জাতীয় অর্থনীতিতে লক্ষ্মীপুর জেলার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। প্রশাসনিক-ব্যবস্থার দিক থেকে এটি পুরোনো জেলা না হলেও এই এলাকা এক প্রাচীন জনপদ। ভুলুয়া পরগনার অন্তর্গত এই জনপদের ইতিহাস দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রচুর নারকেল, সুপারি আর ধান উত্পাদনের পাশাপাশি ব্যাপক লবণ উত্পাদনের কারণে নবাব মুর্শিদ কুলি খান ও আলীবর্দী খাঁর আমলে এখানে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী গড়ে তোলে লবণ ব্যবসাকেন্দ্র। তাদের ছিল কুঠি ও বিশাল বিশাল লবনের আড়ত এবং এখান থেকে বিপুল পরিমাণ লবণ রপ্তানি হতো দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে। মেঘনা নদী ও রহমত খালকে কেন্দ্র করে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে লক্ষ্মীপুর গড়ে ওঠে মুঘল আমলে। রহমত খালটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, এটি অত্যন্ত গভীর ও যে কোনো ঋতুতে কিংবা শুকনো মৌসুমেও বড় বড় নৌযান চলাচল করতে পারতো এ খাল দিয়ে। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও অক্ষুণ্ন ছিল খালের এই বৈশিষ্ট্য। মেঘনা, ডাকাতিয়া ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় ও খালের অনন্য বৈশিষ্টের কারণে একদিকে চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ অন্যদিকে হাজিগঞ্জ-চিতোষী, লাকসাম, কুমিল্লা, চৌমুহনী, ফেনী ও দ্বীপসমূহের মধ্যে চলাচলকারি পণ্যবাহী বড় বড় নৌযানগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল লক্ষ্মীপুরে। এ খালকে বাংলার ‘সুয়েজ’ খালও বলা হতো। শহর কসবায় গড়ে ওঠা নৌ-বন্দরটি নদী ভাঙ্গনে একসময় বিলীন হয়ে যায়। যা আর পরে গড়ে ওঠেনি। তেমনি আরেকটি বৃহত্ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল জেলার রামগঞ্জের সোনাপুরে। উত্পাদিত নানা ফসল আর বন্দরকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের কর্মচঞ্চল মানুষেরা অর্থনীতিতে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছিল সেই প্রাচীন যুগ থেকেই। তবে নদীর ভাঙ্গন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখানকার অনেক মানুষকে ভূমিহীন, নিঃস্ব-দরিদ্র করেছে কিন্তু হতাশ করতে পারেনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভূমি ও ফসল হারানো মানুষগুলো তাদের কর্মস্পৃহা, উদ্যম ও সাহসের ওপর ভর করে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে একরাশ আশা ও নতুন স্বপ্ন নিয়ে। নদীর ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় জেগে ওঠা বিশাল ভূখন্ড নদী ফিরিয়ে দিলেও তার মালিকানা পায়নি প্রকৃত ভূমিহারা, দরিদ্র কৃষক পরিবারেরা। জেগে ওঠা ভূমির মালিক সেজেছে জোতদারেরা।যদিও ধনসম্পদ ও সৌভাগ্যের পুরী লক্ষ্মীপুরকে প্রশাসনিক জেলা হিসেবে একটি নতুন জেলাই বলা চলে। ছিমছাম শহর লক্ষ্মীপুর কেবল আক্ষরিক অর্থেই ধনসম্পদ ও সৌভাগ্যের শহর নয় বাস্তবেও তার অবদান অনিস্বীকার্য। গত ১৫-২০ বছর থেকে জেলার রায়পুর ও কমলনগরে প্রতিবছর চার-পাঁচশ কোটি টাকার সয়াবিন উত্পাদিত হয়ে আসছে। যা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এছাড়া রামগতি ও কমলনগরে উত্পাদিত হয় শত কোটি টাকার চীনা বাদাম। জেলার উপজেলাগুলোতে বিস্তীর্ণ ঘনসারির সুপারি-নারকেল বাগান; ধান, পাট ও বিভিন্ন রকমের ডাল-ফসলের ক্ষেত এবং এর প্রচুর ফলন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যলীলার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে সহায়তা করছে। প্রকৃতিই হয়তো কষ্টসহিষ্ণু এই অঞ্চলের মানুষকে উদ্যমশীল ও সাহসী করে গড়ে তুলেছে। কেবল জীবন-জীবিকার তাগিদ থেকে নয়, তাদের মধ্যে শিক্ষা, জ্ঞান-চর্চা ও উন্নত জীবন লাভের তাগিদবোধও সমভাবে কাজ করার কারণে এ অঞ্চলের মানুষ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষা-সাংস্কৃতি, চাকুরি, শিল্প-সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষতার এক অনন্য স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এই জেলার লোকেরা জাতীয় অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে যেমন অবদান রাখছে তেমনি জেলার বিপুল সংখ্যক প্রবাসীরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে। এই জেলার চার সহস্রাধিক কুটির শিল্প ও সহস্রাধিক ক্ষুদ্র শিল্পের পাশাপাশি এখানে অবকাঠামোগত সুযোগ- সুবিধা রয়েছে বড় বড় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার। রামগতিতে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি গার্মেন্টস্ শিল্প ও রায়পুরের রাখালিয়ায় আন্তর্জাতিক মানের পাদুকা শিল্পের উত্পাদিত পণ্য বেশ সুনামের সঙ্গেই বিদেশের বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। লক্ষ্মীপুরে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে ওঠলে তা এখানকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে সক্ষম হবে। রামগতির পাশ দিয়ে মেঘনা পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। রামগতির সড়কপথটি এখন বেশ প্রশস্ত ও মসৃণ। নৌপথেও রয়েছে যাতায়াতের ভাল সুবিধা। সরকারি উদ্যোগে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাবে তেমনি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠবে এই অঞ্চল। সেখানে সুযোগ রয়েছে পার্ক ও ব্যক্তি উদ্যোগে আধুনিক রিসোর্ট গড়ে ওঠার। পর্যটকেরা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নৈসর্গিক দৃশ্য অবলোকন, রূপালি ইলিশ ধরার দৃশ্য এবং নৌকা ও লঞ্চ ভ্রমণ উপভোগ করতে পারবেন। খুবই সুস্বাদু মহিষের দুধের দইয়ের স্বাদ পর্যটকেরা মনে রাখবে অনেকদিন। দই আর নদী থেকে সদ্য তোলা মেঘনার ভাজা ইলিশের স্বাদ নিতে বার বার আসবেন পর্যটকেরা। দেশের বড় পর্যটনশহর এখন মানুষের প্রচন্ড চাপ আর কানভারী করা কোলাহল ও যানযটের নাকাল অবস্থার কারণে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকেরা খুঁজছে নতুন নতুন স্থান, যেখানে নিরিবিলি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ, নির্মল বিনোদন কিংবা চিত্তের প্রশান্তি পাওয়া যাবে। সেরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর চিত্তসুখের এই ধরনের একটি পর্যটন কেন্দ্র পেলে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকের অভাব হবে না, এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।
মত্স্য সম্পদের সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার জন্য রামগতি ও লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরীর হাটে অত্যাধুনিক ফিসারিঘাট গড়ে ওঠলে তার সুফল পাবে গোটা দেশ। রামগতিতে একটি পর্যটন কেন্দ্র ও গভীর সমুদ্র বন্দর, লক্ষ্মীপুরে একটি মেডিকেল কলেজ, রামগঞ্জে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও রায়পুরে সয়াবিনকেন্দ্রিক শিল্প ও পলিটেকনিক কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি পূরণে সরকার কার্যকর ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
[কলাম লেখক, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ।]
