শিক্ষানুরাগী মহাত্মা চন্দ্রনাথ বসু

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৩৫
চন্দ্রনাথ বসু নামটি এখন আর তেমন কেউ স্মরণ করে না। নতুন প্রজন্মের অতি অল্প লোকই জানে তার কথা। অথচ একটি অবহেলিত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো জ্বালাতে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তিনি এলাকাবাসীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিজের জীবন ও সম্পদ উজাড় করে গেছেন। মহাত্মা চন্দ্রনাথ বসু ১৮৯৩ সালের ডিসেম্বর মাসে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কৈলাস চন্দ্র বসু এবং মাতার নাম সৌদামিনী দেবী। চন্দ্রনাথ বসুর যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স তখন এশিয়াটিক কলেরায় বিনা চিকিত্সায় তাঁর মা মারা যান। এই মর্মান্তিক ঘটনা শিশু চন্দ্রনাথের মনে গভীর রেখাপাত করে। পরবর্তীকালে যেখানেই কলেরা মহামারী আকারে দেখা দিত, সেখানেই তিনি ছুটে যেতেন রোগীদের সেবা করতে। এভাবে নিজ জীবন থেকেই তিনি জনসেবার শিক্ষা পেয়েছিলেন। ১০ বছর বয়সে তাঁর পিতা মারা যান। অনাথ চন্দ্রনাথ রামদিয়া থেকে তিন মাইল পায়ে হেঁটে ফুকরা হাই স্কুলে পড়তে যেতেন। ফুকরা হাই স্কুলটি ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তার লেখাপড়া বেশি দূর এগোয়নি। কারণ তাঁর চোখে অসুখ দেখা দেয়। এই স্কুলে তিনি সম্ভবত সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছিলেন। দেশ সেবা বলতে চন্দ্রনাথ বুঝতেন পল্লীর মানুষের সেবা। বন্যা রোধের জন্য বাঁধ দেয়া, খরায় জল সেচের জন্য খালকাটা, যোগাযোগের জন্য রাস্তা নির্মাণ, মজা পুকুর পরিষ্কার করা, জঙ্গল সাফ করা এই ছিল তাঁর কাজ। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান করে কারাবরণ করলেন চন্দ্রনাথ। জলার মাছের স্বত্ব প্রজার- এই দাবির ফলে জমিদারদের সাথে তাঁর বিরোধ হলো। হিন্দু, মুসলমান জমিদারগণ নানা অপকৌশলে মামলায় ফেলে তাঁকে জেলে পুরে দিলেন। কিন্তু ততদিনে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী, সতীশচন্দ্র দাস গুপ্ত প্রমুখ নেতৃবর্গের সাথে চন্দ্র্রনাথের পরিচয় হয়েছে। অনেকে তাঁর কর্মস্থল রামদিয়া ঘুরেও গেছেন। তারা ব্যারিস্টার জি.গুপ্তকে পাঠিয়ে উচ্চ আদালত থেকে তাঁকে খালাস করে আনলেন। চন্দ্রনাথ বুঝতে পারলেন যে, প্রজাদের শোষণ করার কাজে জমিদারবর্গের পেছনে মূল শক্তি ব্রিটিশ সরকার। এই ভেবে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেন। ছেলেবেলায় শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে শিক্ষার প্রতি চন্দ্রনাথের মনে একটি প্রবল আকর্ষণ ও আগ্রহ ছিল। দীর্ঘদিন মনে পুষে রাখা সেই বাসনা কার্যকর করার একটা সুযোগ খুঁজে পেলেন চন্দ্রনাথ বসু। ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ইতিপূর্বে রামদিয়া এসেছেন। এসেছেন অনেকেই। তারা চন্দ্রনাথের সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করেছেন। এক সভায় চন্দ্রনাথ বসু তাদের সামনে রামদিয়ায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সকলে একমত হলেন। কিন্তু কলেজ প্রতিষ্ঠার স্থান নিয়ে সভায় বিতর্ক হয়। ওড়াকান্দির শ্রীপতি ঠাকুররা নমঃশূদ্র সমাজের গুরু। তাদের দাবি কলেজটি ওড়াকান্দিতে হোক। ১৯৪০ সালে এ নিয়ে রামদিয়ায় এক সভা হয়। ডাঃ শ্যামা প্রসাদ, সতীশ ঘোষ প্রমুখ ছিলেন সেখানে। ড. বিজয় কুমার সভাপতিত্ব করেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কলেজ হবে রামদিয়ায়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৮২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ডাঃ শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় রামদিয়া শ্রীকৃষ্ণ কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ডাঃ শ্যামা প্রসাদ ছিলেন কলেজের আজীবন সভাপতি। প্রথম সেক্রেটারী প্রিয়রঞ্জন সেন ও দেবেন ভট্টাচার্য্য। কলেজের অনুমোদনের সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় আর কলেজসমূহের পরিদর্শক ছিলেন অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র ঘোষ। সকলের অকাতর দানে গড়ে উঠলো কলেজ, ছাত্রাবাস ও শিক্ষক নিবাস। গ্রামের লোকেরা ২০ বিঘা জমি দান করেন। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পরে চন্দ্রনাথ বসু দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ১৯৫১ সালের ১৮ জুন মুক্তি পান। কারাভ্যন্তরেই তার সাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্তরঙ্গতা হয়। পরে তিনি পশ্চিম বাংলায় চলে যান। পশ্চিমবঙ্গেও তিনি বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৭ সালে জানুয়ারি মাসে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান চন্দ্রনাথ বসুর সাথে সাক্ষাত্ করে তাকে পূর্ববাংলায় গিয়ে বসবাস করার আমন্ত্রণ জানান। তার আমন্ত্রণে চন্দ্রনাথ বসু জন্মভূমি রামদিয়ায় এসে দেখলেন যে, শ্রীকৃষ্ণ কলেজের কাছে তিনি যে হাটটি বসিয়েছিলেন তাতে কলেজের কাজকর্ম ও শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছে। তাই তিনি অন্যত্র ২৫ বিঘা জমি সংগ্রহ করে ২০০টি অস্থায়ী দোকান বসানোর ব্যবস্থা করেন। বালিকা বিদ্যালয়টি ধ্বংস হবার উপক্রম হচ্ছিল, তার পুনঃব্যবস্থা করা, খালকাটা ও রাস্তা-ঘাট নির্মাণাদি বন্ধ ছিল, তার ব্যবস্থা করা, ঘৃতকান্দির বন্ধ ডাক্তারখানাটি রামদিয়ায় স্থানান্তরিত ও চালু করা ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করেন। এসব কাজে মাসাধিককাল রামদিয়ায় অবস্থান করার পর পুনরায় তিনি কলকাতায় ফিরে যান। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে চন্দ্রনাথ বসু আবার রামদিয়ায় চলে আসেন। ১৯৭৫ সালে আবার কলকাতায় ফিরে যান। ১৯৭৯ সালের ২রা জুন ৮৬ বছর বয়সে তিনি কলকাতায় মারা যান।