দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে নওগাঁয় দুই বড় দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়-ঝাঁপ ও প্রচারণা ততই বাড়ছে। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদ্যস্যদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক আগে থেকে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে জনসাধারণ। হিসাব নিকাশের বাইরে নেই বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে কেন্দ ীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এ দিকে জাতীয় পার্টি, জামায়াত, সিপিবি, বাসদ, বিকল্প ধারার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জোটের বাইরে রেখে হিসাব-নিকাশ কষতে রাজি নয় সাধারণ জনগণ।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির ভোট ব্যাংক হিসাবে পরিচিত নওগাঁর ছয়টি আসনই গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঘরে চলে যায়। আসনগুলো ধরে রাখতে উন্নয়নের নানান প্রচারণা ও গণসংযোগ করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এদিকে হারানো আসন ফিরে পেতে বিএনপি নেতা-কর্মীরা মরিয়া হয়ে নির্বাচনী প্রচার ও গণসংযোগ শুরু করেছেন।
এলাকা ঘুরে জানা গেছে, দুই জোটের সম্ভাব্য প্রার্থীরা গত রমজান মাসে বিভিন্ন ইফতার মাহফিল, যাকাত বিতরণের মধ্যে দিয়ে নির্বাচনী প্রচরণা শুরু করেছেন। এলাকায় ইতিমধ্যে ডিজিটাল ব্যানার, পোস্টার, বিলবোর্ড, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে।
নওগাঁ-১ ঃ নিয়ামতপুর, সাপাহার ও পোরশা নিয়ে গঠিত এই আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য সাধন চন্দমটির সাবেক প্রচার সম্পাদক, জেলা কমিটির সদস্য মাসরুরাল হক রুবেল চৌধুরী, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরী, বিএনপির সাপাহার থানা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যক্ষ মো. আব্দুন নূর, পোরশা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা, পোরশা থানা বিএনপির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শাহ খালেদ হাসান চৌধুরী পাহিন, সাপাহার থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক নূরুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নওগাঁ জেলার আমীর অধ্যাপক মো. সালেকুর রহমান, পোরশা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মো. আব্দুল মাজেদ, জাতীয় পার্টির নেতা আকবর আলী কালু, বাসদ নেতা মঙ্গল কিস্কু।
সাধন চন্দ্র মজুমদার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যেমে এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। অপরদিকে আওয়ামী লীগের একটি অংশকে নিয়ে মাসরুরাল হক রুবেল চৌধুরী প্রচরণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরী ও বিএনপির চার সম্ভাব্য প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. আব্দুন নূর, মাসুদ রানা, ইঞ্জিনিয়ার শাহ খালেদ হাসান চৌধুরী পাহিন ও নূরুল ইসলামও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নওগাঁ-২ ঃ পত্নীতলা ও ধামইরহাট— এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে সম্ভব্য প্রার্থীরা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শহীদুজ্জামান সরকার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আকতারুল ইসলাম, নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক, কেন্দ্রীয় বিএনপির কৃষি বিষয়ক সম্পাদক, জেলা বিএনপির সভাপতি সামসুজোহা খান, বিএনপি নেতা খাজা নাজিবুল্লাহ চৌধুরী, বিকল্প ধারার বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব আব্দুর রউফ মান্নান, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল হোসেন, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ময়েন উদ্দিন।
শহীদুজ্জামান সরকার এলাকায় উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সুনাম কুড়িয়েছেন। অন্যদিকে সামসুজোহা খান গণসংযোগ ও সমাবেশ করে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
নওগাঁ-৩ ঃ মহাদেবপুর ও বদলগাছী— এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে সম্ভব্য প্রার্থীরা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য আকরাম হোসেন চৌধুরী, মহাদেবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছলিম উদ্দিন তরফদার সেলিম, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এনামুল কবির মনজু, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আখতার হামিদ সিদ্দিকী, জেলা বিএনপির সদস্য ফজলে হুদা বাবুল, কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য বিএসএ হুমায়ন কবীর চৌধুরী, বাসদের জেলা কমিটির আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল। এই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক গ্রুপিং।
দলীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সংসদ সদস্য আকরাম হোসেনের বদলে অধিকাংশ নেতা-কর্মী ছলিম উদ্দিন তরফদারের সাথে গণসংযোগ করে যাচ্ছে। একইভাবে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আখতার হামিদ সিদ্দিকীর বদলে অধিকাংশ নেতা-কর্মী ফজলে হুদা বাবুলের পক্ষে প্রচরণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নওগাঁ-৪ ঃ একটি মাত্র উপজেলা মান্দা নিয়ে গঠিত এই আসনে সম্ভব্য প্রার্থীরা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল লতিফ শেখ, সাধারণ সম্পাদক সরদার জসিম উদ্দিন, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সামছুল আলম প্রামাণিক, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. ইকরামুল বারী টিপু, সহ-সভাপতি ইছহাক আলী সেন্টু, ইঞ্জিনিয়ার (অবঃ) আককাস আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দলের সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল মতিন, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এনামুল হক, উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলতাফ হোসেন, উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি খম আব্দুর রাকিব, সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. ফজলুর রহমান।
এ আসনে আওয়ামী লীগের অন্যান্য প্রার্থীর চেয়ে বর্তমান সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিকের অবস্থান তুলনামূলক ভালো বলে জানা যায়। অন্যদিকে বিএনপি থেকে সামছুল আলম প্রামাণিক ও ডা. ইকরামুল বারী টিপুর মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছে দলীয় নেতা-কর্মীরা।
নওগাঁ-৫ ঃ সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে সম্ভব্য প্রার্থীরা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য মো. আব্দুল মালেক, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম ফজলে রাব্বী বকু, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শাহিন মনোয়ারা হক, মরহুম আব্দুল জলিলের স্ত্রী রেহেনা জলিল, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুল হক, জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক জাভেদ জাহাঙ্গীর সোহেল, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইছহাক আলী, কেন্দ্রীয় বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক লে. কর্নেল (অবঃ) আব্দুল লতিফ খান, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ধলু, নওগাঁ পৌর মেয়র নজমুল হক সনি, জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ইফতারুল ইসলাম বকুল, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বারিক, সিপিবির জেলা কমটিরি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মহসীন রেজা।
আব্দুুল জলিলের মৃত্যুর পর জেলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা চেয়েছিলেন প্রয়াত আব্দুল জলিলের স্ত্রী রেহেনা জলিল অথবা তার পরিবারের কাউকে মনোনয়ন দিয়ে তার পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে; কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে মো. আব্দুল মালেক মনোনয়ন পেলে জেলা আওয়ামী লীগে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এদিকে এ আসনে বিএনপিতে তেমন কোন কোন্দল না থাকলেও লে. কর্নেল (অবঃ) আব্দুল লতিফ খান, জাহিদুল ইসলাম ধলু, নজমুল হক সনি দলের নেতা-কর্মীদের সাথে সব সময় যোগাযোগ রেখে তাদের মনোনয়নের দাবি জোরালো করে তুলছেন। ।
নওগাঁ-৬ ঃ রানীনগর ও আত্রাই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে সম্ভব্য প্রার্থীরা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম, প্রকৌশলী মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলী, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বুলু, কেন্দ্রীয় জাসাসের সহ-সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির, সিপিবির জেলা কমিটির সভাপতি প্রদ্যুত ফৌজদার, জাতীয় পার্টির নেতা আবু হেনা মোস্তফা জুয়েল।
ইসরাফিল আলম সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলায় শক্তিশালী সাংগঠনিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এদিকে আনোয়ার হোসেন বুলু তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মাঝে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম ফজলে রাব্বী বকু বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা যাকে মনোনয়ন দিবেন সেটাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সরকারের সামনে তুলে ধরতে পারলে সবগুলো আসনেই জয়লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি সামসুজোহা খান বলেন, সরকারের ব্যর্থতার কারণে সাধারণ জনগণ ১৪ দলীয় জোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কয়েকটি আসনেই নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন কোন প্রার্থী প্রধান দুইটি দলের মনোনয়ন পাবেন সে নিয়ে চলছে নানা ধরনের গুঞ্জন।
