নাটোরের ৪ টি আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। দলের মনোনয়ন পেতে কেন্দে ও যোগাযোগ শুরু করেছেন তারা। দলের প্রবীণ নেতাদের চেয়ে প্রচার-প্রচারণায় তরুণরাই বেশি এগিয়ে রয়েছেন। ব্যানার, পোস্টার, বিলবোর্ড, পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি সভা-সমাবেশ, গণসংযোগের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নাটোরের মানুষের মনে শঙ্কা আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধানের অজুহাতে নিজে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার কথা বারবার বলা, অপরদিকে ১৮ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়ায় নিরীহ মানুষ আতংকিত।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেন, মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তা বেশ কমেছে। এর কারণ হিসেবে তারা সরকারের অর্জন ও সাফল্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়া, মন্ত্রী-এমপিদের সাথে এলাকার নেতা কর্মী ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব সৃষ্টি, অধিকাংশ মানুষকে সন্তুষ্ট করতে না পারা প্রভৃতির কথা বলছেন।
মন্ত্রী সভার অনেক সদস্যকেই মানুষ দুর্নীতিবাজ মনে করে। এছাড়া দলীয়করণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা, গুম, খুন প্রভৃতি কারণে সরকারের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ। মহাজোটের শরিক কয়েকটি দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রতি বৈরী আচরণ, হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলাকে ভালভাবে নেননি অনেকেই। সম্প্রতি ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয়ে ঐ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া): এই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও অন্যান্য দলের প্রার্থীরা গণসংযোগ শুরু করেছেন। শুভেচ্ছা ও দোয়া চেয়ে ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলিয়েছেন অনেকে। বড় দুই দলেই রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ উদ্দিনের স্ত্রী আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য শেফালী মমতাজ, নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এডভোকেট আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগ নেতা কর্নেল (অব.) রমজান আলী সরকার, কৃষক লীগের কেন্দ ীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকুল হক, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী আসিয়া জয়নুল বেনু, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম বকুল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন। অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত। তবে গোপালপুর পৌরসভার মেয়র মনজুরুল ইসলাম বিমল ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি তাইফুল ইসলাম টিপু বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ ীয় প্রচার সম্পাদক তাসনীম আলম ও আখ চাষি সমিতির নেতা আনছার আলী দুলালও ঘরে বসে নেই।
নাটোর-২ (সদর): এই আসনটিতে দুই দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সংকট তীব্র। দুই দলেরই সাংগঠনিক তত্পরতা নেই বললেই চলে। জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী এডভোকেট এম. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু দীর্ঘদিন কারাগারে আছেন। তার অনুপস্থিতিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি উদ্যোগে জাতীয় কর্মসূচি পালিত হয়। মিছিল-সমাবেশে নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায় না। জেলা সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাচ্চুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় দুলুর জনপ্রিয়তা রয়েছে। তিনি আশা করছেন, আগামী নির্বাচনে তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে। কোন কারণে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হলে তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি প্রার্থী হবেন। অপরদিকে ঢাকার শিল্পপতি আবুল কাশেম আগামী নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাবেন বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো খুবই দুর্বল বলে মনে করেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। অনেক উপজেলায় দীর্ঘদিন সম্মেলন ও নতুন কমিটি হয়নি। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এক বছর আগে মারা গেছেন। তার স্থলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন সদরের সংসদ সদস্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার। সভাপতি এডভোকেট সাজেদুর রহমান খানের অনেক বয়স। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির। জেলার প্রায় সর্বত্রই ক্যাডারদের আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। তাদের অনেকে মাদকসেবন ও ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জবরদখল, ছিনতাই প্রভৃতি বেআইনি ও অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত। সদর উপজেলায় দৃশ্যমান উন্নয়ন তেমন হয়নি। তবে সরকারি সহায়তা পেয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, দুস্থ, বিধবা ও বয়স্করা ভাতা পাচ্ছে। অনেকেই পাচ্ছে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা। কিন্তু আওয়ামী লীগের কোন নেতাকর্মী সরাসরি তাদের কাছে গিয়ে বলছে না- এই উপকার কে করেছে। জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শিমুলের সাথে শুরু থেকেই
প্রচণ্ড বিরোধ চলছে প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের। শিমুলের শতভাগ বিশ্বাস, আগামী সংসদ নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাকেই মনোনয়ন দেবেন। দুই জনই গ্রাম-শহরে ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে ফেলেছেন। গত শুক্রবার দুইজনের মধ্যে প্রকাশ্যে হাতাহাতিও হয়েছে।
জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে বেরিয়ে নির্বাচন করলে এই আসনে প্রার্থী হতে পারেন সাবেক সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সেন্টু।
নাটোর-৩ (সিংড়া): বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক কাজী গোলাম মোর্শেদ এলাকায় এখনও জনপ্রিয়। অপরদিকে পৌর বিএনপির সভাপতি পৌর মেয়র শামিম আল রাজিকে নিয়ে তরুণদের মধ্যে উত্সাহ-উদ্দীপনা আছে। ‘ধানের শীষ’ সংগঠনের কেন্দ ীয় কমিটির সহসভাপতি ডা. নজরুল ইসলাম ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনু দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গসংগঠনের নেতা কর্মীরা নানা গ্রুপে বিভক্ত। এই সুযোগে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী অধ্যাপক বেলালুজ্জামান ১৮ দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তদবির করছেন।
বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের জুনাইদ আহমেদ পলক সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। সিনিয়র নেতাদের সাথে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তার সাথে ক্যাডারদের সখ্যতা বেশি দেখা গেছে। তবে তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে মত বিনিময় ও কর্মীসভা করছেন। এলাকার উন্নয়নসহ মহাজোট সরকারের সাফল্য তুলে ধরছেন। অনেক প্রভাবশালী, প্রবীণ ও গ্রামের প্রধান বলছেন, ভোটের সময় তিনি বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছিলেন। এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম ও সিংড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম শফিক মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে প্রচারণায় নেমেছেন মঞ্জুর আলম হাসু।
নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলা): এই আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে আভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। বড়াইগ্রামে গত ১০ বছর আওয়ামী লীগের দলীয় কাউন্সিল হয়নি। বিএনপির উপজেলা সভাপতি প্রায় আড়াই বছর থেকে বহিষ্কৃত। উপজেলার গুরুদাসপুর উপজেলার আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও সুস্পষ্ট অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ দলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস গত প্রায় ৫ বছরে নানা কারণে সমালোচিত। প্রকাশ্য দিবালোকে উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ নূর বাবুকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা, দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি, এলাকায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়াসহ নানা কারণে তিনি এবার বেশ বিপাকে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের নতুন প্রার্থীদের মধ্যে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে বড়াইগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী আলোচনায় উঠে এসেছেন। জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক এডভোকেট আরিফউদ্দিন সরকারও মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। আওয়ামী লীগ নেতা আহাম্মদ আলী মোল্লার প্রচারণায় জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোজাম্মেল হক প্রচারণা শুরু করেছেন। তবে তিনি মৌসুমি নেতা হিসেবে পরিচিত। জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর মুক্তির দাবিতে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক মনোনয়ন পাওয়ার জন্য কেন্দে র সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। সন্ত্রাসী হামলায় নিহত বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লা নূর বাবুর সহধর্মিণী মহুয়া নূর কচি মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। ১৮ দলের শরীক জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন খান প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে আলাপ করে জানা যায়, বর্তমান সরকারের আমলে উত্পাদন খরচ বাড়লেও চাষিরা ধানের ন্যায্য মূল্য পায়নি। এলাকায় চোখে পড়ার মতো কোন উন্নয়ন কাজও হয়নি।
