নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ১ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার থেকে সদ্যসমাপ্ত ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৭০৩ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। ’৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশে বাণিজ্য উদারীকরণ বাড়ানোর ফলে আমদানি ও রপ্তানি উভয়ই বেড়েছে, বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতিও। বিদায়ী অর্থবছরে মোট ৬০১৪২ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে এর মধ্যে ৩৩৫৭৬ মিলিয়ন ডলার আমদানি ও ২৬৫৬৬ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ছিলো (ইপিজেডসহ)।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রতিবেদন ২০১৩ অনুযায়ী, পরিবহন এবং যাতায়াত খরচ কমে যাওয়ার ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে গতি অনেক বেড়েছে। গত ৩০ বছরে মার্চেন্ডাইজিং এবং কমার্শিয়াল সেবা গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ হারে বেড়ে ১৮ ট্রিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। ১৯৮০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্বব্যাপী তাদের রপ্তানি ৩৪ শতাংশ থেকে ৪৭ শতাংশে উন্নীত করেছে। এবং আমদানির পরিমাণ ২৯ থেকে ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এশিয়া ভালো অবদান রেখেছে। এর জন্য আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আসছে সম্ভাবনাময় দিনগুলোতে বাংলাদেশের জন্য রয়েছে ব্যাপক সুযোগ। যদিও সম্প্রতি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এক প্রতিবেদনে চলতি বছর বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে উল্লেখ করেছে, যা পূর্বে সাড়ে ৪ শতাংশের আশা করা হয়েছিলো। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল ও বিনিয়োগ বাধা দূর করার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়লেও আঞ্চলিক যোগাযোগে দুর্বলতা, অশুল্ক বাধা, রপ্তানি বাজারের সংকীর্ণতা বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধিতে শুল্ক হ্রাস করার পরেও বিদায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ৩৫ হাজার ৬শ’ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা শুল্ক বাবদ আয় করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যে শুল্ক হ্রাসকরণ পদক্ষেপ শুল্ক আদায়ের হার কমার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ৪৪ টি ডিপ্লোমেটিক মিশন বিদেশে কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে গত ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে ১৮টি মিশন তাদের রপ্তানি লক্ষ্য অর্জন করেছে। কিন্তু ২৬টি মিশন তাদের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এগুলোর লক্ষ্যমাত্রা বাড়লে এ খাতে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান সুভাশিষ বসু ইত্তেফাককে জানান, ‘বিশ্ব বানিজ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রণ বিশেষ করে রফতানি বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। রফতানি সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে পণ্যের বহুমুখিকরণ করতে ইপিবি বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে এখন জাপান, রাশিয়াতে আমাদের দেশের পণ্য রফতানি বাড়ছে। এছাড়া চীন ও ভারতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রফতানি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রচলিত পণ্যগুলোর পাশাপাশি অপ্রচলিত পণ্য যেমন, হালকা প্রকৌশল পণ্য, গার্মেন্ট এক্সেসরিজ রফতানিও বাড়ছে। দেশের অভ্যন্তরের নানা প্রতিকূলতার পরও রফতানি বাড়ছে।
++অশুল্ক বাধা
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সাথে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য হয় ভারতের সাথে। কিছু সংবেদনশীল পণ্য বাদে বাংলাদেশকে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে ভারত। কিন্তু কিছু অশুল্ক বাধা ভারতের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি করছে। ভারত থেকে বাধ্যতামূলক পণ্যের মান সনদ গ্রহণ, স্থল বন্দরে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবসহ ব্যবসায়ীদের ভিসা জটিলতা এগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাছাড়া আমদানিতেও রয়েছে বিভিন্ন রকমের বাধা। বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকার বিভিন্ন পন্যে যেমন, পিঁয়াজ, চাল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে আমদানি কর হিসেবে বাংলাদেশেকে বিভিন্ন সময়ে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এই বাধা প্রত্যাহারের দাবিতে সরব হয়েছে বাংলাদেশ। চলতি মাসের মাঝামাঝি ভারতে সফরকালে এ বিষয়ে আলোচনা করেন বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ। এ বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, ‘দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করতে হলে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণ করতে হবে। ভারত বাংলাদেশকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক মুক্ত প্রবেশাধিকার দিলেও নানা ধরনের বাধা বিদ্যমান, যার কারণে বাংলাদেশি পণ্য বেশি পরিমাণে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না’।
উল্লেখ্য, ২০১২-১৩ আর্থিক বছরে বাংলাদেশ ও ভারত এ দুই দেশের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হলেও বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৫৬৩ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আঞ্চলিক বাণিজ্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা করেছেন, জানতে চাইলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো আঞ্চলিক যোগাযোগের দুর্বলতা। বাংলাদেশের পণ্যের মান সনদ দেয়া প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই’র সীমিত গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। তবে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতায় স্থল ও রেল যোগাযোগের উন্নয়ন পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রয়েছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বিএসটিআই’র উন্নয়নে ভারতীয় সহযোগিতায় প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে যা যা বাস্তবায়ন হলে অশুল্ক বাধা কিছুটা হলেও কাটবে। নৌ-বন্দরের মতো বাংলাদেশের স্থল বন্দরগুলোর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। এর পাশাপাশি শুল্ক মুক্ত সুবিধা সম্পন্ন দেশগুলোতে বাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশকে সচেষ্ট হবার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার মতো দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ সকল দেশগুলোতে উচ্চ শুল্ক বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে এখন আমাদের বাণিজ্যিক কূটনীতি বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
++আঞ্চলিক জোট ও বাংলাদেশ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের অংশগ্রহণে ১৯৬৭ সালে আশিয়ান জোট প্রতিষ্ঠার পর নব্বইয়ের দশকে এতে গতি আসে। জোটগত অর্থনৈতিক সামর্থ্যের বিচারে আশিয়ান এখন বিশ্বের শীর্ষ চারটি অর্থনৈতিক জোটের একটি। অন্যদিকে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের জোট বিমসটেক থেকে শুরুর ৬টি অগ্রাধিকার খাতের পরিবর্তে ১৩টি খাত চিহ্নিত করা ছাড়া বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। দেশগুলোর আন্তরিকতার অভাবে পর্যটন, কানেকটিভিটি প্রভৃতি খাতে প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো সুফল আসেনি। তবে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে বিমসটেকের স্থায়ী কার্যালয় ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হবে। সার্কের প্রায় একই অবস্থা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে গঠিত সার্ক মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল চুক্তি কার্যকর হয়েছে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে। আন্তঃসার্ক বাণিজ্য সার্ক দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের মাত্র ৬ শতাংশ। তাও বাংলদেশের ব্যাপক আমদানি এতে বড় অবদান রেখে যাচ্ছে।
অথচ আশিয়ানে ২৫ শতাংশ, ইইউতে ৬৭ শতাংশ, মারকোসোরে ৩২ শতাংশ এবং নাফটায় ৩৮ শতাংশ বাণিজ্য জোটভুক্ত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে করছে। শুরু থেকেই বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতির দেশ। এখনও রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি। আন্তর্জাতিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং তাদের বিভিন্ন কার্যালয় বাংলাদেশে স্থাপিত হবার ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে বলা যায়। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নের তাগিদ দিয়েছেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
++কাটছে মন্দা, বাড়ছে সম্ভাবনা
চলতি ২০১৩ সালের এপ্রিল-জুন দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোজোন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগালসহ ১৭টি দেশের গ্রুপ ইউরোজোনের অর্থনীতি দেড় বছর টানা সংকোচনের পর এই প্রথম প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বলা যায়, ২০০৮ সালের অর্থ-সংকটে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ইউরোজোনের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বড় বাজার ইউরোপের অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার সুখবর ইতিবাচক বলা যায়। প্রতিবছর ২১৫১৬ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক বিশ্বব্যাপী রফতানি করে বাংলাদেশ, যার উল্লেখযোগ্য রফতানি হয় ইউরোপের দেশগুলোতে। অন্যদিকে এসময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকোচনের পর জাপানের অর্থনীতিও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে। চীন ও ভারত উচ্চ প্রবৃদ্ধি হার বজায় রাখলেও গত দুই প্রান্তিক ধরে চীনের প্রবৃদ্ধি কিছুটা নিম্নমুখি। আর প্রায় এক বছর ধরে ভারতের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে। গত প্রান্তিক গত বছরের একই সময়ের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলো তাদের মূলধন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্থানান্তর করছে। ফলে বাংলাদেশের সুযোগ তৈরি। বিনিয়োগে উত্সাহিত করে এদেশে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। ড. মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, ‘রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) মাধ্যমে এ সুযোগ গ্রহণ করার চেয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা প্রয়োজন’।
++জিএসপি স্থগিত ও রফতানির ভাবমূর্তি
পোশাক ও চিংড়ি খাতে শ্রমের মান রক্ষা না করার কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গত ২৭ জুন বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে। আগামী ডিসেম্বরে ওই সিদ্ধান্ত আবার মূল্যায়ন করবে দেশটি। বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৮ ধরনের পণ্য এতোদিন কোনো ধরনের শুল্ক না দিয়েই মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতো। ঐ সব পণ্যের উত্পাদনকারী ও রপ্তানিকারকরা বলছেন, জিএসপি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত তাদের ব্যবসার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। ওই শুল্কের গড় হার ১৫ শতাংশের মতো। ফলে ওই দেশের বাজারে বাংলাদেশের সিরামিক, প্লাস্টিক, সিগারেটসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমেছে। এ ছাড়া বাড়তি শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে বাজার সমপ্রসারণ প্রক্রিয়া আরো কঠিন হয়ে গেল। এবিষয়ে এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইএবি) আব্দুস সালাম মুর্শেদী ইত্তেফাককে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপির আওতায় পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশের পোশাক খাত পেত না। যে কয়েকটি খাত এ সুবিধায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করত তাদের রপ্তানি আয়ও দেশের মোট রপ্তানি আয়ের তুলনায় খুব বেশি ছিল না। তবে জিএসপি স্থগিতের ফলে বাণিজ্যে খুব একটা প্রভাব না পড়লেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলা যায়’।
++সামপ্রতিক সমস্যা
এদিকে গত বছরের ২৪ নভেম্বর সাভারের তাজরীন ফ্যাশনস-এ অগ্নি দুর্ঘটনায় ১১২ জন নিহত এবং এ বছরের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসে ১১৩২ জন নিহত হবার ঘটনায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে বিশ্ববাসীকে। অর্ডার কমে আসা এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার ফলে ভবিষ্যতে রপ্তানির অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। খুব সাম্প্রতিক ভারতের মুদ্রার নজিরবিহীন দরপতনের ফলে বাংলাদেশ কিছুটা আমদানি সুবিধা পেলেও বহির্বিশ্বে তৈরি পোশাক রফতানিকারক হবার কারণে ভারতের সাথে প্রতিযোগিতা বাড়বে বলে আশংকা করেছেন ইএবি প্রেসিডেন্ট।
++রপ্তানি ও উন্নয়ন
বাংলাদেশের বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ৩ হাজার ৫৫২ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি হয় সেই বছর। কিন্তু ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। গত অর্থবছর মোট আমদানি ব্যয় কমে হয়েছে ৩ হাজার ৩৮৩ কোটি ডলার। আমদানি ব্যয় কমার পিছনে বড় অবদান রেখেছে চালসহ কৃষিপণ্য আমদানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়া। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী গত চার বছরে চাল, গম, ভুট্টাসহ খাদ্যশস্য উত্পাদন প্রায় এক কোটি টন বেড়ে ৩ কোটি ৭৫ লক্ষ টনে পৌঁছেছে। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত চাল উত্পাদিত হয়েছে। পাটের উত্পাদন ও রপ্তানি বেড়েছে। অন্যান্য ফসলের উত্পাদনও সন্তোষজনকভাবে বেড়েছে। এরফলে কৃষিপণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৫৭ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত সামগ্রী এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ বিষয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘বাণিজ্য ঘাটতি’র দেশ হওয়ার বাংলাদেশকে সামাগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। খাদ্য পণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতিও কমে আসবে ফলে অর্থনীতির গতি বাড়বে এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
++রপ্তানিতে শুভ সূচনা
বাণিজ্যের আকারে ছোট হলেও নতুন অর্থবছরে রপ্তানিতে শুভসূচনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথম দু’মাসে (জুলাই-আগস্ট) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডলারের দাম পড়তির দিকে থাকলেও গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে (জুলাই থেকে জুন সময়ে) রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ। রপ্তানিকারকরা বলছেন, গত অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা আগের অর্থবছরের চেয়ে বেশি ছিল, ডলারের দামও ছিল পড়তির দিকে¬। বিদায়ী অর্থবছর জুড়ে ডলারের গড় মূল্য ৮০ টাকার নিচে অবস্থান করছিলো। এ রকম পরিস্থিতিতে রপ্তানির পরিমাণ ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হলেও বড় ধরনের আঘাত আসেনি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, আলোচ্য সময়ে রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, ফার্মাসিটিক্যালস ও কেমিক্যাল প্রোডাক্ট, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কাগজ ও কাগজজাত পণ্য, কার্পেট, ফুটওয়্যার প্রভৃতি।
++ঝুঁকি
চলতি মাসের ৯ তারিখে বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন-২০১৩-১৪ প্রকাশ করা হয়। এ রিপোর্টে বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে আট ধাপ এগিয়ে ১১০তম অবস্থানে এসেছে। ফলে বাংলাদেশ তার হারানো স্থান ফিরে পেতে যাচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তবে ৫ বছর পর এবার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থায়ন সঙ্কট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীসহ উন্নয়ন সহযোগীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এবিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ভালো এবং অতীতের সমস্ত অর্জনকে তা ছাড়িয়ে গেছে। দেশের বর্তমান গতিশীল অর্থনীতিকে ধরে রাখার জন্য বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তার পরেও কৃষির উপর অধিক নির্ভরশীলতা, ব্যবসা করার জন্য অতিরিক্ত ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের সীমিত সুযোগসহ অবকাঠামোগত নিম্নমানের মতো সমস্যাগুলোকে সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
আকারের দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক ছোট বলা যায়। এর পরে দেশের বিশাল সস্তা শ্রমশক্তি এবং ভৌগোলিক দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় এ দেশের বাণিজ্যে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। সরকারের ভিশন-২০২১ অনুযায়ী ২০১২ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে যেতে হবে। আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
