‘বন্ধু’ ছাড়া আমাদের জীবনটাই অচল। চায়ের কাপে ঝড় তোলা, ক্যাম্পাসে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া, অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়া কিংবা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখা সবখানেই বন্ধুই ভরসা। বন্ধু ছাড়া মনের কথা, প্রাণের কথা, ভালো লাগার কথা আর কাকে বলা যায়। কিন্তু বন্ধুরা যখন এড়িয়ে চলে তখন স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে বিপর্যয়ে পড়তে হয়। কেননা তরুণদের মানসিক বিকাশের একটি বড় মাধ্যম হচ্ছে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ। সকলেই যখন এড়িয়ে চলে তখন একা থাকাটা অনেক বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠে। এ নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন তাহের মানিক
পার্কে, মার্কেটে অথবা আপনার প্রিয় খাবার দোকানে সবখানেই বন্ধুদের আড্ডা। এমনকি একটা সিনেমা দেখতে বসলেন সেখানেও বন্ধুদের গ্রুপের হৈহুল্লোড়। বন্ধুদের মধ্যেই প্রায় সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে আর আপনাকে অনেকটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ফলে আপনি নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বে ভুগছেন। অনেকেই কাছের মানুষদের কাছে থেকে এই এড়িয়ে চলা আচরণে একাকিত্বে ভোগার কারণে হতাশাগ্রস্ত থাকেন। বিশেষ করে তরুণ বয়সে এই সমস্যাটা বেশি দেখা হয়। কিন্তু কেউ চাইলে তার একা থাকাটাকেও উপভোগ করতে পারে। কোনো কিছুতেই ভালো লাগে না মেরাজের। নিজের স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু কিছুই করার নেই, শুধু ক্লাসনোট ও পরীক্ষার সময় সাহায্যের জন্য ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে মেরাজকে ভালো সম্পর্ক রাখতে হয়। সারমর্ম :যেখানে ভালো লাগা বা অ্যাটাচমেন্টের বদলে নিজের স্বার্থ বা প্রয়োজনই হলো সম্পর্কের শিরদাঁড়া। এ ধরনের বন্ধুত্বের কথা প্রকাশ্যে এলে হয়তো অনেকেই খারাপ বলে, কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই এ ধরনের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ধরে রাখেন। যা-ই হোক, কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই মেরাজকে দোষারোপ করা যায় না, কারণ, তার অন্য বন্ধুরা তো আর তার হয়ে ক্লাসনোট জোগাড় করে দেবে না বা পরীক্ষার সময় নোটও লিখে দেবে না। অতএব, ক্লাসমেটের সঙ্গ অসহ্য মনে হলেও মুখ বুঁজে মেরাজকে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। একটু ভেবে দেখুন, আমরা কিন্তু অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় মানে স্কুল-কলেজে বা অফিসেও এই একই কাণ্ড করি। অর্থাত্ বন্ধুত্ব বজায় রাখার জন্য নয়, প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি করতে হবে, নয়তো পরোক্ষ রাজনীতির শিকার হতে হবে।
বন্ধু গ্রুপের প্রায় সবাইকেই পছন্দ করে মোহনা, কিন্তু অদিতিকে একেবারেই পছন্দ নয় তার। শুধু তাই-ই নয়, অদিতিকে একঘরে করার জন্য নানা সময়ে বিভিন্ন প্ল্যান করেন তিনি। আসলে তার যেহেতু অদিতিকে পছন্দ নয়, তাই অন্য কেউ অদিতিকে পছন্দ করুক, এটা মোহনা চান না। সারমর্ম :খুবই কমন সাইকোলজি। ব্যক্তি জীবনে অনেকেই এ ধরনের মানসিকতার শিকার হয়। তার ক্রেজ আমার চেয়ে বেশি, বা তার অনুরাগীর সংখ্যা আমার চেয়ে অনেক বেশি, অথবা সে দেখতে আমার চেয়ে বেশি সুন্দর—এ ধরনের ব্যাপারগুলোর ফলে অনেকের সঙ্গে অনেকের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। শুধু বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে ক্ষান্ত থাকে না, একে অপরের ঘোরতর শত্রুতেও পরিণত হয় অনেক সময়। তবে, এ ধরনের সম্পর্ক সাধারণত সকলের অগোচরেই থাকে। রীতিমতো নিজস্ব অনুরাগী গ্রুপও তৈরি হয়ে যায়। বড়-বড় বন্ধু গ্রুপ স্রেফ কয়েকজনের ইগোর লড়াইয়ের জন্যই ভেঙে যায়। না, এর কোনো সমাধান সূত্র নেই, তবে দাওয়াই রয়েছে। যেমন, এই মানসিকতার বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা বা নিজেদের গ্রুপে এ ধরনের লোকজন থাকলে আগেভাগেই তার সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রভৃতি। তবে দেখবেন, ক্লাসে এমন অনেকে রয়েছে, যারা পরস্পরকে দু চোখে দেখতে না পারলেও শুধু সামাজিকতার দায়ে বছরভর হাই-হ্যালো চালিয়ে যায়।
ভার্সিটির বন্ধুদের সাথে বিশেষ বন্ধুত্ব হয়নি এষার। ফলে, কোনো উত্সব বা অনুষ্ঠানে জমিয়ে মজা করার জন্য পাড়ার বন্ধুরাই তার প্রধান ভরসা। কিন্তু এবার ছুটির দিনে ক্লাসের বন্ধুরা তার সাথে ঘুরবে বলে প্ল্যান করেছে। এদিকে পাড়ার বন্ধুদের তিনি কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। যা-ই হোক, পাড়ার বন্ধুদের যে করেই হোক বুঝিয়ে দেবেন বলে ঠিক করে তিনি ক্লাসের বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হলেন। সারমর্ম :এটাও এক ধরনের বন্ধুত্ব। প্রত্যেক বছর পাড়ার বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেরোনোর অর্থ এই নয় যে, সারাজীবন আপনাকে তাদের সাথেই ঘুরতে হবে। কলেজে ওঠার পর এমন হতেই পারে যে, আপনার সঙ্গে কলেজের বন্ধুদের সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে গেল। তখন? এ ক্ষেত্রে কিছু করার নেই বন্ধু, বড় হয়ে ওঠার একটি অন্যতম শর্ত হলো, ব্যালান্স করতে শেখা। বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন, পাড়ার বন্ধুবান্ধব এবং স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই হবে। অর্থাত্ এ ক্ষেত্রেও আপনাকে রাজনৈতিক প্রতিভা দেখাতে হবে।
পরিবারের সাথে সময় কাটান
একা থাকার একটি বড় সুবিধা হলো পরিবারকে প্রচুর সময় দেওয়া যায়। বাবা-মায়ের কিছু কাজ ভাগ করে নিন। ছোট ভাই-বোন থাকলে তাদের পড়াশোনায় সাহায্য করুন। পরিবারের সাথে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসুন দূরের কোনো সুন্দর জায়গা থেকে। সুযোগ পেলেই আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে যান। বেশ মজাতেই কেটে যাবে সময়গুলো।
সামাজিকতা বাড়িয়ে তুলুন
বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে আড্ডা দিন সময় পেলেই। অফিস বা ক্লাস শেষ করেই বন্ধুদের নিয়ে বেড়িয়ে আসুন কোনো কফি শপ অথবা সিনেমা হল থেকে। আপনার আশপাশের বাসার প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলুন।
ব্যায়াম ও খেলাধুলা করুন
বন্ধুদের নিয়ে বিভিন্ন খেলার আয়োজন করুন। ক্রিকেট, ফুটবল অথবা সাইক্লিং প্রতিযোগিতা করতে পারেন। নিয়মিত ব্যায়াম ও খেলাধুলা করলে শরীর ও মন দুটাই ভালো থাকে।
নিজের জন্য কিছু কিনুন
কেনাকাটা করলে মানুষের মন ভালো থাকে। ভালো কোনো মার্কেট থেকে ঘুরে আসতে পারেন একা একাই। নিজের জন্য কিছু পছন্দ হয়ে গেলে কিনে ফেলুন। আর পকেটে টাকা না থাকলেই সমস্যা নেই। বড় বড় মার্কেটগুলোতে এমনেই ঘুরতে ভালো লাগে।
সৌখিন ও সৃজনশীল হয়ে উঠুন
আপনার শখ ও সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দিন। আপনি হয়তো খুব ভালো গান জানলে কোনো গানের দলের সাথে যুক্ত হয়ে যান। অথবা বই পড়তে ভালোবাসলে কোনো লাইব্রেরির সদস্য হয়ে যেতে পারেন। আবার শখ করে রংতুলি ও ক্যানভাস কিনে ছবি আঁকা শুরু করে দিতে পারেন চাইলে। আবার যাদের গিটারের প্রতি আগ্রহ থাকে তারা গিটার শেখার কোনো প্রতিষ্ঠানে ঢুকে যেতে পারেন।
