গত ১৭ সেপ্টেম্বর ছিল শিক্ষা দিবস। শিক্ষা সকলের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এখনও বহু নারীকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে এই মৌলিক অধিকারটি থেকে। শিক্ষাজীবন শেষ করতে এবং জ্ঞান অর্জনের বাসনাকে পূর্ণতা দিতে সব যুগেই নারীকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। এখনও চলছে এই সংগ্রাম। গ্রাম-গঞ্জে, বাড়িতে বাড়িতে, বহু নারীকে শিক্ষা জীবন অসমাপ্ত রেখেই ঝরে পড়তে হচ্ছে। নারীদের শিক্ষাজীবনের নিশ্চয়তা দেয়ার জন্য এখনও আমাদের সমাজ প্রস্তুত নয়। তবু বর্তমান যুগে সমাজের সব বাধা অতিক্রম করে, উচ্চ শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন এমন নারীর সংখ্যাও কম নয়। এমনই কয়েকজন নারীর জীবন সংগ্রামের চিত্র এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞের মতামত নিচে এই প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন— সামিহা সুলতানা অনন্যা
শিক্ষাক্ষেত্রে জীবনযুদ্ধ
নিশীতা এখন প্রাইভেট ব্যাংকে অ্যাসিসটেন্ট রিলেশনশিপ অফিসার হিসেবে চাকরি করছে। তার কাছে তার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই। নিশীতা বলেন, এখনও মনে আছে এইচএসসি পরীক্ষায় আমি প্রথম বিভাগ নিয়ে উত্তীর্ণ হই। পরীক্ষায় ফলাফল ভাল করার পরও সেই সময় আমি কোন আনন্দ করতে পারিনি। আমার স্বপ্ন ছিল, আমি কোন ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অনার্স-মাস্টার্স করব। কিন্তু বাসায় তখন থেকেই আমাকে বিয়ে দেয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। এই বিষয়ে আমার ইচ্ছা বা মতামত দেয়ার কোন সুযোগ ছিল না। বাবার বন্ধুর ছেলের সাথেই বিয়ের কথা হচ্ছিল। সে সময় মাঝে মাঝে মনে হত, বাড়ি ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যাই। কিন্তু একা একটা মেয়ের থাকার কোন জায়গা নেই। শেষ পর্যন্ত পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী আমার বিয়ে হয়ে গেল। নতুন সংসারে নতুন এক জীবন শুরু হল। তবু আমি হাল ছেড়ে দেইনি।
আমার স্বামী ব্যবসা করেন। তাদের পারিবারিক ব্যবসা। আমার পড়ার আগ্রহকে আমি তখনও ধরে রেখেছিলাম নিজের মনের এক কোণে। আমার মনের অনুভূতি আমার স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির সবাইকে উপলব্ধি করাতে সক্ষম হই। মাঝে এক বছর নষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত বদরুন্নেসা কলেজে অনার্সে ভর্তি হই। শ্বশুরবাড়িতে থেকেই আমি আমার পড়াশুনা চালিয়ে যাই। অনার্স শেষে আমি ইডেন কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করি। এখন আমার চাকরি কন্ট্রাক্টচুয়াল হলেও তা আমাকে সমাজে দিয়েছে এক আলাদা পরিচয়। আমি আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সম্ভব হয়েছি, পাশাপাশি আমার শ্বশুরবাড়ির সবাইকেও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে পেরেছি। আমার স্বামী কিছু সময় নিলেও শেষ পর্যন্ত যে আমাকে উপলব্ধি করতে পেরেছে।
উচ্চ শিক্ষায় বাধা
মৌলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার কাছে একজন নারী হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা জানতে চাই। মৌলি বলেন, আমাদের বাড়ি চিটাগাং। আমি হলে থেকেই আমার পড়াশোনা সম্পন্ন করেছি। আমার অনার্স বোটানীতে এবং মাস্টার্স পরীক্ষাও শেষ। তবে এখনও ফল প্রকাশ হয়নি। আমার ইচ্ছা ছিল, বিদেশে মাস্টার্স করব। কিন্তু বাসার কেউই আমার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়নি। আমার অনার্সের রেজাল্ট অনেক ভাল। শিক্ষকরা সব সময়ই আমাকে উচ্চ শিক্ষার ব্যাপারে উত্সাহ দিয়ে এসেছেন। তবে বাসা থেকে এক কথা— একা একা তুমি কীভাবে বিদেশে যাবা? শেষ পর্যন্ত বাবাকে রাজি করাতে পারলাম যে, আমি দেশের বাইরে পিএইচডি করব। কিন্তু বাবার শর্ত হলো, বিয়ে করে জামাইয়ের সাথে যেতে হবে। একা মেয়েকে ছাড়া যাবে না। আমি এখন জিআরই পড়ব, না টোফেল পড়ব নাকি বিয়ের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে তৈরী করব? বিয়েতো দুইদিনের কোন ঘটনা না যে, কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেব। কিন্তু এখন আমি উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে চাইলে বিয়ে করতে বাধ্য। তাই বহু ছাত্রী, যাদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভবিষ্যত্ খুব উজ্জ্বল, তাদের জীবন থেকে হারাতে হচ্ছে বহু সুযোগ শুধুমাত্র নিরাপত্তার চিন্তা থেকে। কখনো এক স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে সম্পূর্ণ জীবনকেই বলি দিতে হচ্ছে। বিবাহিত জীবনে মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তবুও ইচ্ছা থাকলে সব নারীর পক্ষেই তার পড়ার ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব। জ্ঞানের পথে সংসার বাধা হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞ মতামত
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় নারীদের অবস্থান, ঝরে পড়ার হার ও শিক্ষা জীবনের স্বপ্ন পূরণ করতে নারীদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কি হতে পারে, সে সম্পর্কে জানতে কথা হচ্ছিল গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর সাথে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও বাল্যবিবাহের কারণে কলেজে নারীদের অংশগ্রহণের হার অনেক কম। সামাজিক মন-মানসিকতার পরিবর্তন ও নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রেরণাই বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে। উচ্চ শিক্ষায় অর্থসচ্ছল পরিবারের মেয়েদেরই যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে সেখানে দেখা যায় যে, স্বামীর তত্ত্বাবধানে স্ত্রীদের যেতে হয়। কখনও সুযোগ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে পারে, নয়তো স্বামীর সেবায় নিয়োজিত হতে হয়। স্বামী, সন্তান রেখে কোন স্ত্রী বিদেশে মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে গিয়েছে এমন ঘটনা বিরল। নারীকে পড়ানোর জন্য বিদেশে পাঠানো, তাকে স্বাবলম্বী করবার স্বার্থে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করানো সবার কর্তব্য। এমন একটি মানসিকতা সমাজে গড়ে তুলতে হবে। নারীদের উচ্চশিক্ষার হার বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারিভাবে তাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা বা বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা তাদের জীবনযুদ্ধে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। তবুও কোন বাধাই অনতিক্রম্য নয়। এই কথাটি নারীদের মনে রাখতে হবে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নিজের স্বপ্ন ও ইচ্ছা পূরণের যুদ্ধে নারীদের হাল ছেড়ে না দিয়ে সর্বদা এগিয়ে যেতে হবে। সদিচ্ছা থাকলে বিয়ে, পারিবারিক অসচ্ছলতা, সামাজিক বাধা- কোন বাধাই একজন নারীকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।
