যুগটা তথ্যপ্রযুক্তির। গেল দুই দশক ধরেই অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে এই খাতে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সেরা প্রযুক্তিটা আমাদের চাই। ফোরকান বিন কাশেম যখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে বের হন, বিদেশ তাকে একদমই টানেনি। সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও চাইছিলেন দেশেই কিছু করবেন। সমমনা কয়েকজনের জমানো টাকায় শুরু হলো স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম। আজ তাদের হাতে গড়া স্পেকট্রাম দেশের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি স্পেকট্রামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফোরকান বিন কাশেম পুরো সেক্টরটিকে এগিয়ে নিতেও করে গেছেন অক্লান্ত পরিশ্রম। তার সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি, ছয়জন প্রকৌশলী বন্ধু মিলে শুরু হলো স্পেকট্রাম। প্রথমবার তাদেরকে তত্কালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম ঠিক করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর সেই কাজটা মাত্র সপ্তাহ দুয়েকেই করে ফেলেন ফোরকানরা। দেশেও যে কাজের এ ধরনের সুযোগ হতে পারে, দেশীয় প্রকৌশলীরা এগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। এরপর স্পেকট্রামের হাতে সেই রকম কাজের সুযোগ এল না বেশ কয়েকদিন। কিন্তু টিকে তো থাকা চাই। সেই সময়ে কম্পিউটার জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। তারা সেটার যন্ত্রপাতি সংযোজনের কাজ শুরু করলেন। ফোরকান বিন কাশেম জানালেন, সেই আমলে বসানো কিছু কম্পিউটার এখনও ঠিকঠাক রয়েছে কোথাও কোথাও।
ফোরকান বিন কাশেমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটা—কীভাবে নিজেকে এগিয়ে নিলেন তিনি। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন নেতৃত্বমূলক কাজে অংশ নিতেন। খেলাধুলার আয়োজন থেকে শুরু করে কলেজ জীবনে রোটারি ক্লাব করার মতো সহ-পাঠ্যক্রমিক কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। এমনকি বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনীতির সাথেও জড়িয়ে পড়েন। এই যে সংগ্রামী মনোভাব, এই যে স্পৃহা কোনো কিছুর পেছনে লেগে থাকার। এটাই তাকে আজকে এই অবস্থানে এনেছে। আর যখন ব্যবসায়িক দিকে আগ্রহ তৈরি হয়, সেটার সম্পর্কিত অনেক কিছু নিয়ে জানতে হয়েছে তাকে। শুরুর সময়, বিধায় কাজের সুযোগটা তাদের তৈরি করে সেখানে কাজ করতে হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) কাজ শুরুর পর কিছুটা সংগঠিত হতে থাকে আইটি ভিত্তিক সংস্থাগুলো। আর বছর কয়েক এটার নেতৃত্বেও ছিলেন ফোরকান বিন কাশেম।
বেসিসে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন আইটিতে আশানুরূপ এগোতে পারছি না, তার কিছু ব্যাখ্যা দিলেন তিনি। বাংলাদেশের সম্ভাবনা নির্ভর করছে প্রজন্ম ও পরিবেশের ওপর, যা আইটি খাতকে টিকিয়ে রাখবে ও এর প্রসার ঘটাবে। কথা হচ্ছে এক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও জনগণের উন্নয়নের জন্য আইটি কী ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে যথাযথ চর্চা প্রয়োজন। এ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অনেক কিছুই আমরা তৈরি করতে পারিনি। এ খাতকে শুধু প্রযুক্তি হিসেবে দেখার বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা ও শাসন সংক্রান্ত বিষয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আইটি নীতিমালা প্রণয়নে বিভিন্ন শিল্প বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিতে যে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে সে লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা বাজেট পর্যালোচনায় বিবেচনায় আনতে হবে।
ফোরকান বিন কাশেম জোর দিলে উদ্যোক্তা সৃষ্টির উপরে। তিনি মনে করেন কাজ করার মতো অনেকেই আছে, কিন্তু সেটা পরিচালনা করার মতো মানুষের বড্ড অভাব কখনও কখনও। নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলিটি অনেকে বলেন আপনাআপনি হয়, আসলে দক্ষ প্রশিক্ষন আর অভিজ্ঞদের সংস্পর্শ পেলে সহজেই আমরা অনেক উদ্যোক্তার হাত দিয়ে পেতে পারি নতুন কিছু। আর তাদের সফলতার কথাগুলো যত আমাদের সামনে আসবে, তরুণরা তত আগ্রহী হবে নতুন কিছু করার বিষয়ে।
ফোরকান বলেন, ‘প্রগতির অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে প্রযুক্তির উন্নয়ন। বিশেষ করে উন্নয়নকামী যেকোনো দেশের জন্য তা অবশ্য করণীয়। সব আধুনিক সরকার তাদের কৌশলে এ বিষয়টিকে সবার আগে রাখে। একটি দেশ প্রযুক্তিগতভাবে কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে সে দেশের অর্থনীতির উন্নতি কিংবা অবনতি। অর্থনীতি ও উত্পাদনশীলতার উন্নয়ন চাইলে দেশে উত্পাদন বাড়াতে হবে। বিভিন্ন দেশের কৌশল হচ্ছে, কোনো সম্ভাবনাকেই না হারানো। সরকারের উচিত উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করা এবং উদ্ভাবনামূলক ধারণাকে বাণিজ্যিক মূল্যে রূপায়ণের ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। শিল্প-কারখানাকে খোলাখুলিভাবে প্রবৃদ্ধির দৌড়ে নামতে হবে সম্ভাব্য সবধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য। আমাদের সবাইকে স্বীকার করতে হবে, আমরা কাজ করি একটি জটিল পরিবেশে এবং আন্তর্জাতিক বিপণন খুবই ব্যয়বহুল। ফলে বাংলাদেশকে আইটি মানচিত্রে স্থান করে দিতে বাংলাদেশের শিল্পের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের উচিত সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু জোগাড় করা। এর জন্য যা খরচ হবে, অর্থনৈতিক অর্জন তার চেয়ে আরও অনেক বেশি হবে।
ফিরে আসি স্পেকট্রামের কথায়, শুরুর দিকটাতে কিছু কাঠখড় পুড়ালেও পরে আর পিছে তাকাতে হয়নি। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে তাদের সখ্যতা হয়েছে, হয়েছে পার্টনারশিপও। এখন একশরও বেশি জনবল তাদের। তাদের সিংহভাগই প্রকৌশলী। আইটির ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মতো যাবতীয় বিষয়ের সমাধান করে যাচ্ছেন তারা। আর এটা সফলতার সাথে করে আসছেন অনেকদিন। ফোরকান মনে করেন, কোনো ব্যবসায় দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের কথা চিন্তা করতে গেলে অবশ্যই জোর দিতে হবে মান ও সেবার উপর, তা না হলে শুধুই লাভের কথা চিন্তা করে চললে কখনোই কিছু ভালো হয় না। লাভও যেমন করা লাগবে, সেটার প্রয়োগ হতে হবে, সেটার সঠিক ব্যবস্থাপনাও করতে হবে। সীমাবদ্ধতার পেছনে না দৌড়ে, খুঁজতে হবে সম্ভাবনার সব পথ, সেখানেই রয়েছে নতুন কোনো সমাধান। আর যারা এটা করতে পারবেন, তারাই এই দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন।
ফোরকানের ছেলেবেলা কেটেছে ঢাকাতেই। মতিঝিল সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। এরপর নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সুযোগ পান বুয়েটে। বাবা ছিলেন আইনজ্ঞ আর মা স্কুল শিক্ষক। ফোরকানের স্ত্রী কাজী তাসমিন আরা আজমেরী সরকারি কর্মকর্তা। দুই সন্তান নুবাইরা ফোরকান আর নাফিস ফোরকানকে নিয়েই কাটে তার অবসর সময়। ইতিহাসের বইয়েও ডুবে যান মাঝে। আমাদের দেশের তথ্যপ্রযুক্তির খাতে তিনি যে স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা বলেন, সেটা সম্ভব, শুধু দরকার সবার সহযোগিতা।
ফোরকান বিন কাশেম
ডাকনাম :ফোরকান
জন্মতারিখ ও স্থান :৪ নভেম্বর, ঢাকা
মায়ের নাম :সুরাইয়া রহমান
বাবার নাম :আবুল কাসেম ভুইয়া
প্রথম স্কুল :মতিঝিল সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :পরিবারের সবাই, কাছের বন্ধুরা
প্রিয় উক্তি :‘... এসব ত্রিবেণীর ত্রিধারার দুর্বার স্রোতে যারা চলে গেলেন, তারা বলেন, এগিয়ে চল, এগিয়ে চল...’
প্রিয় পোশাক :শার্ট, প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :ইতিহাস পড়ে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের প্রত্যাশার কাছাকাছি পৌঁছানো।
