধীনতার শিকল পরে থাকবো? আজ মালয়েশিয়া,সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি তারা কত অল্প সময়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার চার দশক পরও কেন আমরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারিনি? কেন আমরা আজো পিছিয়ে আছি? রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “হে মুগ্ধ জননী, সাত কোটি সন্তানেরে রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।” হয়তো আমাদের মানসিক দৈন্য আর হীনম্মন্যতার জন্যই তিনি অমন শক্ত কথাগুলো বলেছিলেন। আমরা কবে সেই মানুষ হবো? এভাবে আর নয়। স্বাধীনতার স্বপ্ন আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আমাদের হূদয়ে গভীরভাবে লালন করতে হবে। সীমাহীন দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক হানাহানির সুযোগ নিয়ে বিদেশিরা আমাদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরায়। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নির্লজ্জভাবে নাক গলায়। যা খুবই লজ্জার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। কাজেই ব্যক্তিস্বার্থে নয়, দেশের স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ আর সংঘর্ষের মতো রুগ্ণ রাজনীতি পরিহার করতে হবে। রাজনীতি হতে হবে দেশের জন্য। দেশের সম্মান, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে আমাদের সবাইকে অভিন্ন অবস্থান নিতে হবে। দেশপ্রেম এবং মানবতার মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে জেগে উঠতে হবে ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ সচেতন সবাইকে। নৈতিক বলে বলীয়ান হয়ে চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে সুন্দর, শোষণমুক্ত ও উদার গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্য গড়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাহলেই বহু কষ্টে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা সার্থক হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত থাকবে। শহীদদের স্বপ্ন পূরণ হবে। তাই আসুন মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের সুখ-স্বপ্নকে সামনে রেখে নব প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে নতুন করে দেশ গড়ার শপথ নেই। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত এবং আধিপত্যবাদী শক্তির কর্তৃত্বমুক্ত আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলি। সিরাজগঞ্জ