প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনে আমরা সবাই কমবেশি মানসিক চাপে ভুগি। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা এই চাপ মোকাবেলা করতে পারেন না। যার প্রভাব পড়ে শরীরে ও মনে। এরপর দেখা দেয় নানা রোগ। তাই মানসিক চাপে বা টেনশনে পড়লে দ্রুত তা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের এবারের আয়োজনে উঠে এসেছে মানসিক চাপ কমানোর নানা কৌশল। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
ব্যস্ততাময় জীবনে কত তুচ্ছ বিষয় যে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে, তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না। এ বিরক্তিও সৃষ্টি করে মানসিক চাপ। তবে চাপ যেভাবেই আসুক না কেন সেটা নিয়ন্ত্রণে আনাটা বেশ জরুরি। মানসিক এই চাপ সামলাতে আমরা কতো কসরতই না করি। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন আপনাকে দিতে পারে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি। সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, প্রতিদিন নিয়ন্ত্রিত শারীরিক ব্যায়াম মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এই বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক জে কারসন স্মিথ জানান, নতুন গবেষণায় একদল মানুষের মানসিক চাপের ওপর প্রতিদিনকার শারীরিক ব্যায়ামের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চালানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই জানি শারীরিক অনুশীলন স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে এবারের গবেষণায় আমরা নতুন একটি বিষয় আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়েছি। তা হলো, মানুষের আবেগে ব্যায়ামের প্রভাব। আমরা দেখতে পেয়েছি প্রতিদিনের নিয়ন্ত্রিত শারীরিক অনুশীলন ব্যক্তির মানসিক চাপ নিরাময়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। কেউ যদি শারীরিক ব্যায়াম করে, তবে তা তাকে উদ্বিগ্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। আর এভাবে মানসিক চাপমুক্ত হয়ে আপনি নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।’
নিচে মানসিক চাপ কমানোর বেশ কিছু কৌশল উপস্থাপন করা হলো—
++ মানসিক চাপের যত উত্স আছে সেগুলো খুঁজে বের করুন আর সমাধান করে নিন। যদি ভিড় আপনার কাছে বড় বিরক্তি লাগে তবে বাজার করতে খোলা বাজারে না গিয়ে সুপার মার্কেটে যান বা লোকাল গাড়ির ঠেলাঠেলি ছেড়ে সিটিং গাড়িতে যাতায়াত করুন। এসবে অন্তত ভিড়টা কিছু কম হবে।
++ যদি অবস্থাটা এমন যে কাজে দেরি হওয়াটা আপনার সঙ্গী। তবে কাগজ আর কলম হাতে নিয়ে বসুন। হিসাব করে দেখুন সারা দিন কত সময় আপনি কোন কাজে দিচ্ছেন। কাজে বের হতে কী দেরি করছেন? সব কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে দেখুন। যদি এমন হয় যে, কিছু কাজের জন্য ঠিক পরিমাণ সময় পাওয়া যাচ্ছে না তাহলে আপনি সত্যিই অনেক বেশি কাজ করছেন। এ রকম হলে কিছু কাজ কমিয়ে নেওয়াটাই ভালো হবে।
++ বাজি ধরে খেলার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলুন। এতে অনেক সময় বাড়তি মানসিক চাপ এসে পড়ে। তাই কেউ বাজিতে খেলতে এলে সরাসরি তাকে নাকচ করুন। বিশেষ করে যে খেলায় আপনি জানেন যে নিজে হেরে যাবেন সেখানে ভুলেও বাজি ধরতে যাবেন না।
++ মানসিক যন্ত্রণাটা কিছুতেই না কমলে ঘুমাতে চেষ্টা করুন। নীরব কিছু সময় হয়তো আপনার সমস্যাটাকে সহজভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দেবে। আর যেসব মানুষ আপনার মানসিক চাপটা বাড়াতে পারে তাদের এড়িয়ে চলুন। কোনো বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে যদি আপনার খুব ভালো আন্তরিকতা না থাকে অথচ কিছু সময় আপনাকে বাধ্য হয়ে তার সঙ্গে কাটাতে হয়, তবে এমন সময় চেষ্টা করুন অন্য কাউকে আপনাদের পাশে রাখতে। এতে তার সঙ্গে কোনোরকম সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
++ অন্যরা আপনাকে অনুপ্রাণিত করে প্রতিযোগিতায়। আপনি আরও প্রবলভাবে প্রতিপক্ষকে হারাতে চান। শুরু হয় আপনার মনের ওপর চাপ। হারলেও এ চাপ স্থায়ী হয়। অন্যরা যত সহজ কথা বলে আপনার ওপর মানসিক চাপ চাপিয়ে দেয় কাজটা তত সহজ নাও হতে পারে। তাই অযথা মানসিক চাপ নেবেন না। কারও প্রতি ঈর্ষা করার অর্থ নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা।
++ নিত্যদিন যেসব উপকরণ ব্যবহার করতে হয় তা ব্যবহারে একটু সচেতন হতে হবে। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন বা অন্য কিছু আপনার প্রতিদিনের কাজগুলোকে আরও সহজ করে তোলে। তবে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে। তাই কোনো উপকরণ কেনার আগে নিশ্চিত হন সেটি আসলেই আপনার জীবনকে সহজ করছে কি না। মনে রাখবেন, জিনিসপত্রের যত্ন নেওয়া অথবা নষ্ট হলে তা সারানোর জন্য ছোটাছুটি কিন্তু অনেক সময় বড় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সৃষ্টি হয় মানসিক চাপের।
++ যত যাই হোক চেষ্টা করবেন একসঙ্গে একের বেশি কাজ যেন করতে না হয়। যেমন যখন পড়াশোনা করছেন সে সময় গান না শোনাটাই ভালো।
++ মাঝেমধ্যে নিজেকে বোঝান যে এখন কোনো কাজ না করাটাই ঠিক। তাতে অন্তত কিছু সময় মানসিক প্রশান্তি পাবেন। এতে অনেকাংশে মানসিক চাপ লাঘব হবে।
++ নিদ্রাহীনতা, মাথাব্যথা, সর্দি, পেট ব্যথায় আপনি বিধ্বস্ত। তবে এত কিছুর পরও মনে রাখবেন, যদি মানসিক চাপটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারেন তবে শারীরিক এ অসুস্থতাগুলো বেড়ে দ্বিগুণও হয়ে যেতে পারে।
++ অস্থিরতা যদি বাড়তে থাকে, মানসিক চাপ যদি আঁকড়ে ধরে তবে শুধু শুধু
নিজের সঙ্গে না লড়ে কোনো ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
বিশেষ পরামর্শ:
মানসিক চাপ কমাতে শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়াম অত্যন্ত উপকারী
প্রতিদিনের কাজের ও সামাজিক চাপে কিংবা উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়াতে আমাদের মনের উপর নানা ভাবে চাপ তৈরি হয় যা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত খারাপ প্রভাব বয়ে আনে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন প্রতিদিন গভীরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম পারে আমাদের এই চাপ কমাতে। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের বিশেষত্ব হচ্ছে এটি অনেক সহজেই সামান্য সময় ব্যয় করেই করে নেওয়া যায়। যেমন—আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে খানিকটা সময় গভীর নিঃশ্বাস ত্যাগ এবং গ্রহণ করার ফলে আপনার শরীরে তৈরি হবে প্রশান্তি। একই সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামকে আগে থেকেই রক্ত চাপ কমাতে উপকারী হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করার সময় মনে রাখতে হবে, প্রতিবার আপনি যখন গভীর নিঃশ্বাস নেবেন তখন আপনার শরীরের গভীরে ফুসফুসে সম্পূর্ণ বাতাস প্রবেশ করছে এবং আপনার নিচের পাকস্থলীকে এটি সম্প্রসারিত করছে। ফলে আপনার শরীরে অধিক অক্সিজেন প্রবেশ করছে একইভাবে আপনি যখন শ্বাস ত্যাগ করছেন সে সময় আপনার শরীরের গভীর থেকে কার্বনডাই অক্সাইড বাইরে বেরিয়ে আসছে। এতে আপনার শরীরে একধরনের প্রশান্তি তৈরি হবে যা আপনার মনকেও ফুরফুরে করে তুলবে। তবে আপনি যখনই শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করবেন তখন অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যাতে আপনি যে স্থানে বসে ব্যায়াম করছেন তা আরামদায়ক হয়। সেইসাথে সেটি প্রাকৃতিক এবং খোলামেলা দূষণমুক্ত পরিবেশে হয়।
কড়চা’র এই আয়োজনের মডেল হয়েছেন স্পর্শীয়া মেকআপ হেয়ারোবিক্স ব্রাইডাল ছবি দীপঙ্কর দীপু
