প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। পড়াশোনার সময় থেকেই গণমাধ্যম আর মানুষের সাথে সম্পৃক্ততা তার। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় ফিচার লেখার মাধ্যমে এই জগতের সাথে সখ্যতা। তৃণমূলে কাজ করার তাগিদ নিজের ভেতর থেকেই অনুভব করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সরাসরি অংশ গ্রহণের পাশাপাশি কাজ করেছেন শিশু অধিকার ও লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে। তিনি আরিফা শারমিন, ইউনিসেফ বাংলাদেশের কমিউনিকেশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার পথচলার গল্প শুনিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
কাজের জগতে বরাবরই খুব দায়িত্বশীল ছিলেন তিনি। অল্প বয়সেই পাড়ি দিয়েছেন অনেকটা পথ। অনেকেই তার তারুণ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বলতেন, তাকে দিয়েও কাজটা সম্ভব? রীতিমতো স্রোতের বিপরীতে টিকে থাকার মতো দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাজ করে প্রমাণ করছেন, নিষ্ঠা আর প্রজ্ঞা নিয়ে করলে যেকোনো কাজই করা সম্ভব। আরিফা শারমিন জীবনের প্রতিটা বাঁকেই সম্মুখীন হয়েছেন বিচিত্র অভিজ্ঞতার, মুখোমুখি হতে হয়েছে রূঢ় বাস্তবতার। আগুনমুখো নদীর মোহনায় গিয়ে দুর্গম এলাকার মানুষের দুঃখের কথা তুলে এনেছেন যেমন, ঠিক তেমনি সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে বসিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সামনে। আর দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে পেশাদারিত্বের বাইরেও শুধুই মানবিক তার তাগিদেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন অনেক প্রকল্পে।
আরিফা শারমিন স্নাতোকোত্তর শেষ করার আগেই সুযোগ পেয়ে যান উন্নয়ন সংস্থা উষা’তে। প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কাজ করার সময় তিনি সরাসরি তৃণমূল পর্যায়ে যান, এদেশীয় বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেন। প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে পরবর্তী কাজের সুযোগ আসে তার। কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েট হিসেবে দায়িত্বের পাশাপাশি দেশসেরা প্রামান্য চিত্রনির্মাতাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির উপর দক্ষতা আসে তার। সেই সুবাদে নিজেও অডিও-ভিজুয়ালের কিছু কাজ শিখে যান, তৈরি করেন ডকুমেন্টারি। সেইসময়ই প্রশিকা তাকে উপকূলীয় এলাকায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্টস ব্যাংকের একটি প্রকল্পে অডিও-ভিজুয়াল কাজের দায়িত্ব দেয়। এখানে তিনি পেয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় শিক্ষক নূরউদ্দিন স্যারকে। তার সাথে কাজের সুবাদে অনেককিছু শেখাও হয় তার। বনবিভাগের সাথে এটাই তার প্রথম কাজ ছিল, প্রথমে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন এলেও কাজের পর সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়। সেই বনবিভাগই তাকে দায়িত্ব দেয় একটা বনকর্মীদের জনযোগাযোগ বিষয়ক হ্যান্ডবুক তৈরি করার। প্রশিকার অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পন্ন করার পর সুইজারল্যান্ড অ্যাম্বেসিতে ম্যানেজার (প্রমোশন) হিসেবে কাজের সুযোগ পান আরিফা। আর বরাবরই যেহেতু নতুন কিছুতে আগ্রহ ছিল, সেই সুযোগটা কাজে লাগান তিনি। অন্যরকম একটা পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি তারপর যোগ দেন কানাডিয়ান সংস্থা সিডা’র সহায়তায় প্লেজ প্রকল্পে। কমিউনিকেশন এক্সপার্ট হিসেবে সেখানে কাজ করেন তিনি বেশ কয়েক বছর। আর কাজে যোগদানের গল্পটা তেমন সুখকর ছিল না এখানে, তিন ঘণ্টার একটা ইন্টারভিউ সেশনে নানা বিষয়ে তার পারদর্শিতাটা যাচাই করে নেন নির্বাচকরা। প্রাথমিক ধাপ উতরে এরপর এল চূড়ান্ত বাছাইয়ের পালা। সেখানে গিয়ে দেখেন আরও এসেছেন অভিজ্ঞ সব মানুষেরা। শেষটায় চাকরিটা তারই ভাগ্যে জুটে, লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। এখানে কাজ করতে এসে তিনি সান্নিধ্য পান ফারজানা নাইমের, যিনি বন্ধুর মতো পাশে ছিলেন।
বেশ স্বাধীনতা নিয়েই কাজ করেছেন সেখানে। এভাবেই একটা সময় ইউনিসেফে কাজের সুযোগ আসে। ২০০৬ সালের দিকে কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট হিসেবে যোগ দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশে। এরপর ২০১১ সাল থেকে কমিউনিকেশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পান। এখানে ডোনারদের সাথে সম্পর্ক রক্ষার পাশাপাশি শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। গণমাধ্যমে শিশুদের সংবাদ তুলে ধরার জন্যও তার প্রয়াস আশাব্যঞ্জক। দেশের সরকারি-বেসরকারি একাধিক চ্যানেলে এখন শিশুদের সংবাদ প্রচারিত হয় নিয়ম করে, কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবেদকের দায়িত্বটাও শিশুদের উপর। আরিফা শারমিন সারাদিন ব্যস্ত সময় কাটান শিশুদের সাথে, শিশুদের নিয়ে সম্পৃক্ত কাজের সাথে। তবুও কাজের শেষে অন্যের মুখে হাসি দেখলে তৃপ্তিটা পূর্ণ হয়ে যায়। এখন যারা কাজ করতে আসবে এ দিকগুলোতে, তাদেরকেও সচেতন হতে হবে নিজদের দায়িত্ববোধ নিয়ে।
আরিফা শারমিনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকাতেই। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। চার ভাইবোনের মাঝে তিনি সবার বড়, অনেক দায়িত্ব ছিল তার উপর। আর স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীনই বিয়ের পিঁড়িতে বসেও এতটা দূর আসার পেছনে মায়ের ভূমিকা অনেক। স্বামী হারুন অর রশীদের অবদানও কম নয়। এখন মেয়ে সেঁজুতি ছেলে সৃজনকে নিয়েই তার আপনজগত্। এখানেই যেন অন্য একটা পৃথিবীর খোঁজ পাওয়া শত ব্যস্ততার মাঝেও।
আরিফা সালাম শারমিন
ডাকনাম :শারমিন
জন্মতারিখ ও স্থান :২৪ জুন, বরিশাল
মায়ের নাম :নুরুন্নেসা বেগম
বাবার নাম :শরীফ মোহাম্মদ এসালাম
প্রথম স্কুল :বিসিএসআইআর প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :সেঁজুতি ও সৃজন—আমার দুই সন্তান
প্রিয় উক্তি :‘চারিদিকে দেখ চাহে হূদয় প্রসারি, ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানে।’
প্রিয় পোশাক :শাড়ি
অবসর কাটে যেভাবে :গানশুনে, বইপড়ে, মুভি দেখে
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের কাজটা দায়িত্ব নিয়ে সততার সাথে করা।
