বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বহুলাংশে নির্ভর করে থাকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর। রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল দর্শন হচ্ছে মানুষের আর্থিক উন্নতির জন্য রাজনীতিবিদরা যে পরিকল্পনা দিবেন তার সফল বাস্তবায়ন। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য বিমোচন করে আর্থিক বত্সর ২০০৯-১০-এর ৩২.৫% থেকে ২০১৪-১৫তে ২২.৯% হ্রাস করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। এই ব্যাপারে বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্টে মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্যের প্রশংসা করা হয়েছে। আসলে অর্থনীতি যখন স্থিতিশীল থাকে তখন সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে। এক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপক প্রসার সম্ভব হয়। তবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির যে প্রাক্কলন ৭.৩% হারে করা হয়েছিল তা বৈশ্বিক মন্দা, আরব স্প্রীং এবং ইউরোপের ঋণের সমস্যার কারণে অর্জন করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার হ্রাস করে ৭.৫% থেকে ৮% -এর মধ্যে করা হয়েছে। বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৪% থেকে ৫% -এর মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ঘটলে তার কুপ্রভাব সবসময়ে দরিদ্র শ্রেণী বিশেষত মহিলা ও শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। মানব উন্নয়ন সূচকের ক্ষেত্রে দেশে বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এটি অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক।
এদেশে যাতে ধনী-দরিদ্র্যের মধ্যে আয় বন্টন ব্যবস্থায় অসাম্য হ্রাস করা যায় সেজন্য চলতি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যারা দরিদ্র এবং বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত তাদের জন্য সোশ্যাল সিকিউরিটি বাবদ খরচ ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ৩% করার কথা রয়েছে। যদিও বর্তমান সরকারের আমলে সোশ্যাল সিকিউরিটি বাবদ খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে তবে তা প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক কম থেকে যাবে। মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকার প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকার গত সাড়ে চার বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো বিনির্মাণে জোর দিয়েছিলেন। বাস্তবতা হলো গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হলে যে ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অংশীদারিত্ব স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণ করার দরকার ছিল তা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সাড়া মেলেনি। একটি জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার নয়, কেন আমরা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে অঞ্চলগত উন্নয়নে নারী-পুরুষ সমতা ভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছি না। এক্ষেত্রে দলীয় সংকীর্ণতার পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব জাহির করার প্রবণতা গ্রামীণ অঞ্চলে বহুলাংশে ব্যবহূত হয়ে থাকে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে মহিলাদের মধ্যে এক ধরনের ইগো কাজ করে থাকে— যা তার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে।
ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকার বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। আসলে বিদ্যুতের অভাবে কেবল শিল্প ক্ষেত্র নয় বরং গ্রামীণ অঞ্চলও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এজন্য কুইক রেন্টাল পদ্ধতি গ্রহণ করে সরকার দ্রুত সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট ছিলেন। এতে অবশ্য সাময়িকভাবে হলেও বিদ্যুত্ সমস্যা অনেকখানি দূর হয়েছে। তবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপের মাধ্যমে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা তা কিন্তু সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এর মৌলিক কারণ জানা না গেলেও মোটা দাগের যে বিষয়টি অনুধাবন যোগ্য তা হচ্ছে, দুটো সেক্টরের মধ্যে পারস্পরিক অসহযোগিতা এবং অবিশ্বাস। অথচ ভারতের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পেই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই অবিশ্বাস এবং অসামাঞ্জস্যপূর্ণ অব্যবস্থা এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করছে।
সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষত আমাদের প্রতিযোগীদের এক ধরনের নেতিবাচক প্রচারণায় এই দুঃখজনক ও ট্র্যাজিক ঘটনাটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতের জন্য বেশ কষ্টকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ স্থগিতকরণ করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ঘটনার সময়ে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস দেশের পোশাক খাতের দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়াননি। এদিকে সরকার শ্রমিকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে শ্রম আইনের বেশ কিছু সংশোধনী করেছেন— যার সবগুলো অবশ্য শ্রমিকদের স্বার্থ বহন করে না। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন মন্তব্য করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের পণ্যের উপর জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ স্থগিতকরণ একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আশা করা গিয়েছিল সরকারের প্রস্তাব মোতাবেক শ্রমিক বেতন ভাতাদি ১ মে থেকে বৃদ্ধি করতে বিজিএমই অন্তত একটি বিশেষ পদক্ষেপ নেবেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে গড়ে মাথাপিছু শ্রমের মজুরি মাসিক ভিত্তিতে হচ্ছে মার্কিন ডলার ৩৮। অন্যদিকে চীনে ১৭২ মার্কিন ডলার, পাকিস্তানে ১১৬ মার্কিন ডলার, ভিয়েতনামে ১১১ মার্কিন ডলার, ভারতে ১০৮ মার্কিন ডলার, শ্রীলংকায় ও ইন্দোনেশিয়ায় ৯২ মার্কিন ডলার, নেপালে ৮৩ মার্কিন ডলার ও কম্বোডিয়ায় ৮০ মার্কিন ডলার। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে মজুরি নির্ধারণ করেছিল তা সে সময়ের হিসাবে ছিল মার্কিন ডলার ৫৬। সে বিবেচনা এবং পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির হার যদি বিবেচনায় আনা যায় তবে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত মার্কিন ডলার ৬৫। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো- বিজিএমই মাত্র ৬০০ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। আসলে এই প্রস্তাবটি কেমন করে তারা দেয় এবং মুখে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির বুলি আওড়ায়— সেটি কোনমতেই বোধগম্য নয়। অবশ্যই শ্রম মজুরি হবে বাস্তবতার নিরিখে। আর তাই জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রত্যাশা যে, যাতে পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ৬৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। দেশে আজ যে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পালন করছে পোশাক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকরা। এদিকে ফরেন বাইয়ারদের এক অংশ চাপ দিয়ে পূর্বের চেয়ে কমমূল্যে পোশাক ক্রয় করতে চাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি, শ্রম অসন্তোষ এবং শ্রমিকদের ক্রীড়নক হিসাবে একটি কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী বারবার ব্যবহার করায় বাংলাদেশের বেশ কিছু পোশাক শিল্প মালিক তাদের কারখানাসমূহ বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। এটি মোটেই কোন যুক্তিসঙ্গত সমাধান হলো না। টাকার মূল্যমান ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হচ্ছে এটি আপাতদৃষ্টিতে ভাল হলেও দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানিকারকদের জন্য সমস্যার উদ্রেক করবে। বাংলাদেশের রপ্তানি আরো বৃদ্ধি করতে হলে সড়ক-রেলখাতের ব্যাপক সংস্কার সাধন প্রয়োজন। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের জন্য নৌ-পথের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং যেসব নৌ-পথ বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলোর মধ্যে যেগুলো সচল করা সম্ভব সেগুলোকে চালু করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। নৌ-পথে পণ্য পরিবহন হচ্ছে বিশ্বের স্বল্পব্যয়ে পণ্য পরিবহনের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।
বাংলাদেশে যে শ্রমশক্তি আমরা বিদেশে প্রেরণ করছি তাদের বিদেশে প্রেরণের পূর্বে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি প্রেরণের পূর্বে ভারতে অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসা থেকে আরবী শিক্ষায় প্রশিক্ষণ নেয়া হয়। আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর অবস্থা যাচ্ছেতাই। আমরা ‘ব্লু কলার’ এবং ‘হোয়াইট কলার’ উভয় শ্রেণীর শ্রমশক্তি বিদেশে প্রেরণের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দেশ অনুযায়ী করা গেলে বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের পরিমাণ আরো অধিক হারে বাড়ানো যেত। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকার যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, তা যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তবে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব; কিন্তু ‘বিড়ালের গলায় ঘন্টা’ বাঁধবে কে? পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞানের অভাব নারী শ্রমিকদের বিদেশে অসুবিধার সৃষ্টি করবে।
করের ক্ষেত্রে সরকার নানাধরনের রিফর্ম ম্যাজার্স নিয়েছে; কিন্তু এদেশের অধিকাংশ বিত্তবান কর দেয়ার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করে থাকেন। এটি দেশ ও জাতির জন্য নানামুখী সমস্যার উদ্রেক করে থাকে। তারপরও ধীরে ধীরে কর আদায়ের ক্ষেত্রে কর বিভাগের দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইটিআইএন নাম্বারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আয়কর মেলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সচেতন হলেও যারা বৃহত্ অংকের কর দেয়ার কথা তারা কিন্তু ঠিকভাবে কর দিচ্ছেন না।
সামস্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার মৌল উপাদান হচ্ছে ব্যাস্টিক অর্থনীতির ভিত্তি ভূমির উপর দাঁড়িয়ে। গত সাড়ে চার বছরে যে কর্মসংস্থান হয়েছে, তা একটি আয় প্রবাহ দিয়েছে; কিন্তু ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আপাত দৃশ্যে হ্রাস পেলেও বড় ধরনের বৈষম্য মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে ঘটেছে। এই মূল্যস্ফীতি যদি আরো আগে লাগাম টেনে ধরা যেত তা হলে ভাল হতো; কিন্তু সবকিছুই সরকারের ওপর নির্ভর করে না, এক্ষেত্রে সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কথায়ই আসা যাক। দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে তার উপর নির্ভর না করেই এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী করতে সচেষ্ট রয়েছেন। এটি আসলে জনগণকে কষ্ট দেয়। এই ধরনের অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত; কিন্তু কখনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। গত বেয়াল্লিশ বছরে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি করেছে।
দেশের উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সহায়-সম্পত্তি রক্ষা করা দরকার। যেভাবে দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা বর্তমানে ট্রেনের বগি পোড়ানো হয় তা দুঃখজনক। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হবে ২০১৫ সালে। এরপরই পার্সপ্রেকটিভ প্লেনের আওতায় শুরু হবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। ‘ভিশন ২০২১’ বা ‘রূপরেখা-২০২১’ একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে উঠার মাধ্যমে যেখানের মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো বাস্তবায়িত হবে। কৃষিখাতে ধীরে ধীরে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সুষ্ঠু নীতিমালার কারণে সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি সামঞ্জস্য সাধিত হচ্ছে। দেশে কৃষি খাতে যে নীরব বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছে তা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত।
এদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের অতিমুনাফামুখী সুদের হার এবং বিভিন্ন চার্জ প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ কাজ করে থাকে। ব্যাংক আল ফালাহ নামে একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে যেটি স্বল্পমাত্রার ফরেন ভিসাও ড্রাফট করতে চার্জ চায় ২৮৫০ টাকা, যেখানে এই ড্রাফট করতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক নেয় ১১০০ টাকা। আবার সোনালী ব্যাংক লিঃ -এ লাগে ৩০০ টাকা। আসলে এক তরফাভাবে ব্যালেন্স শীট এবং অফ ব্যালেন্স শীট একটি ভিটিজের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ মুনাফা করছে। তাদের এই ধরনের অপতত্পরতা মোটেই ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল নয়। বোধগম্য নয়, কেমন করে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা লংঘন করে আমানতের সুদের হারের উপর প্রদেয় সুদ এবং ঋণের সুদের উপর আদায়কৃত সুদের ব্যবধান ২% থেকে ৭% -এর মধ্যে করছে এবং গড় ঋণের সুদের হার হচ্ছে ২০% -এর মতো। এত উচ্চ সুদের হার দিয়ে পণ্য উত্পাদন করা যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি বিপণন ব্যবস্থাতেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। উচ্চ সুদের হার অবশ্যই হ্রাস করতে হবে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ইন্ডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর নিয়োগে সতর্ক হতে হবে।
এদিকে শিক্ষিত মানুষ যেখানে ২০% হারে উচ্চ সুদের হারের জন্য শিল্প উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ করতে পারছে না, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় গ্রামীণ ব্যাংক এবং বিভিন্ন এনজিও ২৭.৫% থেকে ৪৮% হারে উচ্চ সুদ অসহায় ও অশিক্ষিত মহিলাদের কাছ থেকে আদায় করছে। এই যে অব্যবস্থা তার দরুন গ্রামীণ মহিলাদের অধিকাংশই ঋণের ভারে জর্জরিত। যারা এই Vicious Circle of High cost of borrowing vate-এর জাল কেটে বেরিয়ে আসতে পারছে তাদের পেছনে অন্য কার্যকরণ রয়েছে। এ ব্যাপারে দেশে-বিদেশে আরো অধিক হারে বাস্তবসম্মত গবেষণা করা দরকার। অথচ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পূর্বে আশা করা হয়েছিল যে, গ্রামীণ নারীদের সুদের হার ২২% করা হবে। বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন এ্যাক্ট-২০১০ গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাঁচটি অঞ্চলগত অর্থনৈতিক এলাকার সৃষ্টি হয়েছে যেগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা এবং ভৌত-অবকাঠামোগত সুবিধার মধ্যে যোগাযোগ, বিদ্যুত্, গ্যাস, জ্বালানি ও পানির সুবিধা এবং দক্ষ নেতৃত্ব বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পেলে এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ গঠনের জন্য কম্পিটিশান এ্যাক্ট ২০১০ গঠন করা হয়েছে। বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা চলতি বছরে ৮৮২৫ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। অথচ পাকিস্তানে বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮/২০ ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকে না। বাংলাদেশিদের দেশে ও বিদেশে স্থানান্তরের জন্য নীতিমালা রয়েছে তার আরো আধুনিকায়ন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেননা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ মূল্যবান ভূমিকা পালন করে থাকে।
বাংলাদেশ আগামী এক বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হতে সক্ষম হবে। এ জন্য অবশ্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থিতিশীলতা। কোন কোন চতুর ব্যক্তি রাজনৈতিক সমঝোতার বদলে ঝামেলা পাকাতে ব্যস্ত থাকেন। এটি সব সময়েই হয়ে থাকে। পূর্বতন হিসাব অনুসারে মাথা পিছু আয় হচ্ছে মার্কিন ডলার ৯২৩ এবং নতুন বেইজ ইয়ার ধরলে এটি হচ্ছে ১০৪৪। অথচ পূর্বতন হিসাবে ১০৪৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হতে পারলে দেশ মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আসলে এজন্য আমাদের সবার একধরনের জাতীয় ঐকমত্য দরকার। কেবল পরনির্ভরশীলতার হাত থেকে মুক্তি নয়, শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আমাদের মাতৃভূমি এবং সকল ধর্ম-বর্ণ ও নারী-পুরুষ সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এদেশকে আরো এগিয়ে নিতে পারে। বিদেশে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরো গতিশীলতার সাথে কাজ করতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর জন্য বিদেশিদের দেশের আইনে হস্তক্ষেপ করা বন্ধ করতে হবে। যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা বহাল থাকে, তবে কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য ক্রয়ে অনুত্সাহিত হয়ে পড়বেন এবং রপ্তানিলব্ধ আয় হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার জন্য নানামুখী ব্যবস্থা নিলেও এটি কার্যকর করতে বেসরকারি উদ্যোগ দরকার। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাসকল্পে অধিকতর ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত। নিম্নশ্রেণীর আয়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে অন্য আয়ের শ্রেণীর চেয়ে বেশি। এদেশে স্থানীয় পর্যায়ের বিনিয়োগের সুফল যদি গ্রহণ করা যায়, তবে স্বল্পমাত্রার বৈদেশিক বিনিয়োগই দেশের উন্নয়নে যথেষ্ট। কেননা বৈদেশিক বিনিয়োগের সিংহভাগই আবার বিদেশে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। গ্রামীণ ব্যাংককে সরাসরি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটারী এজেন্সীসের অধীনে আনার পাশাপাশি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটারী এজেন্সীসকেও ঢেলে সাজানো দরকার।
লেখক: উপাচার্য ও ডীন, ব্যবসা-বাণিজ্য বিভাগ, প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকনোমিস্ট
ই-মেইল: [email protected]
