রাজধানীর তিন হাসপাতাল স্বাচিপের হাতে জিম্মি

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫৬
রাজধানীতে সরকার নিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসিত তিনটি হাসপাতাল স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) দুই গ্রুপের হাতে জিম্মি। দীর্ঘদিন ধরে এসব হাসপাতালে নিয়োগ, পদোন্নতি, কেনাকাটাসহ সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ হয়ে আসছে দুই গ্রুপের নেতাদের কথায়। তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এ তিনটি চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, পুরনো ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, শেরে বাংলা নগর ঢাকা শিশু হাসপাতাল এবং ডেমরায় শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বাচিপের দুর্নীতি, অনিয়ম, নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার অব্যাহত রাখায় এ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সাড়ে চার বছর স্বাস্থ্যসেবায় উন্নয়নের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে শেখ হাসিনার সরকার পুরস্কৃত হয়েছে। স্বাচিপের এক শ্রেণির নেতাকর্মী বেপরোয়া ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডারবাজি এবং পদোন্নতির নানা অনিয়মের কারণে সেই সম্মান এখন ধূলিসাত্ হওয়ার পথে। স্বাচিপের এ দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, পুরনো ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্বাচিপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুই গ্রুপে বিভক্ত। নিয়োগ, পদোন্নতি, কেনাকাটা ও প্রশাসন ঐ দুই গ্রুপের হাতে নিয়ন্ত্রিত। ইতিমধ্যে এক গ্রুপের অপ্রীতিকর ঘটনায় স্বাচিপের এক নেতাসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। ছয় সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। এক কর্মকর্তা জানান, স্বাচিপের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে চিকিত্সা শিক্ষার বেহাল দশা। হাসপাতালের প্রায় সব কাজে হস্তক্ষেপে কর্তৃপক্ষ রীতিমত অস্থির ও বিরক্ত। কর্মকর্তা-কর্মচারী পর্যন্ত দুই গ্রুপে বিভক্ত। দৈনিক ৪/৫জন ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী এক নেতার দেহ রক্ষী হিসাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। তারা ঐ নেতার বাসা বাড়ি পর্যন্ত দেখভাল করে থাকে। কয়েক চিকিত্সক অভিযোগ করেন, উভয় গ্রুপের নেতাকর্মীরা স্বাচিপের নাম ভাঙ্গিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। এসব কারণে ইতিমধ্যে স্বাচিপের উক্ত হাসপাতাল কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালক ডা. ক্যাপ্টেন (অব.) এম এ সালাম বলেন, কোন ধরনের অনিয়মকে ছাড় দেয়া হয়নি, হবেও না। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগ রয়েছে, শেরে বাংলা নগর ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রশাসন স্বাচিপের এক গ্রুপ জিম্মি করে রেখেছে। বর্তমান সরকার কিডনি, হূদরোগসহ শিশু চিকিত্সার অত্যাধুনিক পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও স্বাচিপের ঐ গ্রুপের ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ, পদোন্নতি ও কেনাকাটা বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের ফলে হাসপাতালটির অত্যাধুনিক চিকিত্সাসেবা ভেঙ্গে পড়েছে। স্বাচিপের বিরোধিতার কারণে বোর্ডের চেয়ারম্যান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে চলে যান। চেয়ারম্যান পদে পছন্দের লোককে নিয়োগ দেয়ার জন্য ঐ গ্রুপের লোকজন মরিয়া হয়ে উঠলেও তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ ৯ মাসে পরিচালনা বোর্ড সভা না হওয়ায় হাসপাতালের চিকিত্সা সেবা ভেঙ্গে পড়ে। অবশেষে ৯ মাস পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চেয়ারম্যান পদে জাতীয় অধ্যাপক ও গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শাহেলা খাতুনকে নিয়োগ দেয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন বলেন, নতুন চেয়ারম্যান আসায় বোর্ড সভা শুরু হয়েছে। কোন বিরোধই হাসপাতালের চিকিত্সার মানের অবনতি হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। স্বাচিপের এক নেতার কারণে ডেমরা মাতুয়াইলের শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিত্সাসেবার লন্ডভন্ড অবস্থা। প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ, পদোন্নতি, কেনাকাটাসহ প্রায় প্রশাসনিক কার্যক্রম চলে ঐ নেতার কর্তৃত্বের ওপর। ঐ নেতা চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার অন্যতম আসামির ভাইয়ের বদৌলতে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ৫ বছরে লিয়েন নিয়ে সৌদী আরবে চাকরি করতে চলে যান। ঐ আসামির ভাই ছিলেন এ চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানের প্রধান। বিএনপি সমর্থিত ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ড্যাব) কর্মী সেজে ঐ কর্মকর্তার হয়ে কাজ করেছেন বর্তমান স্বাচিপ নেতা। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তিনি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি স্বাচিপের নেতা সেজে যান। প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন। স্বাচিপের কেন্দ্রীয় এক নেতা উক্ত নেতার কাছ থেকে লাখ লাখ টাকার ভাগ পেয়ে থাকেন। এ কারণে তিনি বিতর্কিত নেতা হয়েও দোর্দন্ড প্রতাপে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটটির নিয়োগ, পদোন্নতি ও কেনাকাটাসহ পুরা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কর্তা। স্বাচিপের প্রতিষ্ঠাতা এক সদস্য পর্যন্ত তার দাপটে হাবুডুবু খাচ্ছেন। উচ্চ ডিগ্রি নিয়েও তার ভাগ্যে পদোন্নতি মিলেনি। উল্টা ঐ বিতর্কিত নেতা তার চাকরি থেকে বাদ দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, ঐ নেতাদের নেতৃত্বে রোগী কল্যাণ তহবিল থেকে ক্যান্টিনের নামে মোটা অংকের টাকা লোপাট হয়েছে। বেশ কয়েকজন আত্মীয় স্বজনকে চাকরি দিয়ে হাসপাতালে ক্ষমতার পরিধি বাড়িয়েছেন। ঐ স্বাচিপ নেতা ইনস্টিটিউটের কাছে ক্লিনিক দিয়ে রোগী বাগিয়ে বাণিজ্য করে যাচ্ছেন। তিনি জুনিয়র হয়েও বোর্ড সদস্য হয়েছেন ক্ষমতার জোরে। বিতর্কিত এ নেতার কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। রোগীদের বৃহত্তর স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি তার নিয়ন্ত্রণ থেকে রক্ষা করার জন্য বেশ কয়েকজন চিকিত্সক, নার্স ও কর্মচারী সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহনেওয়াজ বিন তাবিব বলেন, শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কোন অনিয়ম, দুর্নীতি হয়নি। কারো কাছে প্রশাসন জিম্মি থাকার প্রশ্নই উঠে না। নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রশাসন চলছে এবং তদ্বিরকে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, কিছু কিছু নেতার কারণে সমস্যা হয়। তবে তার প্রভাব চিকিত্সা সেবায় পড়েনি। স্থানীয় প্রশাসন কোন অনিয়মকে প্রশ্রয় দিলে প্রতিষ্ঠান প্রধানের ব্যর্থতা। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান চলবে। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।