রাজা-বাদশারা যুদ্ধ-বিগ্রহে মেতে থাকতেন ক্ষমতার লোভে। ক্ষমতার মোহ নাকি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। রাজারাও মানুষ— তাই ক্ষমতা পাওয়ার উগ্র-বাসনা থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। তাঁদের কেউ কেউ ক্ষমতা পেয়ে জনতার মঙ্গলের জন্য নানা পর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতেন। সবকিছুর ফাঁকেই জ্ঞানান্বেষণ করতেন, তাঁদের কাছে জ্ঞানীদের কদর ছিল। শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের উপদেশ-পরামর্শ-মন্ত্রণা তাঁরা মেনে চলতেন। অর্থাত্ ইতিহাসে প্রজাবত্সল রাজার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। শাসকের কাছে পদ লোভনীয় হবে— ব্যাপারটি দোষের নয়। শাসক ভালো হলে রাজ্যে শান্তি-শৃংখলা বজায় থাকে, জনতার জীবন মান থাকে সুখী-সমৃদ্ধ। বহু পুরানো প্রবাদে সেটিই বলা হয়েছে— রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়। সত্যি বলতে কি এখনো শাসকের দুর্মতির জন্যই প্রজা বা আমরা আমজনতা কষ্ট পেয়ে থাকি। বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শাসকের চরিত্র, আচরণ, মেধা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা উত্তম না হলে নানামাত্রার দুর্ভোগ পোহাতে হয় জনগণকে। আগে জনগণের সঙ্গে শাসকের বহুমাত্রিক সম্পর্ক ছিল না। সামন্ত আমলে কেউ ইচ্ছা করলে রাজার বলয়ের বাইরে নীরব জীবন যাপন করতে পারতেন। বর্তমান জীবনধারায় শাসনব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিক সম্পৃক্ততার পরিধি এত ব্যাপক যে, রাষ্ট্রের কার্যাবলির প্রভাব থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারেন না। ফলে রাষ্ট্র যদি মেধাহীনদের কবলে পড়ে তবে নাগরিকদের বিড়ম্বনার শেষ নেই।
মাত্র কয়েক দশক আগেও রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন শাসনব্যবস্থা যাতে জনগণ সুখ-স্বাচ্ছন্দে নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারে। রাজনীতিবিদগণ তখন রাজনীতিকে নিতেন ব্রত হিসেবে। বর্তমানে রাজনীতি করা মানে পুঁজিবিহীন অবস্থায় অতি দ্রুত অধিক সম্পদ ও প্রতিপত্তি লাভের কার্যকরী পথ ধরা। রাজনীতি করা হয় সম্পূর্ণ পেশাদারি মনোভাব নিয়ে। যে কারণে রাজনীতিবিদেরা অহর্নিশ ক্ষমতা লাভের চিন্তায় মশগুল থাকেন। যে কোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং তা আঁকড়ে ধরে রাখার প্রবৃত্তি বর্তমানে প্রকট। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বুদ্ধি-জ্ঞান, নীতি-নৈতিকতা, চক্ষুলজ্জা এসব কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করা হয় না। সর্বসাধারণের সরল মনোবৃত্তির মর্যাদা দেওয়া হয় না আদৌ। যেনতেনভাবে ছলেবলে কলাকৌশলে পদ ও ক্ষমতা পেতে ব্যগ্র সবাই। ক্ষমতার স্বাদ (তিক্তও বটে) নিতে অনেকেই বেপরোয়া। ফলে যারা ক্ষমতায় যায় তারাই ‘রাবণ’ রূপে জনতার সঙ্গে পরিহাস করে।
আজকাল কিছুসংখ্যক ছাড়া রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা অনৈতিক চাপ সৃষ্টি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপে পারঙ্গম। তাদের নির্লজ্জ অর্থলিপ্সার কথা সবাই জানেন। জ্বালাও-পোড়াও, ভেঙে ফেলা, চুরমার করা তো নৈমিত্তিক ব্যাপার। রাজনীতি করতে এখন পড়াশোনার প্রয়োজন হয় না। বহুসূত্রে জানা গিয়েছে সমাজসেবা, সমাজকল্যাণ, সমাজকর্ম, ইতিহাস-ঐতিহ্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সরকার পরিচালনা— এসব বিষয়ে সিংহভাগ রাজনীতিবিদের ন্যূনতম কোনো ধারণাই নেই। রাজনৈতিক কার্যাবলি হবে কল্যাণধর্মী। গবেষণা তো দূরের কথা, রাষ্ট্র ও মানব কল্যাণের জন্য জ্ঞানার্জন করতে রাজনীতিবিদেরা বই পড়েন না। রাজনীতি চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও প্রেসার গ্রুপের হাতে। প্রকৃত রাজনীতিবিদদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। কে কোন আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করছেন তারও খবর নেই। দৃষ্টি একদিকেই— বিনা শ্রম-মেধা-পুঁজি দিয়ে অর্থ লাভের কাতারে যেন দাঁড়ানো যায়। লাইসেন্স, পারমিট, চাঁদাবাজির সুযোগ পাওয়ার একমাত্র প্রত্যাশা নিয়ে তারা জীবন যৌবন বাজি রাখে। বিস্ময়করভাবে এসব জেনেশুনেই আমরা রাজনীতিবিদদের মসনদে আসীন করি। শান্তিপ্রিয়, মেধাসম্পন্নরা এখন আর রাজনীতিতে আসেন না। অনেকের কাছেই রাজনীতি করা বিচুটি পাতার মতো পরিত্যাজ্য। দুর্মুখো-দুর্বৃত্তদের তাই পোয়াবারো।
রাজনীতিতে যোগ্য মানুষ না এলে তা কলুষমুক্ত হবে না। লোভী-অযোগ্যদের সংখ্যা ১%ও হবে না। তাদের কাছে ৯৯% সর্বসাধারণ কোনোভাবেই জিম্মি হতে পারে না। রাজনীতিকে রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য কল্যাণধর্মী করতে হলে মেধা ও প্রজ্ঞাবানদের এগিয়ে আসতে হবে। জাতির জন্য ক্ষতিকর হবে যোগ্যদের পলায়নপর মনোবৃত্তি থাকলে।
নেত্রকোনা
