না’গঞ্জ ও গাজীপুরে বিক্ষোভ ভাংচুর সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ ২০

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫২
ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের অসন্তোষ চলছেই। টানা ৫ম দিনের মতো গতকাল বুধবারও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাংচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সকালে গার্মেন্ট শ্রমিকরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধের চেষ্টা চালালে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ফতুল্লা শিল্পাঞ্চল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে অন্তত ২০ জন গুলিবিদ্ধসহ ৩০ জন আহত হয়েছে। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের জিরানী বাজার এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। এসময় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া গাজীপুরের কোনাবাড়ি, কাশিমপুর ও কালিয়াকৈরসহ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, ভাংচুর ও সড়ক অবরোধ করেছে শ্রমিকরা। এসময় পুলিশের লাঠিচার্জে ১৫ শ্রমিক আহত হন। সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের কাঠেরপুল, পিটালীপুল, রামারবাগ, কুতুবআইল এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তারা ফতুল্লা শিবুমার্কেট এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রুট অবরোধ করে সড়কের উপর বসে বিক্ষোভ শুরু করে। এতে ওই লিংক রোডে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শ্রমিকদের উপর লাঠিচার্জ করলে দু’ পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে সকাল ১০ টা থেকে লিংক রুটে যান চলাচল শুরু হয়। সকাল সোয়া ১০টায় শ্রমিকরা আবার জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখানোর চেষ্টা করলে পুলিশ আবারও বাধা দেয়। এসময় পুলিশ শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। এতে ২০ জন গুলিবিদ্ধসহ ৩০ জন আহত হয়। গুলিবিদ্ধ ৬ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিত্সক শামীম চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সংঘর্ষকালে শ্রমিকরা নসিব পরিবহনের একটি বাসসহ অন্তত ৭ টি যানবাহন ভাংচুর করে। এসময় টাইম সোয়েটার, কাসপিয়ান, ইউরোটেক্স, মেরিনাসহ বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে শ্রমিকরা। শ্রমিকরা টাইম সোয়েটারে আগুন দেয়ার চেষ্টা করে। আহত শ্রমিক ও কর্মচারীদের মধ্যে রতন, সাইফুল ইসলাম, বাবু মিয়া, মতিন, সিকিউরিটি গার্ড আইজউদ্দিন, হক মিয়া, জসিম, মোমেনা, আলামিন, শফিউল্লাহ, রানু, শারমীন, সুমন, রেশমা, নাছিমা ও জিয়াসমিনের নাম জানা গেছে। এছাড়া সংঘর্ষে শ্রীদাম, শাহাদাত্ হোসেন, রহিমসহ শিল্প পুলিশের ৪ সদস্য আহত হয়েছেন। এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে কতিপয় শ্রমিক নেতার উস্কানি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিকেএমইএ এর পরিচালক ও লেবার অ্যাফেয়ার্স স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান জিএম ফারুক। তিনি বলেন, পূজা ও ঈদ আসন্ন। এ ধরনের অরাজক অবস্থা চলতে থাকলে গার্মেন্ট মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের জেলা শাখার নেতা এম এ শাহীন ও ইকবাল হোসেন। নারায়ণগঞ্জ শিল্প পুলিশ-৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আহমেদ বলেন, সংঘর্ষকালে ১২১ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ও ১৬ রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। শ্রমিকরা টাইম সোয়েটারে ভাংচুর শেষে আগুন দেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। সাভার থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, সকালে আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকার নর্দান ফ্যাশন, ডরিন গার্মেন্টসহ বেশ কয়েকটি গার্মেন্টের শ্রমিকরা নবীনগর-কালিয়াকৈর মহাসড়কের জিরানী বাসস্ট্যান্ডে টায়ারে আগুল জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এসময় আশপাশের বেশ কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ একদিনের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে সেসব কারখানার শ্রমিকরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এসময় শ্রমিকদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে ৪০ জন আহত হন। পরে র্যাবের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এদিকে একই সময় জিরাবো এলাকার আর্টিস্টিক ডিজাইনের শ্রমিকরা একই দাবিতে বিক্ষোভ করে আশপাশের ২টি কারখানা ভাংচুর করেছে। শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, জেলা সদরের চান্দনা চৌরাস্তা, তিন সড়ক, ভোগড়া বাইপাস, নাওজোর, কড্ডাসহ অধিকাংশ এলাকায় গার্মেন্টস শ্রমিকরা গতকাল কাজে যোগ দিলেও কোনাবাড়ি ও কাশিমপুর এলাকায় বিক্ষিপ্ত ভাবে অবরোধ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। ভাংচুরের আশংকায় কর্তৃপক্ষ কোনাবাড়ী এলাকার অধিকাংশ পোশাক কারখানা বুধবারের জন্য ছুটি ঘোষণা করে। সকালে কোনাবাড়ির তুসুকা ট্রাউজার লিমিটেডসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে টায়ার পুড়িয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। এ সময় ওই সড়কে বেশ কিছুক্ষণ যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। খবর পেয়ে জয়দেবপুর থানার পুলিশ ও শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে ছত্র ভঙ্গ করে দেয়। রাস্তা থেকে শ্রমিকদের সরাতে পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। তুসুকা ট্রাউজার লিমিটেড কারখানার ম্যানেজার বশির আহমেদ জানান, গতকাল সকাল থেকে আমাদের কারখানা চলছিল। ৯টার দিকে কিছু বহিরাগত শ্রমিক কাখানার সামনে এসে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে বাধ্য হয়ে কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে স্থানীয় চক্রবর্তী পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ভাংচুর আতংকে কাশিমপুর এলাকার ডিবিএল গ্রুপ, জিএমএস কারখানা, মিতালী ফ্যাশন, ডেল্টা গ্রুপ, মণ্ডল গ্রুপ, তুরাগ গার্মেন্টস, মাছিহাতা ও রেডিয়েলসহ বিভিন্ন কারখানায় গতকাল ছুটি ঘোষণা করা হয়। কালিয়াকৈর (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকার কারখানাগুলোতে সকাল সোয়া আটটার দিকে শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়। এর কিছুক্ষণ পর নায়াগ্রা টেক্সটাইল ও মাহমুদ জিনসসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি ও বেতন বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা চন্দ্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। একই সময় উপজেলার সিনাবহ এলাকার মাকস সোয়েটার ও মিম নুন নিট ওয়্যার লি. এর শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানায় ব্যাপক ভাংচুর চালায়। ভাংচুর শেষে শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে উপজেলার সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। প্রায় আধা ঘন্টা পর বৃষ্টি শুরু হলে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে চলে যায়। এতে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। কালিয়াকৈর থানার ওসি মো. ওমর ফারুক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। রাজশাহীতে শ্রমিক বিক্ষোভ, ভাংচুর রাজশাহী অফিস জানায়, রাজধানীতে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছে পদ্মাপাড়ের শহর রাজশাহীতে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজশাহী জুটমিলের শ্রমিকরা সরকার ঘোষিত বকেয়া মজুরি পরিশোধের দাবিতে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ-সমাবেশ করে। সমাবেশে জুটমিল শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি এমদাদুল হক বলেন, বকেয়া মজুরি পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও মিল কর্তৃপক্ষ এখন টালবাহানা করছে। অবিলম্বে বকেয়া মজুরি পরিশোধ না করলে লাগাতর শ্রমিক ধর্মঘট আহবান করা হবে বলে তিনি হুমকি দিয়েছেন। নগরীর মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম আবদুস সোবহান বলেন, প্রায় ঘন্টাব্যাপী অবরোধ ও বিক্ষোভের সময় মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা একটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ভাংচুর করে।