নাটোরে ১০ হাজার শিশু স্কুলে যায় না উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচি ব্যর্থ

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:২৫
জেলার ১০ হাজার শিশু স্কুলে যায় না। অনেকে ভর্তি হয়েও কিছুদিন পর আর ওমুখো হয় নি। ঐসব শিশুদের অভিভাবকের অধিকাংশই অতি দরিদ্র। তারা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর পরিবর্তে আয়ের জন্য কোন কর্মে নিয়োজনকেই অধিক লাভজনক বিবেচনা করে। এছাড়া যৌন নিপীড়নের ভয় ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে অনেক পিতা মাতা তার মেয়ে শিশুকে স্কুলে পাঠায় না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, অভিভাবক, স্কুলের শিক্ষক ও জনপ্রতিনিথিদের সাথে আলাপ করে আরও জানা গেছে, নাটোর জেলায় ৪০৬টি সরকারি ও ২৯১টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৮টি কমিউনিটি বিদ্যালয় আছে।দেশের বিপুল সংখ্যক নিরক্ষর মানুষকে স্বাক্ষরের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৯৯৩ সালে সমন্বিত উপ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম শুরু করে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল চার থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী করা। ছয় থেকে ১০ বছর বয়সের ঝরে পড়া শিশু, ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশু ও ১৫ থেকে ৩৫ বছরের নারী-পুরষকে সাক্ষর করা। এ ছাড়া প্রতি জেলায় ১০টি গ্রাম শিক্ষা মিলন কেন্দ্র স্থাপন। মিলন কেন্দ্রগুলো পাঠাগার হিসাবে ব্যবহারের জন্য। ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে নাটোর জেলায় ঐ শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য মোট ৪১৫টি কেন্দ্র চালু করা হয়। এর মধ্যে সরকার পরিচালিত কেন্দ্র ছিল ৫০টি। অবিশিষ্ট কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ঢাকার এনজিও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ৩০, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ৩৫, সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ৩০টি ও বগুড়ার ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস) পায় ২৭০টি কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের সর্বসাকুল্যে বেতন ছিল মাসে ৫০০ টাকা। শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় খাতা পেন্সিল। কেন্দ্রে হারিকেন, কেরোসিন, চাটাই, ব্লাকবোর্ড ও চক দেওয়া হয়। এই আয়োজনে দুই বছরে মোট খরচ হয় এক কোটি ৮৮ লাখ টাকা। প্রতিকেন্দ্রে ৩০ জন শিক্ষার্থীর নাম তালিকাভুক্তি করা হলেও পরে নানা কারণে উপস্থিতির সংখ্যা কমে যায়। এনজিও পরিচালকরা দায়সারা দায়িত্ব পালন করেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে ইউনেস্কো প্রশ্ন তোলে, পাঁচ বছর বয়সের শিশুদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষা চালু হওয়া সত্বেও এনজিও দিয়ে কেন একই বয়সের শিশুকে পড়ানো হবে? আর্থিক অনিয়মের বিষয়টিও উঠে আসে আলোচনায়। ২০০৩ সালে ঐ কর্মসূচি বাতিল করা হয়। এর আগে ১৯৯৫ সালে এই কর্মসূচি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে নেওয়া হয়। নাটোর জেলায় সরকার ও চারটি এনজিও ৪১৫ কেন্দ্র মোট ১৩ হাজার এক শ’ জনকে সাক্ষর জ্ঞান দিয়েছে বলে দাবী করা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দারিদ্র্যতা ও সচেতনতার অভাবে ঐ কর্মসূচির সাফল্য খুবই সামান্য। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাথে আলোচনা করে যায়, কেন্দ্রে গিয়ে অনেকে নাম সাক্ষর করা শিখেছে, কিন্তু বই পুস্তক পড়ার মত শিক্ষা অর্জন করতে পারেনি। একই সময়ে অর্থ্যাত্ ১৯৯২ সালে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধিনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষার কার্যক্রম চালু করে। এতে প্রাক-প্রাথমিক, গণশিক্ষা ও কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। নাটোর জেলায় ১৭৭টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। প্রতি কেন্দ্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ এবং শিক্ষক একজন। শিক্ষকের বেতন ২০০০ টাকা। দুই মন্ত্রণালয়ের প্রায় একই কর্মসূচি হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ গরিব মুসলমান অভিভাবক তার সন্তানকে মসজিদে পাঠাতে বেশি পছন্দ করেন। ২০০৫ সালে উপ আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যুরোর মাধ্যমে পুনরায় সাক্ষরতা কর্মসূচি চালু করা হয়। মানব উন্নয়নের জন্য সাক্ষরতা উত্তর ও অব্যাহত শিক্ষা প্রকল্প-২ নামে এই কর্মসূচির আওতায় প্রথম পর্যায়ে নারী পুরুষকের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল- দর্জি বিজ্ঞান, পশু সম্পদ, নার্সারী, মাছ, সবজী, ফুল ও ফল চাষ, হাউজ ওয়ারিং, পাম্প মেশিন মেরামত প্রভৃতি। এই ট্রেডের মাধ্যমে সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ১১ থেকে ৪৫ বছর বয়সের নারী পুরুষকে আত্মনির্ভরশীল ও কর্মমুখী করে গড়ে তোলা। দ্বিতীয় পর্যায়ে সেনিটারি ল্যাট্রিন তৈরি, মৌচাষ, রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল মেরামত ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। তৃতীয় পর্যায়েও একই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নাটোর জেলার ২০০৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০১২ সালের ২৬ জুলাই পর্যন্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলে। কর্মসূচির আওতায় জেলার ২০৪০ জন পুরুষ ও একই সংখ্যক নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জেলা উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক রুকুনুদ্দীন সরকার জানান, মানব উন্নয়নের জন্য সাক্ষরতা উত্তর ও অব্যাহত শিক্ষা প্রকল্প-২ এর কাজ শেষ হয়েছে। অচিরেই পরবর্তী প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।