মাধ্যমিক স্কুলে অব্যবস্থাপনা

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:১৫
 শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে নতুন বিষয় বাধ্যতামূলক  মাঝপথে পরিবর্তন করা হচ্ছে সিলেবাস  প্রশিক্ষণ না দিয়েই সৃজনশীল পদ্ধতি চালু মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা। শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিতে নতুন নতুন বিষয় বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে বছরের মাঝামাঝি সময়ে পরিবর্তন করা হচ্ছে কারিকুলাম-সিলেবাস, পরিবর্তন আনা হয়েছে পরীক্ষা পদ্ধতিতেও। সরকারের এই সিদ্ধান্ত স্কুল পর্যায়ে কিভাবে বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়ে সুষ্ঠু কোন পরিকল্পনাও নেই। এছাড়া স্কুলগুলোর সার্বিক বিষয় দেখভাল করার জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নেই দক্ষ শিক্ষা প্রশাসনও। কোনমতে জোড়াতালি দিয়ে চলছে দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল। মাঠ পর্যায়ের স্কুল তদারকি ও দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষা কর্মকর্তারাও হতাশ। তাদের বক্তব্য, শিক্ষা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে চলতে হয়। এখানে আমাদের মতামত দেয়ার কোন সুযোগও নেই। মাঠ পর্যায়ের মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা ভালো নয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলে ‘চারু ও কারুকলা’ এবং ‘শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য’ বিষয়ে পাঠদান চলছে জোড়াতালি দিয়ে। পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষকের পদ সৃষ্টি না করেই এই দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশের ১৮ হাজার ৭০০ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮ হাজার ৩৩টি বিদ্যালয়েই নেই চারু ও কারুকলা বিষয়ের শিক্ষকের পদ। আর শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ের শিক্ষক পদ নেই চার হাজার ৫১৯টি বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চারু ও কারুকলা এবং শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটি বিষয় মিলে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয়। দুটি বিষয়েই তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়া হয়। শিক্ষক না থাকায় কে চারুকলা বিষয় পাঠদান করেন এমন প্রশ্নের জবাবে ভান্ডারিয়ার শিয়ালকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কিরন চন্দ বসু বলেন, ‘সমাজ, গণিত বা অন্য কোন বিষয়ের শিক্ষককে দিয়ে চারুকলা বিষয়ে পাঠদান করানো হয়।’ একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে খুলনার ফুলতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রফুল্ল চক্রবর্তী জানান, পার্টটাইম শিক্ষক দিয়ে কোনমতে বিষয়টি পড়ানো হয়। তিনি বলেন, চারুকলার কোন শিক্ষক না থাকায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। বাগেরহাট জেলাধীন মোড়েলগঞ্জের এসি লাহা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, চারুকলার শিক্ষক না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা চারুকলা বিষয়ে ক্লাস নেন। তিনি বলেন, এ বছরের মাঝামাঝি সময় ইংরেজির সিলেবাস পরিবর্তন হয়েছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের শংকা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুধু নতুন বিষয় চালু নয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ না দিয়ে কারিকুলাম, সিলেবাসও পরিবর্তন করা হচ্ছে। জানুয়ারির শুরুতে সিলেবাস পরিবর্তন করার নিয়ম থাকলেও জুন মাসে এসে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি বিষয়ের সিলেবাস পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে এ নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শংকা তৈরি হয়েছে। একাধিক শিক্ষক এই প্রতিবেদককে বলেছেন, এভাবে মাঝপথে সিলেবাস পরিবর্তন সরকারের সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পায়। সরকারের উচিত ছিল বছরের শুরুতে সিলেবাস পরিবর্তন করা; যাতে বছর জুড়ে শিক্ষার্থীরা এ বিষয় চর্চা করতে পারে। অন্যদিকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে পরীক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনছে সরকার। সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ না দিয়েই চলতি শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণির গণিত বিষয়ে চালু হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি। ফলে প্রশিক্ষণ না পাওয়া ‘দুর্বল’ শিক্ষকরা অনুমান করে শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পদ্ধতিতে গণিত পড়াচ্ছেন, নবম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন করেছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসলিমা বেগম এ বিষয়ে বলেছেন, চলতি বছরের মধ্যে এই প্রশিক্ষণ শেষ হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শিক্ষা বর্ষ শুরু হয়েছে। অথচ এখন সেপ্টেম্বর মাসে এসেও শিক্ষক প্রশিক্ষণ চলছে। তারা প্রশ্ন করেন, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এই শিক্ষকরা কবে স্কুলে গিয়ে পড়াবেন। ২০১৫ সালে এই শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। নবম শ্রেণিতে সৃজনশীল বিষয়ে চর্চা না করে কীভাবে এসএসসিতে সৃজনশীল বিষয়ে পরীক্ষা দেবে। এছাড়া যেসব স্কুলের শিক্ষক এখনো প্রশিক্ষণ পাননি তাদের অবস্থা কী হবে ? বরিশালের বাবুগঞ্জের খানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু জাফর জানান, তার প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষকও গণিতে সৃজনশীল বিষয়ে প্রশিক্ষণ পাননি। তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ৪শ শিক্ষার্থী রয়েছে। গণিতে শিক্ষক রয়েছেন দুই জন। প্রশিক্ষণ না পেলে পাঠদান কিভাবে হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সে আলোকেই গণিতে পড়ানোর চেষ্টা করছেন।’ অভিভাবক সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নীপা সুলতানা বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষন না দিয়ে নবম শ্রেণিতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় আমরা শংকিত। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এখনো শেষ হয়নি। প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর এই শিক্ষকরা আবার অন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে প্রচুর সময় চলে যাবে। শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ শেষে চলতি বছর আর শ্রেণি কক্ষে পাঠদান করতে পারবেন না। ফলে ভবিষ্যতে ফল বিপর্যয় হতে পারে। সার্বিক বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, চারুকলা বিষয়ে শিক্ষক এমপিওভুক্তি বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে কেন বিষয় বাধ্যতামূলক করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছুটা তো সমন্বয়হীনতা আছেই।’ শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষ না করে কেন সৃজনশীল চালু হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক প্রশিক্ষণ চলছে। যারা বিজ্ঞান সৃজনশীল প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তারা গণিত পড়াতে পারছেন। তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’