প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ঘাতকের কঠিন আঘাতে প্রাণ গেলো ফুটফুটে মেয়ে আফসারী আক্তারের। ১ সেপ্টেম্বর ঘটনাটি ঘটল ময়মনসিংহে। আফসারী ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিল। ময়মনসিংহ শহরের নওমহল এলাকার বখাটে ছেলে সামাদের মাথায় শখ চেপে বসলো একই এলাকার সুন্দরী, মেধাবী মেয়ে আফসারীর সাথে প্রেম করতে হবে তার। প্রেমের প্রস্তাবের প্রত্যাখ্যান; বখাটে সামাদ তা মেনে নিতে পারলো না। তাই বন্ধুর জন্মদিনে বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঘুরতে আসা আফসারীকে খতম করার প্রয়াসে ইট দিয়ে মাথা-মুখ থেতলে দিলো। আর এই বর্বরোচিত কাজটি করলো সামাদ। আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা প্রতিদিনকার। ঘটনার বিষয়বস্তু নতুন কিছু নয়। ঘটনার কিছুদিন পর এ নিয়ে অনেক রিপোর্টিং হয় মিডিয়ায়। এলাকায় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানববন্ধন করে লোকজন এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিচার দাবি করে। তারপর সব ভুলে যাওয়া। এমনটাই চলে আসছে। কিন্তু এর স্থায়ী সমাধান কোথায় আছে তা কেউ জানে না।
যা থেকে যায় তা হলো শুধুই তিক্ত অভিজ্ঞতা। যেমন এমন প্রত্যেকটি ঘটনার ক্ষেত্রেই দেখা যায় দোষী ব্যক্তিটির কিছু হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় যে প্রভাবশীলদের প্রচ্ছন্ন ছায়ায় তারা মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। তাতে করে একটা শ্রেণি যা ইচ্ছে তাই করে চলেছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ মনে করে ‘কী আর হবে মামলা চালিয়ে’ ওরা তো অনেক ক্ষমতাধর, পার তারা ঠিকই পেয়ে যাবে! বিচারের প্রতি এই অবিশ্বাস আমাদের সমাজকে এক নারকীয় অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা দেখছি নারীর নিরাপত্তায় বা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে যে আইনগুলো আছে তা সেভাবে ফলপ্রসূ হচ্ছে না। আইন থেকে খুব একটা ফল না পাবার আরও একটি কারণ, আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা। অথচ নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কত ভালো আইন আছে আমাদের দেশে! যেমন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত-২০০৩) যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০, অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন ২০০৯, পর্নোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ আইন- ২০১৩, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২। আমরা যদি এ আইনগুলোকে পর্যলোচনা করি, তবে দেখতে পাবো তার মধ্যে রয়েছে নারীর প্রতি সকল সহিংসতার বিরোধী ক্ষমতা অর্থাত্ সকল সহিংসতা প্রতিরোধে এ গুলোর বলিষ্ঠ ভূমিকা। কিন্তু এতো আইন থাকার পরও আমাদের নারীরা প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে সহিংসতার শিকার হচ্ছে; নিজ ঘর থেকে শুরু করে বিয়ে, সংসার, অফিস-আদালত এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত তা বিস্তৃত।
এর কারণ হলো উপরে উল্লেখিত বলিষ্ঠ সহিংসতা প্রতিরোধ আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো এসব আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে প্রচণ্ড দুর্বলতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষার বিষয়টি সাংঘাতিকভাবে উপেক্ষিত। যার কারণে সাধারণের মধ্যে আইন প্রয়োগের প্রতি ভরসার জায়গাটি ক্ষিণ হয়ে পড়ে। তাই এসব বিষয়ে সঠিক ও সময় উপযোগী পদক্ষেপ নেয়া দরকার। তার সাথে সাথে আদালতে, প্রশাসনে স্বজনপ্রীতি, টাকার খেলাও বন্ধ হওয়া দরকার। তা না হলে নিচে গাছ কেটে উপরে পানি ঢালার মতই হতে থাকবে। তাছাড়া আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতার জন্য যেন কেউ হয়রানি বা অনীহার স্বীকার না হন তাতেও সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। মোট কথা নারী বান্ধব আইনগুলোকে যে কোন মূল্যে আমাদের নারী সমাজের কাছে প্রচারের পাশাপাশি জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। আর সেটি কেবল সরকার বা আদালত একা সফল করতে পারবেন না । বরং আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও এ ক্ষেত্রে অংশ নিতে হবে। কাজ করতে হবে যার যার কর্মপরিকল্পনায়।
— কেয়া চৌধুরী, সমাজকর্মী
