কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সরকার নানাবিধ উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করে থাকেন। বর্তমান সরকারও বাজেটে ঘোষিত সাত দশমিক দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে নিয়েছেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে এ প্রবৃদ্ধি যেন টেকসই এবং দরিদ্রবান্ধব হয় সেজন্যও উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় করণীয় বিষয়ও ঠিক করার বিকল্প নেই। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ পদক্ষেপের প্রথম ধাপ হিসেবে যেটা করতে হবে তা হলো, আর্থিক সেবা বঞ্চিত জনগণকে আর্থিক সেবার অন্তর্ভুক্ত করা। এজন্য গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ফরমাল (আনুষ্ঠানিক) অর্থনীতিতে নিয়ে আসা। যাতে প্রবৃদ্ধির সুফল শুধুমাত্র উচ্চ আয়ের লোক নয়, যারা দারিদ্র্যসীমা পিরামিডের নিচে অবস্থান করছেন তারাও পেতে পারেন।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এ কাজটি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। যেসব ব্যাংকের শাখা গ্রামে রয়েছে তাদের মাধ্যমে ইতিমধ্যে সুফল পাচ্ছেন গ্রামীণ জনগণ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এক্ষেত্রে দেশের ব্যাংকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। যেখানে ব্যাংকগুলোর শাখা রয়েছে, সেখানকার জনসাধারণ এ পরিবর্তনের প্রভাব অনুভব করতে পারছে। দেশের সমগ্র ভৌগোলিক পরিমন্ডল বিবেচনায় জনগণের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি মিলে মোট ব্যাংক রয়েছে ৫৬টি। যার মধ্যে ৪টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক, ৪টি বিশেষায়িত ব্যাংক, ৩৯টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৯টি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের আট হাজার ৪২৭টি শাখার সমন্বয়ে বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। গত সাড়ে চার বছরে (২০০৯-১৩) এক হাজার ৫২৭টি নতুন ব্যাংক শাখা খোলার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রামীণ জনসাধারণকে ব্যাংকিং সেবার আওতাভুক্ত করতেই নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রে অর্ধেক শাখা গ্রাম বা পল্লী এলাকায় স্থাপনের জন্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে। বর্তমানে শহরের চেয়ে গ্রামেই ব্যাংকের শাখা বেশি। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্জাগরণে ব্যাংকের এসব শাখা ভাল ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসার ফলে গ্রামে মহাজনী প্রথার অবসান হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য দূরীকরণে অনেক বেশি ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বর্তমানে ব্যাংকের সবগুলো শাখায় পাঁচ কোটি ৮৮ লাখ আমানতকারী ও ৯৫ লাখ ৯৮ হাজার ঋণগ্রহীতা রয়েছে। আর মোট আমানত ও ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে পাঁচ হাজার ৭৭১ ও ৪৪৬ বিলিয়ন টাকা। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে আমানতকারীর সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৭৬ লাখ এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ৮৫ লাখ ৭৯ হাজার। অর্থাত্ গত চার বছরের ব্যবধানে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে যথাক্রমে দুই কোটি ১২ লাখ এবং ১০ লাখ ১৯ হাজার। আমানত ও ঋণ হিসাবের সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৫৬ শতাংশ ও ১২ শতাংশ। এছাড়া ব্যাংকের বাইরে দেশে ৩১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। গত চার বছরে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৯০টি নতুন শাখা স্থাপিত হয়েছে। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সামষ্টিকভাবে ব্যাংকের মতো বড় না হলেও তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সুবিধার্থে লিজ ফাইন্যান্স, গৃহ ঋণ এবং প্রকল্প ঋণ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ বিশেষ ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
ব্যাংকের শাখার পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করছে। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে দ্রুত ও সহজে লেনদেন করার সুবিধা থাকায় দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এ মাধ্যম। দরিদ্র ও ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিত ও বিপুল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দেশের প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের চেয়ে মোবাইল ব্যাংকিং বেশি উপযোগী তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি এ ব্যাংক-লেড মোবাইল ব্যাংকিং মডেলটি সারা বিশ্বেই একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৭টি ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১৮টি ব্যাংক এই সেবা চালু করেছে। এই ব্যাংকগুলো সারা দেশে এক লক্ষের বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োজিত করেছে। এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের রেজিস্ট্রিকৃত গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২ লাখ। মাত্র তিন বছরের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণকারী গ্রাহকের এ সংখ্যা খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। মোবাইল ফোনভিত্তিক আর্থিক সেবা বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ অভিযানকে বেগবান করছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রসারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন বা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অভিযানকে ত্বরান্বিত করতে কৃষক, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী, অসহায় মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনসাধারণের নামে দশ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার জন্যে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ব্যাংকিং সেবাভুক্তির পরিমাণ আশাতীতভাবে বাড়ছে। বর্তমানে আর্থিক সেবাভুক্তির আওতায় কৃষকদের ৯৬ লক্ষাধিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর উপকারভোগীদের জন্যে ৩৬ লক্ষাধিক অর্থাত্ মোট এক কোটি ৩২ লক্ষাধিক হিসাব খোলা হয়েছে। এতে ব্যাংকিং সেবার পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ আর্থিক সেবার আওতায় আসছে। এর মাধ্যমে টেকসই ও দরিদ্রবান্ধব উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
