‘ওরা আমাকে গ্যাসটিকের ওষুধ (ঘুমের) খাইয়ে একটি ঘরে বন্ধ করে রাখত, খাবার চাইলে মারতো, মেরে ফেলার ভয় দেখাতো, রাতে জোর করে ওষুধ খাওয়ায়ে দিতো।’ র্যাবের ব্রিফিং অনুষ্ঠানে কথাগুলো বলছিলো স্কুল ছাত্র সাকিব হোসেন (১৪)। গত শনিবার সকালে রাজধানীর মিরপুর থেকে দুর্বৃত্তরা তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। অপহূত হওয়ার তিনদিনের মাথায় সোমবার গভীর রাতে র্যাব গাজীপুর এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে। গ্রেফতার করা হয় ছয় অপহরণকারীকে। সাকিবকে উদ্ধারের পর গতকাল মঙ্গলবার র্যাব-৪ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে পুরো ঘটনার বর্ণনা গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরা হয়।
সাকিব জানায়, সে রাজধানীর মনিপুর স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। শনিবার সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য উত্তর ইব্রাহিমপুরের বাসা থেকে বের হয়। পথে তারই এক বন্ধু রকি (১৫) তাকে রিক্সায় তুলে মিরপুর-১ নম্বর নিয়ে যায়। সেখানে আরো বেশ কয়েকজন একটি মাইক্রোবাস নিয়ে অপেক্ষা করছিল। তারা তাকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।
র্যাব জানায়, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় অপহরণকারীরা সাকিবের মা হাওয়া নূর বেগমকে মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে বলে, ‘সাকিবকে তারা অপহরণ করেছে, ১০ লাখ টাকা না দিলে সাকিবকে জীবিত ফেরত পাবেন না।’ অপহরণকারীদের এমন ফোন পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন মা। ব্যস্ত হয়ে পড়েন অপহরণকারীদের মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা জোগাড়ে। ছুটে যান আত্মীয়-স্বজনদের কাছে। এর মধ্যে সাকিবের মামা মতিউর রহমান বিষয়টি র্যাব-৪ এর এক কর্মকর্তাকে জানান। কাফরুল থানায় অপহরণের ঘটনা নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন। সাকিবের মা হাওয়া নূর বেগমের অভিযোগ পেয়ে র্যাব-৪ এর ক্যাপ্টেন আশরাফের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল সাকিবকে উদ্ধারে মাঠে নামে। এর মধ্যে অপহরণকারীরা সাকিবের মাকে টাকার জন্য বারবার তাগাদা দিয়ে হুমকি দিতে থাকে।
সোমবার সকালে আবারও অপহরণকারীরা ফোন করে সাকিবের মাকে। এ সময় হাওয়া নূর বেগম অপহরণকারী দলের সদস্যদের জানায়, তিনি ১০ লাখ টাকা জোগাড় করতে পারেননি, ৫ লাখ টাকা জোগাড় করেছেন। সাকিবের মায়ের ফোন পেয়ে অপহরণকারীরা তাকে টাকা নিয়ে প্রথমে মনিপুর স্কুলের সামনে আসতে বলে, এরপর তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান পরিবর্তন করতে থাকে। এরই মধ্যে র্যাবের গোয়েন্দা দল তাদের মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে সোমবার বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অপহরণকারী দলের সদস্য শাহিদ ব্যাপারী (২৭), জাহিদুল ইসলাম তুষার (১৮) ও জহিরুল ইসলামকে (১৮) গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে গ্রেফতার করে। তাদের দেয়া স্বীকারোক্তি মতে অপহূত সাকিবকে জয়দেবপুরের হোটেল রেডিপ্লাস’র একটি রুম থেকে উদ্ধার করে।
এ সময় অপহরণকারীদের অপর একটি দল সাকিবের মায়ের কাছে ফোন করে বলে, ১ ঘণ্টার মধ্যে টাকা না দিলে সাকিবকে আর ফিরে পাবেন না। পরে র্যাবের অপর একটি দল অপহরণকারীদের টাকা দিতে সাকিবের মাকে টাকাসহ রাজধানীর ইব্রাহিমপুরস্থ মনিপুর স্কুলের সামনে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার আগে অপহরণকারী দলের সদস্য বিপ্লব (২২), তুহিন মিয়া (১৮) ও নাসির উদ্দিন (৩৮) আসে টাকা নেয়ার জন্য। দূর থেকে ওঁত্ পেতে থাকা র্যাবের সদস্যরা এ সময় তাদের জাপটে ধরেন। পরে তাদের কাছ থেকে এক রাউন্ড গুলি ও ২৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
ব্রিফিংয়ে র্যাব-৪ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল হাসান জানান, অপহরণকারীরা পৃথক দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে সাকিবকে অপহরণ করে। তবে অপহরণের মূল হোতা রকিকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে তিনি জানান।
