স্মরণ

নুরুল কাদের :এক অসাধারণ মানুষ

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:১৮
আজ ১৩ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সচিব ও বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের পথিকৃত্ মোহাম্মদ নুরুল কাদের খানের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। তার ডাকনাম ঝিলু। তাকে আমি চিনতাম তার ছাত্রজীবন থেকেই। সে ছিল আমার শ্রদ্ধাভাজন সহকর্মী ও বিশেষ বন্ধু প্রয়াত ড. এ আর মল্লিকের শ্যালক। ড. মল্লিক ছিলেন এদেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, ইতিহাসের প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ভিসি, সাবেক অর্থমন্ত্রী-সর্বোপরি দেশ-বিদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের আলোচিত একজন সংগঠক। আমি মল্লিকের বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়ার কারণে ঝিলুর সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ঝিলু ছিল সুদর্শন, অত্যন্ত মেধাবী, তীক্ষ বুদ্ধিসম্পন্ন, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। কলেজ জীবন শেষে ঝিলু পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জিডি পাইলট হিসেবে যোগদান করে স্বাস্থ্যগত কারণে পরে ফিরে আসে। ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি. কম-এ ভর্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ঝিলু ফজলুল হক মুসলিম হলের ছাত্র সংসদের ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব শেষ করে ঝিলু পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র (সিএসপি) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায়, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করে বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করে। প্রশাসনিক বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য সে প্রায় বছরাধিককাল ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করে। সে সময় আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে কর্মরত। ক্যামব্রিজে যাওয়ার পূর্বে হঠাত্ করে ঝিলু একদিন আমার বাসায় এসে, তার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ দেশের প্রখ্যাত শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া, কামরুল হাসান, মর্তুজা বশির প্রমুখের আঁকা ২৫টি দুর্লভ ছবি রেখে যায়। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন সে ছবিগুলো আমাকে দিয়ে বললো, সালাউদ্দিন ভাই আমি ছবিগুলো অন্য কোথাও রাখতে ভরসা পাচ্ছি না! এগুলো আপনার জিম্মায় রেখে গেলাম। আমি বিদেশ থেকে ফিরে এসে আপনার কাছ থেকে নেব। পরে বাছাই করে ৩টি ছবি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবনে টাঙিয়ে রাখি। বাকি ছবিগুলো সযত্নে চট দিয়ে মুড়িয়ে প্যাকেট করে বাসার দোতলার স্টোর রুমে রেখে দিয়েছিলাম। বছরখানেক পর ঝিলু ফিরে এসে ছবিগুলো পাবনায় নিয়ে যায়। সে তখন পাবনার জেলা প্রশাসক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নুরুল কাদেরই একমাত্র জেলা প্রশাসক মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম প্রহর থেকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। তার নেতৃত্বে পাবনার পুলিশ, আনসার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মুক্তিপাগল সাধারণ মানুষ সংগঠিত হয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করতে যুদ্ধ করেছে। তার নেতৃত্বে পাবনার বিভিন্ন স্থানে ১৭টি খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের নামাঙ্কিত রাবার সীল ব্যবহার করে সরকারি কর্মকাণ্ড শুরু করে। পাশাপাশি আয়ত্তাধীন এলাকার ব্যাংকের স্থানীয় শাখাকে জমাকৃত সকল টাকা সরকারের নিকট জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের সার্বিক দায়িত্ব পালন করে। পরে সংগৃহীত টাকা তালিকাসহ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এর নিকট হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে ঐ টাকাটাই প্রবাসী সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তান বাহিনীর প্রবল আক্রমণে প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার সময় সকল যোদ্ধাকে নিয়ে ট্রেনে তুলে, সেই ট্রেন নিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ভারতীয় সীমান্ত পেরিয়েছিলো। ঝিলু প্রবাসী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সচিব ও স্বাধীনতার পর প্রথম সংস্থাপন সচিবের দায়িত্ব পালন করেন বিশ্বস্ততা ও দক্ষতার সাথে। পরবর্তীতে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত করে। সেটাও ছিল নতুন ধারার ব্যবসা। এদেশ থেকে গার্মেন্টস পণ্য তৈরি ও রপ্তানির ব্যবসা। বাংলাদেশের গার্মেন্টস বাণিজ্য শুরু তারই হাত দিয়ে। তারই বদৌলতে আমরা দেখছি এদেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রসার। ঝিলু এই ব্যবসাটিকে শিল্প হিসাবে গড়ে তোলার জন্য কোরিয়ার বিখ্যাত দ্যাইয়ু কর্পোরেশনের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যক্তি উদ্যোগে ১৩০ জনের একটি টিমকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনে। আর এই প্রশিক্ষিত টিমের মাধ্যমেই বাংলাদেশে অত্যাধুনিক গার্মেন্টস টেকনোলজী প্রবেশ করে। ঝিলু ছিল একজন বিরাট হূদয়বান মানুষ। সমাজসেবামূলক কাজে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার অবদান তাকে স্মরণীয় করে রাখবে-বহুকাল, বহুদিন। লেখক :জাতীয় অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ