বর্তমান সরকারের শিক্ষাখাতে কিছু উল্লেখযোগ্য অবদানের বিপরীতে হতাশাজনক চিত্র হইলো এই যে, শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলিতে চলিতেছে চরম অব্যবস্থাপনা। শিক্ষক নিয়োগ না দিয়া বিভিন্ন শ্রেণিতে নূতন নূতন বিষয় বাধ্যতামূলক করা হইতেছে। আবার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়া বছরের মাঝামাঝি সময়ে পরিবর্তন করা হইতেছে কারিকুলাম-সিলেবাস, পরিবর্তন আনা হইয়াছে পরীক্ষা পদ্ধতিতেও। পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষকের পদ সৃষ্টি না করিয়াই ‘চারু ও কারুকলা’ এবং ‘শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য’ বিষয় দুইটি বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে। দেশের ১৮ হাজার ৭০০ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮ হাজার ৩৩টি বিদ্যালয়েই নাই চারু ও কারুকলা বিষয়ের শিক্ষকের পদ। আর শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ের শিক্ষক পদ নাই চার হাজার ৫১৯টি বিদ্যালয়ে। শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকেরা চারু ও কারুকলার মতো বিশেষায়িত ও সৃজনশীল বিষয়ের পাঠদান করিতেছেন। অনেকক্ষেত্রে পার্টটাইম শিক্ষক দিয়া কোনোমতে কাজ সারা হইতেছে।
শুধু নূতন বিষয় চালু নয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ না দিয়া কারিকুলামেও পরিবর্তন আনা হইতেছে। জানুয়ারির শুরুতে সিলেবাস পরিবর্তন করিবার নিয়ম থাকিলেও জুন মাসে আসিয়া অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি বিষয়ের সিলেবাস পরিবর্তন করা হইয়াছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়া পরীক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনিয়াছে সরকার। সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ না দিয়াই চলতি শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণির গণিত বিষয়ে চালু হইয়াছে সৃজনশীল পদ্ধতি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এখনও সমাপ্ত হয় নাই। প্রশিক্ষণ শেষে চলতি বছরে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সুযোগ পাইবেন না বলিলেই চলে। ফলে নূতন বা পরিবর্তিত পদ্ধতিতে যেইসব শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা দিতে হইবে তাহাদের ফলবিপর্যয়ের সমূহ-সম্ভাবনা রহিয়াছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারের সমন্বয়হীনতার কারণেই এরূপ ঘটিতেছে, ইহা স্পষ্ট।
শিক্ষাখাতে, বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে, বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখ করিবার মতো। চার দশকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও তাহা বাস্তবায়ন, ২৩ কোটি পাঠ্যবই বিনামূল্যে প্রদান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে লিঙ্গসমতা অর্জন, নূতন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষার গুণগত মান বাড়াইতে সাড়ে তিন লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ, ৮০ হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ, ঝরিয়া পড়িবার হার ৪৮ ভাগ থেকে কমাইয়া ২১ ভাগে নামাইয়া আনাসহ শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় উন্নয়ন সাধিত হইয়াছে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের তত্পরতাও চোখে পড়িবার মতো। এইসব অর্জনের বিপরীতে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার এই সামপ্রতিক অব্যবস্থাপনা দুঃখজনক। একথা ঠিক, যেকোনো পদ্ধতি রদবদলের সময় কিছু গরমিল দেখা যাইবে, নূতন পদ্ধতির সঙ্গে অভিযোজিত হইতে শিক্ষক হইতে শিক্ষার্থী সকলেরই কিছুটা সময়ক্ষেপণ হইবে। কিন্তু জানুয়ারির পরিবর্তে জুনে সিলেবাস পরিবর্তনের মতো বিষয় মানিয়া লওয়া যায় না। তেমনি অগ্রহণযোগ্য বিষয় হইলো যেকাহাকে দিয়া চারুকলার মতো বিষয় পাঠদান। সিলেবাস সময়মতো পরিবর্তন এবং বিষয় চালুর পূর্বে শিক্ষক নিয়োগ, নূতন পদ্ধতির জন্য প্রশিক্ষণ — এইসবই জরুরি কতকগুলি পূর্বশর্ত যাহা ছাড়া শিক্ষার মান রক্ষা করা অসম্ভব। একটি জাতির জন্য শিক্ষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র, জাতির সার্বিক উন্নয়নের জন্য যাহার উন্নয়ন আবশ্যকীয়। তাই মাধ্যমিক পর্যায়ে সৃষ্ট অব্যবস্থাপনা অবসানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে পরিকল্পনার অভাব ও পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতি যেন এই উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করিতে না পারে এইজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকিতে হইবে।
