এবার সচিবালয় ঘেরাওয়ের হুমকি হেফাজতের

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫৩
আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ১৩ দফা দাবি না মানলে এবং প্রস্তাবিত কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠনের সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে না এলে সচিবালয় ঘেরাও করার হুমকি দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। গতকাল শনিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার জামিয়া বাবুনগর মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয়া হয়। সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক ২ হাজারের বেশি আলেম-ওলামা অংশ নেন। দুপুরের পর সম্মেলনের মূল পর্বে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী। এর আগে সকালে উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। সম্মেলনে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা কমিটি সম্প্রসারিত করে ২০১ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি এবং ২৫ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী উভয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা রুহী এবং ঢাকা মহানগর কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মুফতি ফয়জুল্লাহকে মজলিশে শুরা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। নবগঠিত নির্বাহী কমিটিতেও তাদের কাউকে রাখা হয়নি বলে হেফাজতের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়। ১৩ দফা দাবি ও কওমী মাদ্রাসা রক্ষায় সম্মেলন থেকে ৭ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচিগুলো হলো- কওমী মাদ্রাসার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ধ্বংস ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩’ বিল সংসদে পাস করার সরকারি চেষ্টা অবিলম্বে বন্ধের দাবিতে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় সারাদেশে একযোগে স্থানীয় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান, আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে যেসব জায়গায় হেফাজতে ইসলামের জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন-ওয়ার্ড কমিটি গঠিত হয়নি সেসব শাখায় কমিটি গঠন করে এর তালিকা কেন্দ্রে (সাংগঠনিক সম্পাদক বরাবরে) প্রেরণ, আল্লামা শফী ঘোষিত ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও রংপুর বিভাগে ওলামা-সুধী সমাবেশ ও পেশাজীবী সংলাপের আয়োজন, আগামী ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে দুই দিনব্যাপী ইসলামী মহাসম্মেলন আয়োজন, ১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে প্রত্যেক জেলায় শানে-রেসালত সম্মেলন, শহীদদের কবর জিয়ারত ও শহীদ পরিবারের সাথে সাক্ষাত্ করে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি কেন্দ্রে প্রেরণ, সরকার যদি হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত ১৩ দফাসহ উত্থাপিত অন্যান্য দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন না করে তাহলে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করা। কর্মসূচি ঘোষণা করেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা সলিম উল্লাহ। সম্মেলনে অবিলম্বে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর আল্লামা মুফতি ওয়াক্কাসসহ গ্রেফতারকৃত সকল নেতা-কর্মীর নিঃশর্ত মুক্তি ও দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী পরিচালিত সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, নায়েবে আমীর মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী, মাওলানা হাফেজ তাজুল ইসলাম, মাওলানা হাফেজ শামসুল আলম, মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবীব, মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা সাজেদুর রহমান, মাওলানা মোবারক উল্লাহ, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, মাওলানা আব্দুল বাসেত বরকতপুরী, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা প্রমুখ। হেফাজত আমীরের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আমীরের প্রেস সচিব মাওলানা মুনির আহমদ। জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে আল্লামা শফী বলেন, কুরআন-হাদিসের বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য শিক্ষাকেন্দ্র কওমী মাদ্রাসাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি ‘কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩ নামে জাতীয় সংসদে একটি বিল পাস করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। আমরা এই আইনটি পর্যালোচনা করে দেখেছি যে, তা বাস্তবায়িত হলে কওমী মাদ্রাসার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। এই আইন পাস করা থেকে সরকারকে বিরত রাখার জন্য কঠিন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, গত ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশে মধ্যরাত থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরীহ, জিকিররত ও ঘুমন্ত জনতার ওপর পৈশাচিক আক্রমণ শুরু করে। এই হামলায় বহুসংখ্যক আলেম-ওলামা শাহাদত বরণ করেন। হাজার হাজার আলেম আহত, পঙ্গু ও চিরদিনের জন্য অন্ধ হয়ে যান। বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব গণহত্যার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মাগুরাসহ বিভিন্ন জেলায় দায়িত্বশীল ও আলেম-ওলামাদের এখন গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। প্রখ্যাত আলেম, সাবেক মন্ত্রী মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবকে গ্রেফতার করে ১৫ দিন রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আমরা আশা করবো, সরকার গ্রেফতারকৃত আলিমদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবেন।