একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। যে কোন দিন তার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। গতকাল রবিবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। একই সাথে বিশেষ বিবেচনায় দেয়া আলীমের জামিন বাতিল করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইবুন্যাল। আলীমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৭টি অভিযোগ এনেছিলো রাষ্ট্রপক্ষ। দুই ট্রাইব্যুনালে এ নিয়ে দুইটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রইলো। এর আগে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে দুইটি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে চারটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত রুকন পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আর জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ৯০ বছর ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। তবে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
গতকাল সকালে পাল্টা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। সমাপনী বক্তব্যে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ড. তুরিন আফরোজ বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে এমন কোন অপরাধ নেই যার সাথে আলীমের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় না। জয়পুরহাটে তার নেতৃত্বেই সব হত্যাযজ্ঞ হয়েছে। তাই ন্যায় বিচারের স্বার্থে আসামির সর্বোচ্চ সাজা হওয়া উচিত।
তবে আসামি পক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আলীমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ যেসব অভিযোগ এনেছে সেসবের আইনগত ভিত্তি খুবই সামান্য। তার বিরুদ্ধে আনা ১৭টি অভিযোগের একটিও রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। এসব অভিযোগ থেকে তিনি অব্যাহতি পাবেন বলে আমরা আশা করি। এর আগে আলীমের সর্বোচ্চ শাস্তির আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ চার দিন ও আলীমের মুক্তি চেয়ে আসামিপক্ষ পাঁচ দিন যুক্তি উপস্থাপন করে।
এদিকে, আলীমের জামিন বাতিল করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত তার জামিন বাতিলের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আদেশে ট্রাইবুন্যাল বলেন, বর্তমানে রায় ঘোষণার আগে থেকেই সহিংসতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আলীমের মামলায় এমন পরিবেশ তৈরি হলে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা নিয়ে সংশয় তৈরি হবে। তাই জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হলো। একই সঙ্গে তাকে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সুবিধাসহ তার স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনা করে অন্যান্য সুবিধা প্রদানের জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। বৃহস্পতিবার জামিন বাতিল চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ জুন আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে সাত ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৭টি অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ২৭ মার্চ জয়পুরহাটের বাড়ি থেকে আলীমকে গ্রেফতার করা হয়। ৩১ মার্চ এক লাখ টাকার মুচলেকা এবং ছেলে ফয়সাল আলীম ও আইনজীবী তাজুল ইসলামের জিম্মায় তাকে জামিন দেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর বেশ কয়েক দফা এই জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ মামলায় আলীমের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এজেডএম আলতাফুর রহমানসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ৩৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে ১৯তম সাক্ষী আবেদ হোসেনকে বৈরী ঘোষণা করে জেরা করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া দুই জনের জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দেন তিন জন। তারা হলেন- মামুনুর রশিদ, মো. মোজাফফর হোসেন ও ছেলে সাজ্জাদ বিন আলীম।
