এই প্রথম দাদুর বাড়িটা এতো ভালো লাগছে মিতুর। অন্যরকম। এই মাঠ, নদী, আকাশ আর দাদু বাড়ির গাছগুলো মিতুর কি যে আপন হয়ে উঠেছে! ভাগ্যিস আম্মুর ট্রেনিংটা হয়েছিলো। আর তাই মিতু বুঝতে পারলো গ্রাম এতো সুন্দর। গ্রামের সবুজ খোলা মাঠ, মিষ্টি বাতাস মিতুর মনকে একেবারে ভরিয়ে দিয়েছে। আর নদীটা! নদীটার কথা কি বলবে মিতু, এতো সুন্দর, দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। আকাশ, নদী আর সবুজের সাথে মিতুর এখন অদ্ভুত এক মিতালী চলছে।
মিতুর আম্মু একটা সংস্থায় ভালো পদে চাকরি করে। আব্বু প্রকৌশলী। আম্মু দশ দিনের প্রশিক্ষণে গেছে ব্যাংকক। আর আব্বুরও এসময়েই সাইটের জরুরি কাজ। থাকতে হচ্ছে চট্টগ্রাম। তাই কি আর করা মিতুকে আব্বু আম্মু রেখে গেছে দাদু বাড়ি। প্রথম তো মিতুর খুব খারাপ লাগছিলো আব্বু আম্মুকে ছাড়া থাকতে হবে। দাদু বাড়িতে কম্পিউটার নেই, মজার মজার গেমস খেলতে পারবে না। কিন্তু দাদু বাড়িতে এসে দাদু ও দাদুভাইয়ের আদর আর দাদু বাড়ির সবার ভালোবাসায় মিতু তো একবারে মুগ্ধ। মিতুর দাদু বাড়িটা একবারে মেঘনা নদীর পাড়ে। এর আগে আরো দু’ একবার এসেছে। কিন্তু থেকেছে মাত্র দু’একদিন। আর ঐ দু’একদিন আম্মুর কি খরবদারি— এই মিতু এটা করবে না, ওটা করবে না। এখানে যেও না, ওখানে যেও না। আর নদীর কাছে গেলে আম্মুর সে কি ভয়- খবরদার মিতু নদীতে যাবে না। সাঁতার জানো না ডুবে যাবে।
এখন শরত্ কাল। মেঘমুক্ত আকাশ। কি ঝকঝকে নীল! যেন কাঁচের আকাশ। সেই নীল আকাশের ছায়া নদীর ওপর পড়ে নদীটাও একবারে নীল। আর নদীর পাড় ঘেঁষে কাশবনে। বাতাসে কাশফুলগুলো যখন দোলে কি যে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মিতুর মন ভালো হয়ে যায়। শেষরাতের দিকে হালকা শিশির পড়ে সেই শিশিরে ভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে ও বুক ভরে টেনে নেয় মুক্ত বাতাস। আর দাদুর বাড়ির পেছনে পূর্ব দিকে খোলা বিস্তৃত মাঠ আর আকাশ এক হয়ে দিগন্তরেখা। সেখান থেকে সূর্যটা লাল রং ছড়িয়ে আস্তে আস্তে উঠতে থাকে। রোজ সকালে উঠে মিতু দেখে সেই সূর্যদয়। শরতের উজ্জ্বল মিঠে মিঠে রোদ মিতুকে স্বাগত জানায় সুন্দর একটা দিনে। আর তখনই দাদুমনি মিতুকে খেতে দেয় মজার মজার পিঠা। দাদু বলে, মিতুমণি শীতকালে আসবে আরো মজার মজার পিঠা খাওয়াবো।
ঢাকায় মিতুর কিছু খেতে ভালোই লাগতো না। কিন্তু গ্রামে সবকিছু খেতেই ভালো লাগছে বিশেষ করে মাটির চুলায় দাদুর হাতের মাসের ডাল, মেঘনার চাপিলা মাছের ঝোল, কেচকি মাছের চচ্চড়ির তো কোনো তুলনাই নেই।
বিকেলে মিতু দাদুভাইয়ের সাথে নদীর পাড়ে হাঁটতে আসে। দাদুভাই মিতুকে তার ছেলেবেলার গল্প শোনায়। এই মেঘনায় দাদুভাইয়ের শৈশব-কৈশোরের কত স্মৃতি। দাদুর সাথে মিতু দেখে ধান ক্ষেত, পাট ক্ষেত, মরিচের ক্ষেত। সবুজ আর সবুজ। দাদুভাই বলে, আর ক’দিন পরে হেমন্তে এই ধান পাকবে। ক্ষেতগুলো তখন হয়ে যাবে সোনালি। ঘরে ঘরে তখন ধান কাটার উত্সব হবে। ঝিরঝির সুন্দর নদী পাড়ের হাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে মিতু দাদুভাইয়ের এসব গল্প শোনে। বিকেলের নরম রোদ তখন সবুজ ক্ষেতগুলোর ওপর বিছিয়ে দেয় হলুদ চাদর। তারপর সূর্যটা আস্তে আস্তে নেমে যায় নদীর বুকে। নদী আর আকাশ হয়ে যায় টকটকে লাল। কি যে অসাধারণ সুন্দর! মিতু চোখ ফেরাতে পারে না। সন্ধ্যের পর মিতু যখন ঘরে ফিরে আসে ঘরে দাদু তখন চা-নাস্তা দেয়। নাস্তা খেয়ে মিতু দাদুভাইয়ের কাছে পড়তে বসে। আম্মু সুন্দর করে বই গুছিয়ে দিয়েছে আর বলেছে সন্ধ্যায় পড়াশোনা করতে। এ সময় মিতুর আম্মুর কথা মনে পড়ে। আম্মু আর আব্বু অবশ্য রোজই টেলিফোনে মিতুর সাথে কথা বলে। সবগুলো পড়া পড়ে মিতু আম্মুকে অবাক করে দেবে।
শুধু অপরূপ প্রকৃতি আর এই নির্মল আনন্দই না এখানে এসে মিতু পেয়ে গেছে অনেকগুলো বন্ধু। ঢাকার ফ্ল্যাট বাড়িতে ওর কোনো বন্ধু নেই। স্কুলে দু’একজন যারা আছে তারা কখনও বাসায় আসে না মিতুও কারো বাসায় যায় না। আম্মু বলেন— ফ্ল্যাটের কারো বাসায় না বলে কখনও যাবে না। আর যাবেই বা কার বাসায় কারো সাথে তো ভালো করে বন্ধুত্বই হয়নি। কিন্তু দাদু বাড়িতে তার অনেকগুলো বন্ধু হয়েছে। পারুল, আসমা, ইয়াসমিন পারভীন, সাফিয়া এরকম অনেকগুলো বন্ধু। ওরা সবাই খুব ভালো। প্রতিদিন মিতু এক একজনের বাসায় বেড়াতে যাচ্ছে। ওদের আম্মু আর আব্বুও মিতুকে অনেক আদর করছে। ওদের সবার বাসায়ও অনেক রকম গাছ। মিতু এই প্রথম ইয়াসমিনদের বাড়িতে আমড়া গাছ, আর পারভীনদের বাড়িতে চালতা গাছ দেখলো। মিতুর এই নতুন বন্ধুরা সবাই স্কুলে যায়। স্কুল থেকে এসে ওরা দাদুর বাড়ির বড় উঠানে খেলে। মিতুও ওদের সাথে মাটিতে পা রাখে।
মাটি আর প্রকৃতির এতো কাছাকাছি এসে মিতু বুঝতে পারে এই প্রকৃতি ওর ভেতরে অন্য এক আলো জ্বেলে দিয়েছে। প্রকৃতি যেন তাকে নতুন আর একটা জীবন দিয়েছে। অন্যরকম, ভালো লাগার। যখন বিশাল আকাশ তলে দাঁড়িয়ে নদীর নীল পানি দেখে ওর মনটাও আকাশের মতো বিশাল হয়ে যায়, নদীর পানির মতো স্বচ্ছ হয়ে গেছে। সবুজ ক্ষেতগুলো ওকে সজীব করে তোলে। আর ওই যে কাশবন মনকে একবারে নির্মল করে দেয়। মিতুর মনে হয় সুন্দর এ দিনগুলো যদি শেষ না হতো।
কিন্তু দিনগুলো ফুরিয়ে যায় মিতুর আম্মু চলে এসেছে ব্যাংকক থেকে। আব্বু আম্মু মিতুকে নিতে এসেছে। কাল রাত থেকেই দাদুর রান্নার তোড়জোড় চলছে, অনেক মজার মজার খাবারের আয়োজন করেছে। মিতুর বন্ধুদেরও আজ দাওয়াত। সকাল থেকেই বন্ধুরা ভিড় করে আছে। সবাই মিতুর জন্য নানা উপহার এনেছে। কেউ এনেছে গাছের কচকচে ডাসা ডাসা পেয়ারা, কেউ চালতা, আবার কেউ দিয়েছে ডালের বড়া। আর দাদু তো সেই রাত থেকেই মিতুর পছন্দের খাবারের পোটলা বাঁধছে। আম্মুকে দেখে মিতুর খুব ভালো লাগছে কতদিন পর আম্মুকে দেখছে। আম্মুও ওর বন্ধুদের জন্য ব্যাংকক থেকে সুন্দর সুন্দর হেয়ার ক্লিপ, মাথার ব্যান্ড, চুড়ি, রং পেন্সিল, কলম এরকম অনেকগুলো উপহার এনেছে। সেগুলো পেয়ে ওর বন্ধুরা অনেক খুশি। দুপুরে সবাই এক সাথে খাওয়ার পর এখন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবার পালা। মিতু আব্বু আম্মুর সাথে নৌকায় ওঠে। নদীর পাড়ে দাদু, দাদুভাই, ওর বন্ধুরা দাঁড়িয়ে থাকে। ঢেউয়ের তালে নৌকাটা আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। পাড়ে দাঁড়িয়ে সবাই মিতুর দিকে হাত নাড়ে। মিতুও হাত নাড়ে। সব আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে। মিতু দেখে নদীর পাড়ের সাদা কাশফুলগুলো বাতাসে দুলছে যেন মিতুকেই বিদায় অভিবাদন জানাচ্ছে। মিতু ফিরে যাচ্ছে ঢাকায়। কিন্তু মিতু জানে সে শূন্য হাতে ফিরছে না এবার সে অনেক কিছু নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। এই মুক্ত প্রকৃতি তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তার ভেতরটাকে অনেক নির্মল ও আলোকিত করে দিয়েছে। সে তার সাথে নিয়ে যাচ্ছে শুভ্র সুন্দর কাশবনের ছোঁয়া।
