শিক্ষা আইন ২০১৩:শিক্ষক ও প্রশিক্ষণ

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৩
সকলের মতামত প্রদানের জন্য খসড়া শিক্ষা আইন জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রাপ্ত মতামতসমূহ যাচাই-বাছাই করে আইন প্রণেতাদের মাধ্যমে শিক্ষা আইন ২০১৩ পাস করা হলে তা হবে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মান উন্নয়নের সহায়ক। খসড়া আইনে অনেক নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তথাপিও কিছু ক্ষেত্রে মতামত প্রদানের সুযোগ রয়েছে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে শিক্ষক ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক আমার কিছু মতামত তুলে ধরছি। ধারা ১৩-তে ৩টি উপধারায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক নির্বাচনের বিবরণ প্রদান করা হয়েছে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সর্বনিম্ন যোগ্যতা সকল স্তরে ন্যূনতম জিপিএ-২.৫ অথবা দ্বিতীয় বিভাগসহ এইচএসসি অথবা সমমানের পরীক্ষায় পাস। আবার ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জন্য সর্বনিম্ন যোগ্যতা সকল স্তরে ন্যূনতম জিপিএ-২.৫ অথবা দ্বিতীয় বিভাগ/ শ্রেণিসহ স্নাতক অথবা সমমানের পরীক্ষায় পাসের কথা বলা হয়েছে। আবার ধারা ২৭ এ উপধারা (১) এর ক ও খ-তে মাধ্যমিক স্তরের নবম হতে দশম এবং একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির জন্য শিক্ষক নিয়োগে পৃথক শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক স্তরে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা একরকম এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা অন্য রকম। একইভাবে মাধ্যমিক স্তরে নবম ও দশম শ্রেণির জন্য শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা একরকম এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা অন্যরকম হলে শিক্ষাক্ষেত্রে অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাছাড়া প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে। কাজেই প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অর্থাত্ প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকতার জন্য শিক্ষকদের একই রকম যোগ্যতা নিরূপণ করা উচিত। উভয় ক্ষেত্রে অর্থাত্ প্রথম হতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জন্য সর্বনিম্ন যোগ্যতা হতে পারে— সকল স্তরে ন্যূনতম জিপিও-২.৫ অথবা দ্বিতীয় বিভাগ/ শ্রেণিসহ স্নাতক অথবা সমমানের পরীক্ষা পাস। আবার সম্পূর্ণ মাধ্যমিক স্তরের অর্থাত্ নবম হতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগের জন্য এক ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিরূপণ করা উচিত। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় ক্ষেত্রে হাওর, পার্বত্য এলাকা, চর ও দ্বীপ এলাকার জন্য শ্রেণি ভেদে এই যোগ্যতা শিথিল করা যেতে পারে। উল্লিখিত উভয় স্তরে ইতোমধ্যে নিয়োগকৃত বা কর্মরত শিক্ষকদের জন্য (যাদের যোগ্যতার ঘাটতি আছে) এ আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ প্রদান করা যেতে পারে। মাধ্যমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অন্য কোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে অসুবিধা দেখা দিলে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে একদিকে অপচয় ও অব্যবস্থাপনা দূরীভূত হবে অন্যদিকে যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের দীর্ঘদিনের চাহিদা মিটবে। যেহেতু মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তাই মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদটির একটি সাধারণ নাম দিতে হবে। প্রধান শিক্ষক অথবা অধ্যক্ষ অথবা অন্য কোনো নাম দেয়া যেতে পারে। সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের নির্বাচন বা নিয়োগের যোগ্যতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। এক্ষেত্রে পদের নাম যা-ই হোক না কেন শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রী বাধ্যতামূলক করতে হবে। আবার ধারা ২৭-এর উপধারা (৪) এ বলা হয়েছে ,‘সরকার পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে একজন পূর্ণকালীন অথবা খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে- যিনি প্রতিবন্ধীসহ অনগ্রসর শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হইবেন।’ চমত্কার একটি প্রস্তাব। ধারা ২৭-এ উপধারা হিসেবে শিক্ষার্থীদের পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদানের জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে একজন পূর্ণকালীন অথবা খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা অথবা শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনকে প্রশিক্ষণ প্রদানপূর্বক দায়িত্ব প্রদানের বিষয়টি সংযোজন করা যেতে পারে। ধারা ২২ (খ) এর উপধারা (৪) এ বলা হয়েছে:‘শিক্ষার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান এবং দক্ষতা অর্জন নিশ্চিতকল্পে মাধ্যমিক পর্যায়ে কর্মরত মাদ্রাসা শিক্ষকদের বি.এম.এড ডিগ্রি অর্জনের ব্যবস্থা গ্রহণসহ নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বি.এম.এড ডিগ্রি অর্জন বাধ্যতামূলক করা হইবে।’ ‘বি.এম.এড ডিগ্রির জন্য ভর্তির যোগ্যতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। কেননা বর্তমানে নির্ধারিত ভর্তির যোগ্যতার আওতায় মাদরাসায় কর্মরত শিক্ষকের বি.এম.এড প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ সীমিত। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উচ্চতর পদসমূহ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রমোশনের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। তাহলে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের উচ্চতর পদে প্রমোশনের জটিলতা অনেকাংশেই দূরীভূত হবে এবং মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সেবা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ধারা ৫৫-এর উপধারা (৪) এ বলা হয়েছে,‘ সরকারি স্বার্থে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পদায়ন ও অবস্থানের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বিশেষ ভাতা প্রদান করা হইবে।’ আমি বিশ্বাস করি এর ফলে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ বাড়বে ও মান উন্নত হবে। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চল নির্ধারণে হাওর এলাকা, পার্বত্য এলাকা, চরাঞ্চল ও দ্বীপাঞ্চলের কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। চাহিদার ভিত্তিতে শিক্ষকদের পর্যায়ক্রমে কমপক্ষে একবছর দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে চাকরি করার বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও শিক্ষার্থীদের দৈনিক সমাবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য অথবা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই দক্ষ প্রধান শিক্ষকের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। কাজেই শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী একদল উদ্যমী ও শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী ও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। যারা পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ/পদোন্নতি পাবেন। শিক্ষক ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক উল্লিখিত মতামতসমূহ যথাযথ ভাষার প্রয়োগ ও আইনগত দিকগুলো শিক্ষা বিষয়ে অভিজ্ঞ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিমার্জন ও সংশোধন করে সংযোজন করা যেতে পারে। যে কোনো বিষয়ে কেবল বিরোধিতা করার মধ্যে ভালো সমাধান নেই। মতামত ও পরামর্শ প্রদান এবং ভাব বিনিময় সমস্যার সমাধানের পথ দেখায়। কাজেই আইনের খসড়া প্রকাশ করে মতামত চাওয়ার বিষয়টি প্রশংসার দাবি রাখে এবং তা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হবে বলে আমার বিশ্বাস। ইতিবাচক বিতর্কও মানুষকে অনেক সমস্যার সমাধান দেয়। কাজেই শিক্ষকদের শাস্তি প্রদান বা শাস্তি শব্দটি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তার অবসান হবে অচিরেই। শাস্তি শব্দের পরিবর্তে প্রতিফল বা প্রতিবিধান শব্দ ব্যবহার করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। শিক্ষা আইন বিষয়ে আমি ইতিবাচক হতে চাই এই ভেবে যে, এটি আইন বিভাগের পর্যালোচনার মাধ্যমেই পাস হবে। আইনের ভাষার যথাযথ প্রয়োগ, সংশ্লিষ্টদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি তারা অবশ্যই বিবেচনা করবেন। এই আইন পাসের পর আমাদের কাজ হবে তা অনুসরণ করা, মেনে চলা, শ্রদ্ধাশীল হওয়া ও আইন অমান্য প্রতিবিধান কার্যকর করা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন বাস্তবায়নের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করবে । লেখক :সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ