ধর্মের নামে মিথ্যাচারকে মোকাবিলা করতে হবে

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:১১
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ধর্ম ব্যবসায়ীদের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আওয়ামী লীগ যা করেছে অতীতে কোন সরকার তা করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ইসলামের সেবা করে। আর বিএনপি-জামায়াত ইসলামের নাম নিয়ে রাজনীতি এবং ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা করে। শুধু তাই নয়, তারা ধর্মের নামে মানুষকে ধোঁকা দেয়, প্রতারণা করে। যারা ধর্মের নামে মিথ্যাচার করছে তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করার জন্য তিনি আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। গতকাল শনিবার বিকালে গণভবনে আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে ধারাবাহিক মতবিনিময় সভার অংশ হিসেবে দলের নয়টি জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় বৈঠকে সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি আবারো নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সংবিধান অনুযায়ীই রাষ্ট্রপরিচালনাসহ সবকিছু চলবে। আগামী নির্বাচনও সংবিধান অনুযায়ীই হবে। বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় এদেশেও সেভাবেই হবে। অন্তত একটিবার দেশকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে, যাতে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। আর যেন অসাংবিধানিক বা অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় আসতে না পারে সেটি নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে একটি সংবিধান রয়েছে, হাইকোর্টের রায়ও রয়েছে। সংবিধান মোতাবেক দেশ চলবে। বাংলার মানুষ আর কত কষ্ট করবে? আর কত তাদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হবে? তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা ও জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার রক্ষায় আমরা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। তাই দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য সাংবিধানিক নির্দেশনা মেনেই রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে। বিরোধী দলীয় নেত্রীর হুমকির জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়া প্রতিদিনই তার বক্তৃতায় আমাকে দেশ থেকে বিতরণ ও সরকার উত্খাতের হুমকি দিচ্ছেন। এর আগেও ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বলেছিলেন আমি নাকি পালাবারও পথ খুঁজে পাবো না। অথচ আমি বহাল তবিয়তেই রয়েছি, আমাকে পালাতে হয়নি। আসলে ক্ষমতা ও সম্মান দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ, আর ভোট দেবার মালিক দেশের জনগণ। ফলে কে কাকে উত্খাত করে সেটি বলা যায় না। কারা ক্ষমতায় থাকবে, আর কারা থাকবে না, আগামীতে দেশের জনগণই নির্ধারণ করবে। দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব মহামন্দার মধ্যে এতো অল্প সময়ে দেশের এতো উন্নয়ন ও অগ্রগতি অনেকেরই পছন্দ হচ্ছে না। আন্তর্জাতিকভাবেও অনেকে রয়েছে তারাও চায় না বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াক। এছাড়া আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছি, রায়ও পাচ্ছি। এ কারণে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও তাদের দোসররাও আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত। তাই তারা নানা ষড়যন্ত্র করছে, নির্বাচনের আগেও নানা ষড়যন্ত্র করবে। সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থেকে দেশবিরোধী এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হবে। বিরোধী দলীয় জোটসহ হেফাজতের অপপ্রচার মোকাবেলায় দলীয় নেতাকর্মীসহ দেশবাসীকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে সরল মা-বোনদের বিভ্রান্ত করতে নানা অপপ্রচার ও মিথ্যাচার করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে গত ৫ মে হেফাজতের তাণ্ডবের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, যারা পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে মিথ্যাচার করে, মসজিদে আগুন দেয়, শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দেয়- তারা কী সত্যিই প্রকৃত ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে? তাদের কাছে ইসলাম কীভাবে হেফাজত থাকে? একজন প্রকৃত মুসলমান কী কখনো এসব ঘৃণ্য কাজ করতে পারে? তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে ওইদিন বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী ও হেফাজতের তাণ্ডব, মসজিদে আগুন ও কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা দেশবাসী দেখেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই ঘটনার পর আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী ও তাদের দোসররা বললেন, হাজার হাজার মানুষকে নাকি হত্যা করা হয়েছে? ওই রাতে নাকি প্রায় দেড় লাখ গুলিবর্ষণ করা হয়েছে? প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, দেড় লাখ গুলিবর্ষণ করা হলে ওই এলাকার (মতিঝিল) প্রতিটি বাড়ি-ঘর, অফিস-আদালতই তো ঝাঁঝরা হয়ে যেত। হাজার হাজার মানুষ মরলে মাত্র দেড় ঘন্টায় এতো লাশ কোথায় গেল? এতো মানুষ মরলে তাদের আত্মীয়-স্বজন বা বাবা-মা কেউ-ই তো এসে তা বলছে না। তিনি বলেন, আমরা যখন তালিকা চাইলাম তখন হাজার হাজার থেকে একলাফে কমে তা ৬১ জনে এসে দাঁড়ালো। এক এনজিও ৬১ জনের যে নামের তালিকা দিয়েছে তাও ভুয়া। এরমধ্যে অধিকাংশরই কোনো নাম-ঠিকানা নেই, ৩ জন জীবিত অবস্থায় এখনও মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছে, আর বাকি যে ক’জনের নাম রয়েছে তারা বিভিন্ন সময় মারা গেছে। বর্তমান মহাজোট সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও সাফল্যের বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকতে দেশের উন্নয়ন নয়, খুনীদের মদদ, খুন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও বাংলা ভাই সৃষ্টি, দুর্নীতি করে বিদেশে অর্থ পাচার করাই বিরোধী দলীয় নেত্রীর (খালেদা জিয়া) কাজ। ক্ষমতায় থাকতে গ্রেনেড মেরে উনি আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেবকে হত্যা করেছেন, আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপিকে হত্যা করেছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড মেরে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্য ও পুত্রদের জড়িত থাকার তথ্য। তাঁর পুত্ররা বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির অর্থ পাচার করেছে। হাওয়া ভবন খুলে দুর্নীতি করেছে। আমরা সেই দুর্নাম থেকে দেশকে মুক্ত করেছি। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধু ও জেলা হত্যা মামলার আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দিয়ে তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন। পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদও বঙ্গবন্ধুর খুনীকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করেছিলেন। বর্তমান বিরোধী দলীয় নেত্রীও খুনীদের পুরস্কৃত করেছেন, ভোটারবিহীন ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর খুনীকে বিজয়ী করে বিরোধী দলের নেতা পর্যন্ত বানিয়েছিলেন, স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের হাতে রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। তিনি (খালেদা জিয়া) দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না বলেই এসব করেছেন। ‘তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে’ মর্মে বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা হঠাত্ করেই সংবিধান সংশোধন করিনি। কিছু মানুষ একথা বলে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন শ্রেণী-মানুষের মতামত গ্রহণের পর সংবিধান সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এতো দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণের পর সংবিধান সংশোধনের ঘটনার নজীর নেই। প্রধানমন্ত্রী গতকাল চতুর্থ পর্যায়ে বরিশাল জেলা, বরিশাল মহানগর, মৌলভীবাজার, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, পিরোজপুর, বগুড়া, হবিগঞ্জ ও নিজ জেলা গোপালগঞ্জের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের শুরুতেই আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূল নেতাদের মতামত নিতে অনেকটাই পরীক্ষার স্টাইলে ১০টি প্রশ্ন সম্বলিত একটি করে ফরম দেয়া হয়। তৃণমূল নেতারা বৈঠকের মধ্যেই তিন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে ফরম পূরণ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেন। তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্ভাব্য প্রার্থীদের সর্বশেষ অবস্থান বিষয়ে আমাদের কাছে বিভিন্ন মাঠ জরিপ রিপোর্ট রয়েছে। তৃণমূল নেতাদের কাছ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তিনজনের নাম নেয়া হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে তৃণমূল নেতাদের মতামত এবং জরিপ রিপোর্টগুলো যাচাই-বাছাই করেই দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হবে। আর দল যাকে মনোনয়ন দেবে সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তৃণমূল নেতারা নির্ধারিত ফরম পূরণের পাশাপাশি বক্তৃতায় স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। কেন্দ্রীয় উপ-দফতর সম্পাদক এ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের সঞ্চালনায় বৈঠকে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, কাজী জাফরউল্যাহ, অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, নূহ-উল-আলম লেনিন, সতীশ চন্দ্র রায়, মাহবুবউল আলম হানিফ, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, আবদুল মান্নান খান, উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, আসাদুজ্জামান নূর, এএইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, ড. আবদুস সোবহান গোলাপ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।